advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানসিক সমস্যা

জ্যাকব আমেদি
২০ জুন ২০২০ ১৭:৪৯ | আপডেট: ২০ জুন ২০২০ ১৮:৪৫
মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেশি; বাড়ে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক চাপ আর অলীক ঘনিষ্ঠতা। অলঙ্করণ : গেটি ইমেজস; সৌজন্যে : কাইজার হেলথ নিউজ
advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী জ্যাকব আমেদি ২০১৫ সালে তার চূড়ান্ত গবেষণা পত্র হিসেবে এই প্রবন্ধটি তৈরি করেছিলেন। ‘দি ইমপ্যাক্ট অব সোশাল মিডিয়া অন সোসাইটি’ নামে এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে অ্যাডভান্সড রাইটিং: পপ কালচার ইন্টারসেকশনস। স্কলার কমনসের সৌজন্যে প্রবন্ধটি উন্মুক্ত হিসেবে পাওয়া যায়।

দৈনিক আমাদের সময়-এর পাঠকদের জন্য লেখাটি বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছে। চার পর্বের রচনার দ্বিতীয় পর্ব এটি—

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক মানুষের মধ্যে কীভাবে মানসিক সমস্যা তৈরি করে, পরের অংশে এর পক্ষে আমি যুক্তি উপস্থাপন করব। এটা প্রতীয়মান যে, সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যক্তির ওপর নেতিবাচব প্রভাব ফেলে। তরুণরা নিজ সম্পর্কে এবং নিজে যে সমস্যায় পড়ে তা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করে।

৩.১ ফেসবুকীয় বিষণ্নতা

কিছু গবেষক নতুন একটা প্রপঞ্চ (ফেনোমেনন) হাজির করেছেন। তারা এর নাম দিয়েছেন ‘ফেসবুকীয় বিষণ্নতা’ (ফেসবুক ডিপ্রেশন)। যখন কেউ সামাজিক যোগাযোগেরমাধ্যম যেমন ফেসবুকে মাত্রাতিরিক্ত সময় কাটায় তখন এ ধরনের বিষণ্নতা তৈরি হতে থাকে এবং ব্যবহারকারীরা বিষণ্নতার কিছু উপসর্গ প্রকাশও করে।

গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা আর অন্যদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার প্রবণতাই হলো সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে অনলাইন জগতে সক্রিয়তা সার্বক্ষডুক সম্পৃক্ততা দাবি করে, আত্মসচেতনতা (সেলফ-কনশাস) বাড়িয়ে তোলে যা কিছু মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা তৈরি করতে পারে।

যেসব মানুষ ফেসবুকীয় বিষণ্নতায় ভুগে, তারা সামাজিক একাকিত্বের (সোশ্যাল আইসোলেশন) বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ে। কখনো কখনো তারা ক্ষতিকর ইন্টারনেট সাইট ও ব্লগে স্বস্তির আশায় যুক্ত হয়। কিন্তু উল্টো এতে হয়রানি, অনিরাপদ যৌনতা, আগ্রাসী মনোভাব ও আত্মবিধ্বংসী মনোভাব বৃদ্ধি পায়।

মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অন্যতম পরিণতি হলো হতাশা যা অজান্তেই তৈরি হয়। ফেসবুকীয় বিষণ্নতা বলতে শুধু ফেসবুক ব্যবহারে সৃষ্ট হতাশাকে বোঝানো হয় না। অন্যান্য সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোর প্রভাবে মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হলে সেটাও ফেসবুকীয় বিষণ্নতার আওতায় পড়বে। যেহেতু ফেসবুক বর্তমানে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সৃষ্ট হতাশার এই প্রপঞ্চকে এমন নামে ডাকা হচ্ছে।

হতাশা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারের মধ্যে যে একটা যোগসূত্র আছে, গবেষণায় এর প্রমাণ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. হুয়ান ডেভিলা ও তার সহকর্মী লিসা স্টার এবং [যুক্তরাষ্ট্রের] স্টোনি ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তারা একদল কিশোরীর ওপর নিরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহার ওদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। এক বছর পরে ওই কিশোরীদের ওপর পুনর্নিরীক্ষণ চালিয়ে গবেষকেরা দেখতে পান, যারা নিজেদের সমস্যা সামাজিক মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করেনি, তাদের চেয়ে যারা নিজেদের সমস্যাগুলো যারা বারবার বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করেছে, তারা আরও বেশি মানসিক সমস্যার ঝুঁকিতে পড়েছে।

ড. ডেভিলার ভাষায়, ‘খুদে বার্তা, তাৎক্ষডুক বার্তা ও সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ কিশোর-কিশোরীদের খুব সহজেই আরও বেশি উদ্বেগপ্রবণ করে তোলে, যা পরবর্তী সময়ে হতাশায় পরিণত হয়। মোটা দাগে বলতে গেলে, সামাজিক মাধ্যমগুলো যুবসমাজকে অতিরিক্ত মাত্রায় আত্মসচেতন, উদ্বিগ্ন এবং সবশেষে হতাশ করে ফেলে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্রমেই পুনঃআলোচনার আঙিনা হয়ে উঠছে যেন যেখানে পুরনো সমস্যাগুলো শুধু নতুন করে ব্যক্ত করা হয় বারবার। এতে করে ওই সমস্যা থেকে বের হওয়া তো দূরের কথা, ব্যবহারকারী বরং সমস্যার বেড়াজালে আরো আটকে পড়ে যেখান থেকে তারা আর বেরুতে পারে না, জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতেও পারে না। অবয়ব নিয়ে আত্মসচেতনতা, বন্ধুদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অথবা প্রেমের প্রতিদান ঠিকমতো মিলল কি না—আসলে এসব ‘সমস্যা’ তেমন কোনো সমস্যাই না।

আগেকালে, মেয়েরা এ ধরনের সমস্যাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখত কিংবা তা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে আলাপ করত।

কিন্তু এখন কিশোর-কিশোরীরা ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো প্রকাশের জন্য বেছে নিচ্ছে সামাজিক মাধ্যমকে। যখন কোনো কিশোর বা কিশোরী তার কোনো সমস্যা অনলাইনে প্রকাশ করে, তখন ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের মন্তব্যই আসে যা ওই কিশোর বা কিশোরীকে ওই ‘সমস্যা-সংক্রান্ত পোস্টের’ জালে জড়িয়ে ফেলে। যখন অনলাইনে কিছু প্রকাশ করা হয়, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না; এমনকি যদি ওই পোস্ট মুছে ফেলাও হয়, তবু  ওয়েবে কোথাও না কোথাও তা পাওয়া যায়, কিংবা অন্য কোনো ডিভাইসে এর স্ক্রিনশট রয়ে যায়। আর এভাবেই ওই পোস্ট করা ব্যক্তি আরও বেশি বিষণ্নতা ও উদ্বেগে পড়ে যায়।

নতুন আরেকটি গবেষণা বলছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমিং, খুদে বার্তা, মোবাইল ফোন ইত্যাদি নিয়ে মগ্ন থাকে, তাদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বেশি কাজ করে। [যুক্তরাষ্ট্রের] মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ড. মার্ক বেকারের এই গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশ মানুষ হতাশায় ভুগে বলে জানিয়েছে। আর ৪২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে তাদের সামাজিক উদ্বেগ বাড়ে। এ গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার  মানুষকে হতাশা ও উদ্বেগ এবং শেষমেশ মানসিক চাপে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।

৩.২ সামাজিক মাধ্যম ও উদ্বেগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু হতাশা ও উদ্বেগের উৎসই নয়, বরং ব্যবহারকারীর জন্য এটি মানসিক চাপেরও একটা উৎস। সাত হাজার মায়ের ওপর জরিপ চালিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মা পিন্টারেস্টে ছবি প্রকাশ করে থাকে, তাদের মধ্যে ৪২ শতাংশই ‘পিন্টারেস্ট চাপে’ ভোগে।

বোঝাই যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি করে। কিন্তু কীভাবে? এই হতাশা ও উদ্বেগ দুইভাবে সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কী বার্তা আসছে, সারাক্ষণ এই ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকার যে প্রবৃত্তি তা, সারাক্ষণ শিকারির ভয়ের মতো তাড়া করে বেড়ায়। এ ধরনের চিন্তায় মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন করটিসোল নিঃসৃত হয়।

আরেকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ায়। সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্কে নিজেকে নিখুঁত হিসেবে উপস্থাপনের অবাস্তব ও অসাধ্য প্রচেষ্টায় প্রতিক্ষণ মত্ত থাকার ফলে সৃষ্ট চাপ থেকে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ে।

মানসিক চাপসৃষ্ট এই সামাজিক উদ্বেগ তৈরি হয় যখন কেউ নিজেকে সর্বদা ‘নিখুঁত মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতেই থাকে। পরিপূর্ণতার প্রতিচ্ছবি, সুনিশ্চিত পেশাজীবন,  নির্ভার দাম্পত্য জীবন ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরার জন্য অবিরাম প্রচেষ্টায় যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, এর ফলে চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন করটিসোল অনবরত নির্গত হতে থাকে। ঠিক যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণে চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন করটিসোলের অবিরাম নিঃসরণ একসময় শরীরের অন্ত্রনালীর (গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল ট্র্যাস্ট) ক্ষতি সাধন করে। এর ফলে মস্তিষ্ক ও শরীরের সাড়াদানে বিঘ্ন ঘটে, উদ্বেগ-উকণ্ঠা উদ্রেক হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো সম্পর্কের অলীক ঘনিষ্ঠতা, যা থেকেও হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের আনন্দ, উত্তেজনা ও সাফল্যের মুহূর্তগুলো প্রসার পায় বেশি, কিন্তু বাস্তব জীবনে লড়াই-সংগ্রামের কথা সেভাবে কিন্তু উঠে আসে না। আমরা সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের পরিপূর্ণ সুখী হিসেবে উপস্থাপন করি, আর অন্যরা যা কিছু করে আমরাও সেগুলো অনুসরণ করে সবার সামনে তুলে ধরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এ কারণে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের পরিচিতি (প্রোফাইল) সেটাই প্রতিফলন করে আমরা যে হিসেবে নিজেকে প্রতীয়মান করাতে চাই অন্যের কাছে। বাস্তব জীবনে আমরা আসলে কী, তার সঠিক চিত্র আমরা আসলে দেখাতে চাই না।

বাস্তব জীবনের সম্পর্ক গড়ে তোলা ও তা জানানোর বদলে ভার্চুয়াল যোগাযোগে ‘সুখী’ সাজার এই যে মিথ্যা মোহ, অনেকেই এই স্রোতে গা ভাসাচ্ছে। এই যে সম্পর্কের আলগা বন্ধন, এর থেকে কিন্তু শেষমেশ দীর্ঘস্থায়ী আবেগিক ও মানসিক পীড়ার সৃষ্টি হতে পারে, বেশ কিছু গবেষণা থেকে সেরকমই চিত্র পাওয়া গেছে।

হাইস্কুলের বন্ধু, সহকর্মী বা প্রতিবেশী—যেকোনো মানুষকে খুঁজে পেতে ও তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয় ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিতের অধ্যাপক স্টিভেন স্ট্রোগাজ বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন কোনো বন্ধুকে খুঁজে পেলে প্রথমে মন ভরে যাওয়ারই কথা।’ কিন্তু মন্দ দিকটা হলো, সম্পর্কের দুর্বল বন্ধন (দাঁতের ভালো ডাক্তারের কিংবা চাকরির সন্ধান দেয় যারা) ও সবল বন্ধনের (যারা খুব কাছের) মধ্যকার তফাৎগুলো গুলিয়ে ফেলা।’

স্ট্রোগাজের ভাষায়, ‘সত্যিকারের বন্ধু এবং শুধু পরিচিতদের মধ্যে তফাৎটা গুলিয়ে যাচ্ছে যেন। যাদের ভালো মন্দে তেমন কিছুই যায়-আসে না, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে বেশি সময় কাটাচ্ছে ব্যবহারকারীরা।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ঘনিষ্ঠতার ভুল ভাবনা কী ক্ষতি বয়ে আনতে পারে, তার আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি। আমার এক [মেয়ে] বন্ধু একবার জিমে তোলা একটা সেলফি পোস্ট করেছিল, কিন্তু ফেসবুকে তা সবাই ভালোভাবে নেয়নি। প্রথম দিকে ব্যাপারটা ভালোই ছিল, ২০টার মতো লাইক পড়েছিল। শরীরচর্চা নিয়ে বন্ধুসুলভ, উৎসাহ ও শুভকামনামূলক কিছু মন্তব্য পড়েছিল। কিন্তু এরপর কেউ একজন ছবিটার বিপরীতে তার শরীরের ওজন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে। এরপর অন্যরাও বিদ্বেষভরা মন্তব্য করতে থাকে; প্রথমে তার ফেসবুক ‘বন্ধু’রা যাদের আমি চিনি এবং এরপর আগন্তুকরাও তাকে অপমান করতে থাকে, জাতপাত নিয়েও গালমন্দ করতে থাকে। এমন সব অশালীন মন্তব্য আসছিল যা উপেক্ষাও করা যাচ্ছিল না, শেষে সে ছবিটি সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।

৩.৩ সামাজিক মাধ্যম ও ভুয়াবৃত্তি

মানুষ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটায়, তখন থেকেই বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো নড়বড়ে হতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভ্রান্তজালে বেশিমাত্রায় সময় ও মনোযোগ দেওয়ার ফলে প্রয়জন ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আমাদের যে মূল সম্পর্ক, সেটাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিথ্যা বন্ধনের একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে এমটিভির প্রামাণ্যচিত্রভিত্তিক ‘ক্যাটফিশ’ শো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ব্যক্তি ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে, তাকে ‘ক্যাটফিশ’ বা ‘ভুয়া ব্যক্তি’ বলা হচ্ছে। আর ভুয়া বা চুরি করা পরিচিতি ব্যবহার করে অনলাইনে অপরিচিত কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কৌশলকে বলা হচ্ছে ‘ক্যাটফিশিং’ বা ‘ভুয়াবৃত্তি’। এটা হলো প্রতারণাপূর্ণ আচরণ, এর ফলে বহু মানুষের সংসার, সম্পর্ক ও আবেগিক প্রশান্তি বিনষ্ট হচ্ছে।

ক্যাটফিশের একটা পর্বে উপস্থাপক নেভ শুলম্যান অনলাইনে সম্পর্ক হওয়া প্রেমিকার সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু গিয়ে তিনি বুঝলেন, প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েটার যে ছবি তিনি দেখেছিলেন, সেই ছবির সঙ্গে বাস্তবের এই মেয়েটার চেহারার কোনো মিলই নেই। তখন নেভ মনে মনে ভাবলেন, যদি কেউ তার চেহারা বা অবয়ব নিয়েই মিথ্যে বলতে পারে, তাহলে তার চরিত্র নিয়েই আসলে প্রশ্ন আছে।

ওই মেয়ের সাথে আলাপে নেভ বুঝতে পারলেন, মেয়েটি তার ব্যক্তিগত জীবনের অন্যান্য তথ্য নিয়েও মিথ্যাচার করেছে। একটা সাজানো-গোছানো, পরিপাটি মরীচিকার মিছে মায়ায় মরিডুবি করছেন, এটা বুঝতে পেরে নেভের মনটা তখন কাচের টুকরোর মতো ভেঙে যাচ্ছিল যেন। মনে হতে পারে, ধুর, এটা কোনো ঘটনা; কিন্তু এই ধরনের ঘটনার ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণরকম প্রভাব ফেলে।

সাইকোলজি টুডেতে ২০১২ সালে অজিন সাইদি লিখেছিলেন, ‘অনলাইনে যোগাযোগে নাম-পরিচয় লুকোনো যায় বলে ভার্চুয়াল জগতে অনেক কিছুই সম্ভব হয় যা বাস্তব জীবনে অসম্ভব।’

তারপরও মানুষ প্রেমে পড়লে অনেক জটিল বিষয় এড়িয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কাউকে যখন তার প্রিয়তম মানুষের ছবি দেখানো হয়, তখন তার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। এই কারণেই দেখা যায়, হাজার হাজার ক্রোশ-মাইল দূরে থেকেও শুধু একটা ছবি দেখেই কারো প্রেমে পড়া যায়, সারাক্ষণ আবেগ-অনুভূতি আদানপ্রদান ও ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শক্তিশালী বন্ধন অনুভব করা যায়।

উতাহ বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতাত্ত্বিক পলনি উইজনার মনে করেন, এই যে নাম-পরিচয় গোপন করার সুযোগ, এর মাধ্যমে বরং খারাপ প্রবৃত্তিগুলো ডালপালা মেলে ধরে।

মেগান মেয়ার নামে ১৩ বছরের এক কিশোরী আত্মহত্যা করেছিল। সামাজিক মাধ্যমে জশ ইভানস নামের একটা ভুয়া কিশোর তাকে ‘সাইবার হেনস্তা’ (সাইবার বুলিং) করত। পরবর্তীতে জানা যায়, ভুয়া প্রোফাইলটি আসলে মেগানের থেকে বয়সে বড় তারই এক প্রতিবেশী বানিয়েছিল।

আমরা যারা সম্পর্ক পাতাতে চায়, বিশ্বাস করি যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো আঙিনায় আমরা সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারব, তারা শেষাবধি হতাশই হয়। সুতরাং, সদা সচেতন ও বাস্তবমুখী থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেশি; বাড়ে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক চাপ আর অলীক ঘনিষ্ঠতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারাক্ষণ তৎপর থাকার প্রবণতা থেকে আত্ম-সচেতনাতা বাড়ে যার ফলে বিষণ্নতা বেড়ে যায়।

পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনে প্রভাবিত করে, এর ফলেও বিষণ্নতা ও উদ্বেগ বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অলীক বন্ধনের মায়াজালে জড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব রাখে, শেষাবধি জোটে দীর্ঘস্থায়ী আবেগিক ও মানসিক পীড়ন। ভুয়া ঘনিষ্ঠতার বোধও তৈরি করে সামাজিক মাধ্যম। এই অলীক ঘনিষ্ঠতা ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত—দুই ধরনেরই হতে পারে, যেমনটা আমরা সেলফি ও ক্যাটফিশের উদাহরণে দেখেছি। ব্যক্তিগত জীবনে সামাজিক মাধ্যমের এসব নেতিবাচক প্রভাবকে আমলে না নিলে, মানসিক ও আবেগিক উভয় ধরনের ক্ষতি বাড়তে থাকবে।

মূল : জ্যাকব আমেদি। ভাষান্তর : জাহাঙ্গীর আলম, শিক্ষার্থী, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

প্রথম পর্ব : মানবসমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

 
advertisement