advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আর কত উচ্ছেদ হবে ভূমিপুত্ররা!

ড. মো. গোলাম সারওয়ার
১৬ জুন ২০২০ ১৬:৪৪ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২০ ১৬:৪৪
advertisement

বাংলাদেশে জমি ও ভূমি কেন্দ্রিক হামলার স্বীকার প্রতিনিয়ত হতে হচ্ছে আদিবাসীদের। যেসব স্থানে হামলার স্বীকার হয়েছে, সেখানেই হামলাকারীরা জমির জাল দলিল দেখিয়ে কিংবা খাস জমি আখ্যায়িত করে আদিবাসীদের ওপর হামলা করছে। রাজশাহী তানোর উপজেলার কচুয়া কাজিপাড়া গ্রামে মৃত নুংরা কিস্কুর নামে কচুয়া মৌজার ১২৪৭ দাগের ৩৩ শতক জমিকে কেন্দ্র করে অনেকে খাস জমি মনে করে দখলের চেষ্টা করে আসছে।

নকশার পুরাতন রাস্তার ওপর মৃত নুংরা কিস্কুর ওয়ারিশরা ঘরবাড়ি বানানোয় সেই পুরাতন রাস্তার বদলে ওই ৩৩ শতকের জমি রাস্তার সমপরিমাণ জায়গা নতুন রাস্তার সমপরিমাণ জায়গা নতুন রাস্তার জন্য ছেড়ে দেয়। রাস্তার বদলে রাস্তা ছেড়ে দেওয়া ও জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও স্থানীয় অনেকে খাস জমি আখ্যায়িত করে দখল করার চেষ্টা করে।

মৃত নুংরা কিস্তুর বড় ছেলে মৃত দুরবিন কিস্কুর বাড়ির উঠান সংলগ্ন সামনের রাস্তায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অভাবে জলাবদ্ধতা ও প্রচুর কাদা জমা হলে অনেকবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমস্যা সমাধানের জন্য জানানো হয়। কিন্তু তারা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি। রাস্তায় জলাবদ্ধতার কারণে যাতায়াত অনুপযোগী হলে উঠান দিয়ে জনসাধারণ চলাচল করে। উঠান দিয়ে জনসাধারণ, সাইকেল ও মোটর সাইকেল ছাড়াও যখন তিন বা চার চাকার গাড়ি যাতায়াত করে, তখন উঠানও ওই রাস্তার মতো হেঁটে চলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই উঠান দিয়ে লোকজনের হাঁটা ও সাইকেল চলার মতো জায়গা ফাঁকা রেখে বাঁশের খুটি দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়। উঠানে বেড়া দেওয়ার ফলে রাস্তায় যাওয়া আসার সময় অনেকে খারাপ খারাপ কথা বলে। জমির কাগজ নাই, খাস জমির ওপর বসবাস করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

নিজের জায়গায় বেড়া ও ওসব কথা সহ্য করার প্রায় দুই মাস পার হয়ে গত ৬ জুন দুপুরের দিকে মো. নাসির তার অটোরিকশা (দোলনা) জোর করে উঠানের ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মুত দুরবিন কিস্কুর বড় ছেলে সজল কিস্কু বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে বাকবিত-া হয়। পরে সন্ধ্যা প্রায় ৬টার দিকে ওই স্থানেই মো. নাসিরসহ প্রায় ১৪-১৫ জন লোক দলবেধে এসে ইউপি সদস্য ও চৌকিদারের উপস্থিতিতে রাস্তার জলাবদ্ধতা ও কাদা সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এর একপর্যায়ে ইউপি সদস্য ও চৌকিদারের কথা অমান্য করে ১২-১৩ জন ভাড়াটে লোক মো. নাসিরের কথামত খাস জমি আখ্যায়িত দিয়ে জোর করে বেড়া তুলতে আসে। এ সময় যতিন কিস্কু বাধা দিলে তারা তার দিকে মারার জন্য ছুটে আসেন ও ধাক্কা দিয়ে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে গলা ধরে রাখেন।

