advertisement
advertisement

সামাজিক মাধ্যম ও সন্ত্রাসবাদের আন্তঃসম্পর্ক

জ্যাকব আমেদি
২২ জুন ২০২০ ১৮:১৯ | আপডেট: ২২ জুন ২০২০ ১৮:১৯
খুব দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করার মতো কিছু উপকারী দিক থাকা আছে বটে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের প্রাথমিক সহায়ক হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে। অলঙ্করণ : ডিএএফজেড
advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী জ্যাকব আমেদি ২০১৫ সালে তার চূড়ান্ত গবেষণা পত্র হিসেবে এই প্রবন্ধটি তৈরি করেছিলেন। ‘দি ইমপ্যাক্ট অব সোশাল মিডিয়া অন সোসাইটি’ নামে এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে অ্যাডভান্সড রাইটিং : পপ কালচার ইন্টারসেকশনস। স্কলার কমনসের সৌজন্যে প্রবন্ধটি উন্মুক্ত হিসেবে পাওয়া যায়।

দৈনিক আমাদের সময়-এর পাঠকদের জন্য লেখাটি বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছে। চার পর্বের রচনার শেষ পর্ব এটি—

সমাজের ওপর সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবগুলো নিয়ে এতক্ষণের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সন্ত্রাসবাদ এবং সামাজিক মাধ্যমে সৃষ্ট মানসিক সমস্যার মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। অনেক গবেষকণায় দেখা গেছে, ‘মানসিক প্রতিক‚লতা ছাড়াও হতাশা থেকে সহিংস প্রতিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের প্রতি সহানুভ‚তির সৃষ্টি হতে পারে। যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় হতাশা এবং উগ্রপন্থার মধ্যে সংযোগ খুঁজে পাওয়া গেছে।’

সন্ত্রাসবাদ ও সামাজিক মাধ্যমের মধ্যকার সংযোগটি বুঝতে হলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে নতুন যুক্ত হওয়া কর্মীদের প্রফোইলগুলো মূল্যায়ন করতে হবে। যারা তেমন কিছু না বুঝেই উগ্রবাদী গোষ্ঠীতে যোগ দেয়, তারা বাস্তব জীবনে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি। দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যে পড়বে হতাশার মতো মানসিক সমস্যায় থাকা মানুষ। আর কিছু লোক এই কারণে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগদান করে যে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।

যারা নতুন সদস্য হিসেবে সন্ত্রাসের দলে ভিড়ে, তাদের মানসিক সমস্যাগুলোর মধ্যে হতাশা ও মানসিক অস্থিরতা অন্যতম। গত গীষ্মে, কানাডার এক তরুণ ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তির হন; তিনি মৌলবাদী হয়ে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত সিরিয়ায় যুদ্ধে গিয়ে মারা গেছেন।

জ্যাকবসের মতে, কানাডার ওই তরুণ ড্যামিয়ান ক্লেমরন্ট ‘হতাশ ছিলেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি ধর্মে শান্তি খুঁজে নিতে চেয়েছিলেন। এটা একটা মাত্র উদাহরণ। তবে নতুন প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হতাশা ও উগ্রপন্থার মধ্যে সম্ভবত একটি যোগসূত্র রয়েছে। জিহাদের পথ থেকে পশ্চিমের তরুণ মুসলমিদের ফেরোনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য উপাদানকে উপেক্ষা করছে বলে ওই গবেষণায় মন্তব্য টানা হয়েছে।’

লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির ওলফসন ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের কমলদীপ ভূঁইয়ের নেতৃত্বে একটি গবেষণা দল লিখেছে, ‘সহিংস প্রতিবাদের পথে প্রথম পর্যায়ে সংশোধনযোগ্য ঝুঁকি এবং প্রতিরক্ষামূলক কারণ থাকে, আমাদের গবেষণা তা-ই বলে। ভূঁই এবং তার সহকর্মীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, ‘হতাশামূলক হালকা অসুস্থতার লক্ষণগুলোই পরে উগ্রবাদের ঝুঁকির কারণ’ হয়ে যায়। গবেষকরা বলছেন, একই ধরনের আন্তঃসম্পর্ক  ‘দোষী সাব্যস্ত হওয়া সন্ত্রাসী এবং ফিলিস্তিনের কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে এক গবেষণা’য় উঠে এসেছিল।

বিচ্ছিন্নতাও সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম ঝুঁকির কারণ। যদিও গবেষকরা বলছেন, ‘আমরা দেখেছি, যারা সহিংস আচরণের বিপরীতে তীব্র নিন্দা জানায়, তাদের সামাজিক যোগাযোগ বেশি।’ এবং গবেষকরা মনে করেন, ‘নানা ধরনের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সুযোগসুবিধা সরবরাহের মাধ্যমে সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো উগ্রবাদ প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। ফলে এ মাধ্যম নিজেই প্রতিরক্ষাপ্রবণ।’

এই অনুসন্ধানগুলো জটিল এবং প্রাথমিক পর্যায়ের। তারপরও এগুলো উগ্রবাদকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার একটা অংশ হিসেবে দেখতে শক্ত যুক্তি উপস্থাপন করে।

তৃতীয় যে কারণে অনেকে সন্ত্রাসবাদে ঝুঁকে, তা হলো, এই গোষ্ঠীগুলো মানুষকে শক্তিশালী বোধ করার একটা সুযোগ দেয়। যারা হতাশাগ্রস্থ, বিচ্ছিন্ন বা বিরক্ত, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে, তারা নিজের জীবনকে সার্থক করার জন্য কিছু করা সুযোগ পাচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‘এই আন্দোলন (ইসলামিক স্টেট) অন্য যে কোনো সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের তুলনায় কার্যকরভাবে অন্তত একটা কাজ করতে পেরেছে। তা হলো, তারা কারো কাল্পনিক ইচ্ছাকে পুঁজি করতে সিদ্ধহস্ত।’ উদাহরণস্বরূপ, দলে দলে ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে যুবকদের ইসলামিক স্টেটে যোগ দেওয়ার যে খবর পাওয়া গেছে, সেগুলোই প্রমাণ করে, অনেকে অর্থবহ জীবনযাপনের মৌলবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট।

সামাজিক মাধ্যম এবং মানসিক সমস্যা ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ককে সমর্থন করে—এর আরেকটি ভালো উদাহরণ হলো সারনায়েভ সহোদরদের কাহিনী। তারা সামাজিক মাধ্যমেই উগ্রবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং সন্ত্রাসী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। টুইটার, ফেসবুক এবং ইউটিউবে তাদের বিচরণ সে কথাই বলে।

২০১৩ সালে বোস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলা নিয়ে এফবিআইয়ের তদন্তকারীদের মতে,  জোখার ও তামেরলান সারনায়েভ অনলাইনে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও বার্তার মাধ্যমে উগ্র ইসলামী বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকেছিলেন। বড় ভাই তামেরলান অনলাইনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জিহাদি বই-পত্র ডাউনলোড করেছিলেন। এসবের মধ্যে একটি বই ছিল ‘কাফের’দের নিয়ে; ওই বইটির মুখবন্ধ লিখেছিলেন উগ্রপন্থী এক আলেম আনোয়ার আল আওলাকি।

সামাজিক মাধ্যমে চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অবিরাম আনুগত্য প্রকাশের কারণে, সহজেই অনুমান করা যায় যে, সারনায়েভ সহোদরদের মানসিক অবস্থাকে প্রতিফলিত করতে পারে উপরে আলোচিত এক বা সবকটা লক্ষণ। সেগুলো হলো: বিচ্ছিন্ন, বিমোহিত, হতাশাগ্রস্থ এবং অস্থির। আর এ কারণে তারা সামাজিক মাধ্যমে অনলাইন বার্তাগুলো দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয়েছিল এবং উগ্রবাদী হয়ে উঠেছিল।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, হতাশা, বিচ্ছিন্নতা এবং অস্থির ব্যক্তিত্ব—এসব মানসিক সমস্যা থাকলে তাকে নিজেদের দলে সহজেই ভেড়াতে পারে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো। আগের আলোচনাগুলো থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, সামাজিক মাধ্যম মানসিক সমস্যার অন্যতম উৎস। সুতরাং, সামাজিক মাধ্যমকে কেবল সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী দ্বারা ব্যবহৃত একটি সরঞ্জাম হিসেবে বিবেচনা করলেই হবে না, বরং সামাজিক মাধ্যমকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দ্বারা সম্ভাব্য কর্মীদের দলে ভিড়িয়ে উগ্রবাদে প্রলুব্ধ করার প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ হিসাবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।

উপসংহার

খুব দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করার মতো কিছু উপকারী দিক থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মাধ্যম ভুয়া ব্যক্তিত্ব ও মিথ্যা সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখে যা শেষাবধি বিষণ্নতায় রূপ নেয়। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যম অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের প্রাথমিক সহায়ক হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে।

সামাজিক মাধ্যমের ইতিহাস তুলনামূলক নতুন এবং স্বভাবতই এর প্রভাবগুলো নিয়ে গবেষণা অনেক বেশি হয়নি। আমার মনে হয়, সামাজিক মাধ্যমের সুবিধার ওপর প্রায়শই জোর দেওয়া হয়, কিন্তু এর নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সেভাবে আলোচনা করা হয় না।

এমন প্রবণতা অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। আমার বিশ্বাস, আমার এই আলোচনা সামাজিক মাধ্যমের ভালো ও মন্দ—দুই দিক নিয়েই যুক্তিতর্ক দিয়ে ব্যবহারকারীদের ভালোভাবে অবহিত করতে ভূমিকা রাখবে। যদিও পরিবর্তন ভালো, প্রয়োজনীয় এবং অনিবার্য। কিন্তু সহসা কোনো পরিবর্তন আসে না। ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা না করলে দীর্ঘমেয়াদে হয়তো তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা না করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি আরও বাড়বে।

এই উপস্থাপনায় আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি, যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণবিহীন ও যথাযথ পর্যবেক্ষণহীন এই নব মাধ্যমে উদ্ভূত ক্ষতিকর দিকগুলো তলে তলে আমাদের সামাজিক সংহতি এবং প্রচলিত আদর্শ বিনষ্ট করতে পারে। এমন অনিষ্ট হবে যদি নিয়মিত নিরীক্ষণের মধ্য দিয়ে সামাজিক মাধ্যম ও এর প্রভাব সম্পর্কে আমরা সচেতন না থাকি।

মূল : জ্যাকব আমেদি। ভাষান্তর : জাহাঙ্গীর আলম, শিক্ষার্থী, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্যপঞ্জি

  1. Brockman, John. Is the Internet Changing the Way You Think?: The Net's Impact on Our Minds and Future. 2011 ed. New York: Harper Perennial, 2011. 451.
  2. Bannink, Rienke; Broeren, Suzanne; van de Looij – Jansen, Petra M; Cyber and Traditional Bullying Victimization as a Risk Factor for Mental Health Problems and Suicidal Ideation in Adolescents. PLoS ONE. Apr2014, Vol. 9 Issue 4, p1-7. 7p. http://eds.b.ebscohost.com.libproxy.scu.edu/ehost/detail/
  3. Bhui, Kamaldeep, Brian Everitt, and Edgar Jones. "Might Depression, Psychosocial Adversity, and Limited Social Assets Explain Vulnerability to and Resistance against Violent Radicalisation?" PLoS ONE, 2014.
  4. Bryfonski, Dedria. The Global Impact of Social Media. 2011 ed. Detroit, MI: Greenhaven Press, 2012. 224.
  5. Campbell, Marilyn (2005) Cyber bullying: An old problem in a new guise? Australian Journal of Guidance and Counseling, Australian Academic Press, 2005, 76.
  6. Deen, Hana S., and John A. Hendricks. Social Media: Usage and Impact. 2012 ed. Lanham, Md.: Lexington Books, 2012. 307.
  7. Jacobs, Tom; The Link Between Depression and Terrorism; SEP 29, 2014 http://books-andculture/antidepressants-depression-terrorism-weapon
  8. O'keeffe, G. S., and K. Clarke-Pearson. "The Impact of Social Media on Children, Adolescents, and Families." Pediatrics, 2011, 800-04
  9. Saedi, Auzeen, Ph.D., (2012) Psychology Today; Millennial Media; The media saturated generation Y; “Catfish” and the Perils of Online Dating. http://www.psychologytoday.com/blog/millennialmedia/201212/catfish-and-the-perils-online-dating
  10. Spears, Barbara ; Campbell, Marilyn; Slee, Phillip T.2Butler; Cyberbullies’ perceptions of the harm they cause to others and to their own mental health School Psychology International. Dec2013, Vol. 34 Issue 6, p613-629. 17p. http://www.protectachild.com.au/latest_news.php#article80
  11. Weimann, Gabriel; The Psychology of Mass-Mediated Terrorism; American Behavioral Scientist. Sep2008, Vol. 52 Issue 1, p69-86. 18p http://eds.a.ebscohost.com.libproxy.scu.edu/ehost/detail/
  12. Mark W. Becker, Reem Alzahabi, and Christopher J. Hopwood. Cyberpsychology, Behavior, and Social Networking. February 2013
  13. Becker, Mark W., Reem Alzahabi, and Christopher J. Hopwood. Media Multitasking Is Associated with Symptoms of Depression and Social Anxiety. Cyberpsychology, Behavior, and Social Networking 16, no. 2 (2013): 132-35. Accessed August 27, 2015
  14. 14. Starr, Lisa; Davilla, Joanne Dr. ; Excessive Discussion Of Problems Between Adolescent Friends May Lead To Depression And Anxiety. Stony Brook University . January 27, 2009.

 

প্রথম পর্ব : মানবসমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

দ্বিতীয় পর্ব : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানসিক সমস্যা

তৃতীয় পর্ব : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধবৃত্তি

 
advertisement
Evaly
advertisement