advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধবৃত্তি

জ্যাকব আমেদি
২১ জুন ২০২০ ১৮:০১ | আপডেট: ২১ জুন ২০২০ ১৮:০৪
ইন্টারনেটে ক্ষতিকর বা আজেবাজে বার্তা আদানপ্রদানকে এখন অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিছু দেশ এরই মধ্যে হেনস্তার শিকারদের সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে সাইবার হেনস্তাবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে। অলঙ্করণ : নেটমেডস
advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী জ্যাকব আমেদি ২০১৫ সালে তার চূড়ান্ত গবেষণা পত্র হিসেবে এই প্রবন্ধটি তৈরি করেছিলেন। ‘দি ইমপ্যাক্ট অব সোশাল মিডিয়া অন সোসাইটি’ নামে এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে অ্যাডভান্সড রাইটিং: পপ কালচার ইন্টারসেকশনস। স্কলার কমনসের সৌজন্যে প্রবন্ধটি উন্মুক্ত হিসেবে পাওয়া যায়।

দৈনিক আমাদের সময়-এর পাঠকদের জন্য লেখাটি বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছে। চার পর্বের রচনার তৃতীয় পর্ব এটি—

পূর্বোক্ত মানসিক সমস্যার পাশাপাশি দ্বিতীয় যে সমস্যাটি সমাজে প্রকট হয়ে উঠছে, তা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধ সংঘঠনের প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দুর্বৃত্ত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ নানাভাবে অন্যদের সঙ্গে মিথ্যা, প্রতারণা, আক্রমণ ও আঘাত করে ফায়দা লুটে নিচ্ছে।

অনেক অপরাধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ঘটায়। যেমন সাইবার হেনস্তা, সাইবার সন্ত্রাস, মানব পাচার, মাদক কেনাবেচা ইত্যাদি। এখানে সবচেয়ে অবৈধ কাজ সাইবার হেনস্তা, অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করা হলো।

৪.১ সামাজিক মাধ্যম ও হেনস্তা

কয়েক দশক ধরে যুবকদের মধ্যে সাইবার হেনস্তা অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, হেনস্তার শিকার (ভিকটিম) মানুষটি যখন কোনো কিছু পোস্ট করে, ‘বন্ধু’রা তাকে খেলো করার সুযোগ নিচ্ছে।

সহজে প্রতিবাদ করতে পারে না এমন কারো বিরুদ্ধে এক বা অধিক ব্যক্তির দ্বারা দীর্ঘ সময় ধরে অনবরত কোনো আগ্রাসী আচরণকে হেনস্তা (বুলিং) বলা হচ্ছে।

ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন ধরনের হেনস্তা শুরু হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সাইবার হেনস্তা (সাইবার বুলিং)। সাইবার হেনস্তায় আগ্রাসন ঘটে বৈদ্যুতিন প্রক্রিয়ায়, ইন্টারনেট বিশেষত সামাজিক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে।

যারা সাইবার হেনস্তা করে, তারা খুব সহজেই নিজের পরিচয় গোপন করতে পারে, অন্য কারো চেহারা নিয়ে ভুয়া প্রোফাইল দিয়ে শিকারকে ভীতসন্ত্রস্ত করতে পারে, যেমনটা আমরা আগে ক্যাটফিশ উদাহরণে দেখেছি। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী সাইবার হেনস্তার কথা স্বীকার করেছে, হয়তো তারা সাইবার হেনস্তার শিকার নয়তো হেনস্তাকারী।

ব্রিটেনের জাতীয় শিশু সংস্থার (ন্যাশনাল চিলড্রেন’স হোম) জরিপে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে প্রতি চার শিশুর মধ্যে অন্তত একটি শিশু সাইবার হেনস্তার শিকার। এই সমস্যা কিশোরদের জীবনে মানসিক ক্ষত তৈরি করে, এমনকি আত্মহননের পথেও ধাবিত করে।

মারাত্মক হয়রানিমূলক আচরণ যে প্রায় সব শ্রেণির শিক্ষার্থীকে হয় আত্মহনন কিংবা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, এরকম অনেক গল্পই আছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এত অপমৃত্যু, আত্মহত্যা ও মানসিক সমস্যার বৃদ্ধি সামাজিক মাধ্যমের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবনার কথা বলে।

হেনস্তার শিকার হলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে, অন্তত মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে বলে জানা যাচ্ছে। এ ধরনের গবেষণার ফল হেনস্তামূলক আচরণ কমানোর ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করে। কারণ শৈশবের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো যৌবনে মানসিক রোগের বিকাশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে তরুণদের বেলায় অনলাইন হেনস্তা ও আত্মহত্যার মধ্যে যোগসূত্র সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। ইন্টারনেটে ক্ষতিকর বা আজেবাজে বার্তা আদানপ্রদানকে এখন অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছে, সাইবার জগতে নাম-পরিচয় গোপন রাখার যেন কোনো উপায় না থাকে। অনেকে চায়, অনিষ্টকারীকে আদালতের আওতায় আনা হোক। কিছু দেশ এরই মধ্যে হেনস্তার শিকারদের সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে সাইবার হেনস্তাবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে।

৪.২ সামাজিক মাধ্যম ও সন্ত্রাস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এই মাধ্যমকে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বিগত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদের ঘটনা ঘটেছে। শুধু যে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে তা নয়, ইউরোপ, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রেও এমন সন্ত্রাসবাদ থাবা বসিয়েছে। সন্ত্রাসবাদে তথ্য সংগ্রহ, সদস্য নিয়োগ ও তহবিল সংগ্রহ এবং প্রচারণা (প্রোপাগান্ডা) চালানোর জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইন্টারনেট যুগের শুরু থেকে সন্ত্রাসবাদ বিস্তার ও সামাজিক মাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছেন ইসরায়েলের হাইফা বিশ্ববিদালয়ের অধ্যাপক [গ্যাব্রিয়েল] উউম্যান। উড্রো উইলসন সেন্টারের এই সভ্য স¤প্রতি ‘নতুন সন্ত্রাসবাদ ও নব মাধ্যম’ (নিউ টেরোরিজম অ্যান্ড নিউ মিডিয়া) শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। উইম্যানের মতে, ১৬ বছর আগেই সন্ত্রাসীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করা শুরু করেছে। এরপর থেকে ইন্টারনেট ও অনলাইন অঙ্গনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা আকাশছোঁয়া; ১৬ বছরে ১২টি ওয়েবসাইট থেকে নয় হাজার ৮০০ ওয়েবসাইট তৈরি করেছে তারা।

৯/১১ হামলার পর, জিহাদি আন্দোলন ও আল-কায়েদার মতো বহু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সাইবার জগতে তৎপর হয়েছে।

উইম্যানের গবেষণা বলছে, সন্ত্রাসীরা প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, তহবিল সংগ্রহের জন্য এবং নতুন কর্মী নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছে। সন্ত্রাসীদের পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দিচ্ছে সামাজিক মাধ্যম। এভাবে তারা নতুন সদস্য দলে ভেড়াচ্ছে।

সন্ত্রাসীরা এও জানে, কোন ধরনের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশি ব্যবহার করছে। এরা হলো অনুভ‚তিপ্রবণ তরুণ প্রজন্ম, যারা সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্য। সন্ত্রাসীরা যখন নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়, তখন তারা মানসিকভাবে দুর্বলচিত্ত ও যারা উগ্রবাদের ব্যাপারে শুনেছে, তাদেরই লক্ষ্য করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে নতুন সদস্য নিয়োগ করা সহজ হয়ে গেছে। বিশেষত ‘নিভৃতচারী নেকড়ে সন্ত্রাসবাদ’ (লোন-ওলফ টেরোরিজম) নামের নতুন এই আন্দোলন বেগবান হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এই ‘নিভৃতচারী নেকড়ে’ সন্ত্রাসবাদকে সাহায্য করছে ভার্চুয়ালি, যেখানে গোপনে কেউ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, নির্দেশনা দিচ্ছে এবং তাদের প্রবৃত্ত করছে।

উদাহরণস্বরূপ, বছরখানেক আগে, বোস্টনে সন্ত্রাসীরা দুই সারনায়েভ সহোদরকে সামাজিক মাধ্যমে খুঁজে বের করে নিয়োগ দিয়েছিল। কর্তৃপক্ষরা টুইটার, ফেসবুক এবং ইউটিউবে সারনায়েভদের বিচরণ শনাক্ত করতে পেরেছিল। তারা [হামলার] নির্দেশনা যেভাবে পেয়েছিল তা খুঁজে বের করতে খুব বেশি বেগ পোহাতে হয়নি। দেখা গেছে, এই ‘নিভৃতচারী নেকড়ে’রা মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়, নিঃসঙ্গ নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাইবার সন্ত্রাসবাদের সরঞ্জাম হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে, যেখানে অপরাধীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে মিথ্যা বা আপোষমূলক তথ্য প্রচার করছে। যেমন, ২০১৩ সালের এপ্রিলে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) টুইটার অ্যাকাউন্টে আক্রমণ করেছিল সিরিয়ান ইলেক্ট্রনিক আর্মি। এপির টুইটার থেকে লাখো লাখো পাঠককে একটি বার্তা দিয়ে তারা পাঠিয়েছিল। বার্তাটি ছিল এরকম, ‘ব্রেকিং নিউজ : হোয়াইট হাউজে জোড়া বিস্ফোরণ, বারাক ওবামা আহত।’

অবশ্যই খবরটা ভুয়া ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেয়ারবাজার ধসে পড়ে; নিউ ইয়র্ক শেয়ারবাজারে লেনদেন ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার কমে যায়। এই জাতীয় সাইবার সন্ত্রাসবাদ একটি দেশের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করে বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্রমাগত অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ভেস্টার লি ফ্লানাগান দ্বিতীয় একজন অসন্তুষ্ট কর্মী ছিলেন, যিনি ২০১৫ সালের ২৬ আগস্ট সরাসরি সম্প্রচারকালেই ডব্লিউডিবিজে-৭ টিভির রিপোর্টার অ্যালিসন পার্কার ও ক্যামেরাম্যান অ্যাডাম ওয়ার্ডকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। সম্পর্ক, পরিবার ও কাজ নিয়ে ঝামেলায় পোহাতে পোহাতে তিনি ভীষণরকম বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ক্রোধ, হতাশা, নিঃসঙ্গতা, উদ্বেগ এমনকি আত্মঘাতী প্রবণতাও গড়ে উঠেছিল তার ভেতর। তিনি তার অপরাধযজ্ঞ প্রচারের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করেছিলেন যেন পুরো বিশ্ব তা দেখতে পায়। নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের মনোরোগবিদ্যা (সাইকিয়াট্রি) বিভাগের চেয়ারম্যান জেফ্রি লিবারম্যান বলেছেন, ফ্লানাগান ‘কেবল প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলে এমন নয়; তিনি চেয়েছিলেন প্রতিশোধটা দৃশ্যমান হোক, তাই ভিডিওগ্রাফির পথ বেছে নিয়েছিলেন।’ এই মনোরোগবিদ আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে, হত্যাকাণ্ডের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহৃত হয়েছে।’ অধ্যাপক লিবারম্যানের ভাষায়, ‘এটি আমাদের সংস্কৃতির স্বরূপকেই ফুটিয়ে তোলে। এই সমাজে বন্দুক সহজলভ্য এবং যা কিছুই তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা যায়।’

সেন্ট জন’স ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক রেমন্ড ডিজুসেপ্পে বলেছেন, ‘যারা সহিংস অপরাধ করে তাদের বেশিরভাগেরই অতিবিকৃত একটা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যে, তারা যা করছে তা একটি ভালো কাজ। এই অপরাধীরা যত বেশি সম্ভব তত মানুষের কাছে তার অপরাধকর্মটি প্রচার করতে চায়। আর সামাজিক মাধ্যম তো এমনকি অপরিচিত, অচেনা লোকের কাছেও বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।’

আমাদের বিবেকের মূলে আঘাত করে এমন নৃশংস অপরাধ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কেউ যে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, ফ্লানাগান তার একটা বড় উদাহরণ।

মূল : জ্যাকব আমেদি। ভাষান্তর : জাহাঙ্গীর আলম, শিক্ষার্থী, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

প্রথম পর্ব : মানবসমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

দ্বিতীয় পর্ব : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানসিক সমস্যা

 
advertisement