ওই ঘটনায় যতিন কিস্কুর বড় ছেলে স্বপন কিস্কু বাবাকে তাদের হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাকেও ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। সেটা দেখে ইউপি সদস্যের সঙ্গে আলোচনারত মৃত দুরবিন কিস্কুর ছোট ছেলে সুবল কিস্কু তাদের বাঁচানোর জন্য ছুটে আসেন। পরে তাকেও কয়েকজন বাধা দিয়ে শার্টের কলার ধরে আটকে রাখেন। এতে তিনজনই ভাড়াটে লোক দিয়ে আহত হয়। এটা দেখে মৃত দুরবিন কিস্কুর স্ত্রী মিনা সরেন ও তার মেয়ে সোনিয়া কিস্কু এবং যতিন কিস্কুর স্ত্রী সুনিতা সরেন, তার দুই মেয়ে সান্তনা ও রোজিনা কিস্কু তাদেরকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসেন। সেখানে তারাও গুণ্ডাদের হাতে লাঞ্ছিত হন। একপর্যায়ে আশপাশের  লোকজন, ইউপি সদস্য ও চৌকিদারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

ঘটনাস্থলে ইউপি সদস্য স্বয়ং উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও হামলা হয়েছে। ইউপি সদস্য নিজে ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে হামলার বিষয়টি মীমাংসা ও থানাতে আপাতত না যাওয়ার আশ্বাস দিলেও এক সপ্তাহ কেটে গেছে। কিন্তু এখনো হামলাকারীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

দুরবিন কিস্কুর বাড়ির উঠান

 

ঘটনাস্থল কচুয়া মৌজার ১২৪৭ দাগের প্রায় ৪০ বিঘার জমির মধ্যেই অবস্থিত। এই ঘটনার আগেও ২০০৮ সালে ১২৪৭ দাগের জমির ওপর বসবাসরত ১২-১৩ জন আদিবাসী সাঁওতালের ওপর জবরদখল ও ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে। তবে গ্রামের লোকজনের কারণে দখল ও উচ্ছেদ করতে পারেনি। ২০০৮ সালের পরের বছর একই ব্যক্তি ১২-১৩ জন সাঁওতালের জায়গা দখল করার চেষ্টা করে। বাড়ির সামনের জায়গাতে খুঁটি পিলার পুতে নিজের জায়গা বলে দাবি করে।

দফায় দফায় (২০০৮, ২০১৯ ও ২০২০) জমি দখলের চেষ্টায় স্থানীয় প্রভাবশালীও জড়িত থাকতে পারে। তা নাহলে বারবার কেন শুধুমাত্র ওই ১২-১৩ জনের জমিকে খাস জমি আখ্যায়িত করে দখল করার চেষ্টা হচ্ছে? যখন দখলদারবা এক সঙ্গে অনেক জনের জমি দখলে সুবিধা করতে পারছে না, তখনই তারা একেকজনকে টার্গেট করে একেক জনের ওপর খাস জমি ইস্যুকে সামনে এনে হামলা করতে শুরু করছে। ওই ৬ জুনের হামলা তারই একটি বহিঃপ্রকাশ।

মৃত দুরবিন কিস্কুর ছেলেরা যখন বাইরে অবস্থান করে, তখন স্থানীয় অনেকে তার স্ত্রীকে বাড়িতে একা পেয়ে ভয়ভীতি প্রদান করে জায়গা দখলের হুমকি দেয়। এ ধরনের হামলার ঘটনায় হামলাকারীরা উপযুক্ত শাস্তি না পেলে পরবর্তীতে অন্য গ্রামে আদিবাসীদের জমিকে খাস জমি আখ্যায়িত করে এই ধরনের জবরদখল, উচ্ছেদ, নারী লাঞ্ছিতের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

আমি ও মানবাধিকারকর্মী আরিফ, রানা, শামীম পারভেজ গত ১৪ জুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ইউপি সদস্য শহীদুলের সঙ্গে কথা বলি। উনি আমাদের দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা উদ্বিগ্নের সঙ্গে এই হামলা ও জমি দখল চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

ড. মো. গোলাম সারওয়ার : সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement