advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি

দুর্লভ বিশ্বাস
২৩ জুন ২০২০ ১৭:২৬ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২০ ১৭:২৬
advertisement

‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ বহুল প্রচলিত এই গ্রামীণ প্রবাদটি কবে, কীভাবে এবং কী কারণে প্রচলিত হয়েছিল তা জানা সম্ভব হয়নি। দুর্বলের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, অপরের সম্পত্তি দখল, মিথ্যা বলা, ব্যভিচার করা এবং অবৈধভাবে বিত্ত-বৈভব উর্পাজন করাসহ নানা প্রকার সমাজ গর্হিত কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা প্রত্যেক ধর্মের নির্দেশ রয়েছে।

কালের বিবর্তনক্রমে মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী হচ্ছে। একই ভাবে সংখ্যায় কম হলেও এ সমাজেরই কিছু সংখ্যক মানুষ ধর্মীয় এই বিধানাবলীর প্রতি অবলীলায় বৃদ্ধাঙ্গলী প্রদর্শন করে চলেছে।

যুগ-যুগান্তর ধরে মানুষের লেভাসধারী অমানুষ কর্তৃক ধর্মীয় সেই বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে অধর্মীয় তথা সমাজ গর্হিত কাজগুলো অবলীলায় করে আসার প্রেক্ষিতেই কোনো এক মহাপণ্ডিত কর্তৃক ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ প্রবাদটির হয়তো প্রচলন করেছিলেন বলে অনেকের ধারণা।

গ্রাম বাংলায় প্রচলিত এ প্রবাদটির উৎপত্তি যে ভাবেই হোক প্রবাদটি যে সত্য তা কিন্তু ইতিহাসই স্বাক্ষী দেয়। মহামারি বা মানবতার যত বিপর্যয়ই ঘটুক মানুষের এই লেবাসধারীদের তাতে কিছু যায় আসে না তা ইতিহাসেই পাওয়া যায়।

সারা পৃথিবীর কথা বাদ দিলেও আমাদের এ উপমহাদেশ মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ এবং পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন স্থানে ১১ শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত একাধিকবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। যাতে প্রায় কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও মজুদদার-মুনাফা খোররা যে দুর্ভিক্ষের জন্য কম দায়ী ছিল না যা-ইতিহাস স্বাক্ষী দেয়।

জগৎ শেঠ. উমিচাঁদ, রায় বল্লভ, রায় দুর্লভ এবং মীর কাশেমসহ সে যুগের ধনকুবেরগণ শুধু ধর্মীয় বিধি বিধান লঙ্ঘন করেননি, বিত্ত-বৈভবের জন্য নবাব সিরাজউদ্দোলার বিরুদ্ধে থেকে ইংরেজ বেনিয়াদের সঙ্গে হাত মিলাতেও দ্বিধা করেনি যা ইতিহাসই বলে দিচ্ছে।

১৯৪৩-র ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সে সময়ের যুক্ত বাংলায় অনাহার অর্ধাহারে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এজন্য ব্রিটিশ সরকার যেমন দায়ী, তেমনি তখনকার  বাংলার মজুদদার মুনাফাখোরদের কারসাজিতে সে আমলে লবনের সের যে ১০ টাকা হয়েছিল, তা ইতিহাস থেকেই জানা যায়। ধর্মের বিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে মানুষকে অনাহার ও অর্ধাহারে ঠেলে দিয়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করতেও মানুষের লেভাসধারীদের বিবেকে একটু বাধেনি। ধর্ম বা কোনো মহাপুরুষের শ্বাশত বাণী এদের কানে প্রবেশ করে না। এরা শুধু চেনে টাকা আর সম্পদ। যা উপার্জনে বৈধতা বা অবৈধতার ধার ধারে না। অন্যের শোক, দুঃখ কষ্ট বা অভাব অনটন এদের এতটুকু বিচলিত করে না। মানুষের লেভাসধারী এই লোভাতুরদের অস্তিত্ব সমাজে অতীতেও ছিল বর্তমানে কিন্তু রয়েছে।

শকুনের দৃষ্টি যেমন ভাগাড়ের দিকে থাকে তেমনি মানুষের লেভাসধারী অমানুষদের লোভাতুর দৃষ্টি থাকে কখন দেশে মহামারি আসে তার দিকে। কারণ কাড়ি কাড়ি অর্থ কামায়ের সেই তো তাদের মোক্ষম সময়। মানুষের জীবনের চেয়ে অর্থের মূল্যই এদের কাছে বেশি। তাই মানুষের জীবন বিপন্ন করে অর্থ উপার্জনেও এরা দ্বিধা করে না। মানুষের লেবাসধারীরা কখনো কখনো ধর্মের নামেও হিংস্র হতে দ্বিধা করে না। যেমন ১৯৭১-এ এই দেশে ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে মানুষের লেবাসধারী পাকিস্তানীদের ভয়ঙ্কর হিংস্রতার কথা আমাদের সবার জানা। মসজিদে মসজিদে নামাজরত অবস্থায় বাঙালি মুসলমানদের পাকিস্তানীরা পৌচাসিক উল্লাসে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি যা বিশ্ববাসীও প্রত্যক্ষ করেছেন। ধর্মের বাণীর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি  প্রদর্শনকারীদের কারসাজিতেই ১৯৭৩ সালের শেষভাগে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে লবনের কেজি ৫০/৬০ টাকা হয়েছিল। এদের বিরুদ্ধে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান একাধিকবার কঠোর ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের গ্রাস নিয়ে যারা খেলা করছেন, সেই মজুদদার, মুনাফাখোর ও চোরাকারবারিদের ছাড়া হবে না।’ জাতির পিতার সে সময়ের বক্তৃতার রেকর্ড ঘাটলে তার সত্যতা এখনো পাওয়া যাবে।

ধর্মকে যে এরা থোরাই পরোয়া করে তার প্রমাণ তো আমরা প্রতি রমজানেই পেয়ে থাকি। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য-সামগ্রী পর্যাপ্ত থাকার পরও রমজান মাসে এই মুনাফাখোরা দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকারের কঠোর হুশিয়ারিও কোনো কাজে আসে না, যা আমরা প্রতি বছরই প্রত্যক্ষ করি।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কথাও সবার জানা। করোনাভাইরাস নামক এক অদৃশ্য ভাইরাসের হিংস্র থাবায় সারা বিশ্ব কম্পমান। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও এর ভয়াল, হিংস্র থাবা থেকে রেহাই পায়নি। একদিকে ভাইরাসটি নতুন অন্যদিকে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা কম থাকায় এ ভাইরাস প্রতিরোধে প্রথম দিকে সরকারের প্রস্তুতি অনেকের মতে কম ছিল। তা ছাড়া অভিজ্ঞতাতেও ঘাটতি ছিল। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার এই মরণব্যাধি প্রতিরোধে সাধ্যানুসারে সব কিছু করতে শুরু করেন। কিন্তু সরকারের এ প্রচেষ্টাতে ধর্মের শ্বাশত বাণী যাদের কাছে অর্থহীন এবং যাদের কাছে মানুষের জীবন নয় নিজেদের আখের গুছানোই মুখ্য সেই চোরারাও ছলে বলে কৌশলে জায়গা করে নেয়। এই চোরারাই এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করতে দ্বিধা করেনি বলে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পারে। একই ভাবে করোনার বিরুদ্ধে ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধাদের জন্য হ্যান্ড গ্লাভস, বোটসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দামও অনেক বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে বলে একইভাবে দেশের মানুষ জানতে পেরেছে। এ ছাড়া বিমানে বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের করোনা নাই এ ধরনের ভুয়া ছাড়পত্র দিয়ে বিদেশে আমাদের ভাব মুর্তি ক্ষুণ্ন করতে দ্বিধা করেনি।

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এই মহামারির সময়ে মানবতার শত্রু সেই অর্থ পিপাসুদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করবে বলে খবরও বেরিয়েছে যা খবরের কাগজগুলোর মাধ্যমে আমরা জেনেছি।

এ দিকে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। ফলে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্থান সংকোলন হচ্ছে না। এমতবস্থায় সরকার দেশের বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালের মালিকদের করোনা প্রতিরোধে সহযোগিতার আহ্বান জানান। বারবার আহ্বান জানানোর পর কয়েকটি হাসপাতাল এগিয়ে এলেও তাতে চিকিৎসা ব্যয় ধরা হয় আকাশ ছোয়া। নমুনা পরীক্ষার জন্য সরকার হাসপাতালে ৩ হাজার ৫০০ টাকা ধার্য্য করে দিলেও আরও ২/৩ প্রকার পরীক্ষার নামে এসব হাসপাতালে যারা নমুনা পরীক্ষার জন্য যান তাদের কাছ থেকে ৬/৭ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। তা ছাড়া এসব নামি-দামি হাসপাতালে একটি নাপা বা প্যারাসিটামল ট্যাবলেটের দাম ১৩/১৪ টাকা নেওয়া হয় বলে একটি বেসরকারি চ্যানেল খবর দিয়েছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের করোনা নেই এমন ছাড়পত্র ছাড়া মানবতার সেবার নামে গড়ে উঠা এসব হাসপাতালে চিকিৎসা তো দূরের কথা ওই সব রোগীদের হাসপাতালের চৌকাঠ পর্যন্ত পেরোতে দেওয়া হয় না। এ কারণে এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে আবার সেখান থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরতে হয়। অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়িতে এভাবে ঘুরতে ঘুরতে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে যার সংখ্যাও প্রায় শতাধিক হবে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। হাসপাতালগুলোর এ ধরনের ব্যবহারে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে তা ফৌজদারী অপরাধের শামিল হবে বলে হাইকোর্ট ঘোষণা দিয়েছে যা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে।

অত্যাধুনিক এসব বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরাই সরকারি করও অনেক কম দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এই মহামারির সময়ে এসব আধুনিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আচারন যেন ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ গ্রামীণ সেই প্রবাদটি যে সত্য তা আবার প্রমাণ হলো না কি?

দেশের অর্থনীতিতে পোষক শিল্পখাতের ভূমিকা অপরিসীম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এ খাতের ভূমিকা বিরাট। প্রায় ৪০ লাখ নারী-পুরুষ এ খাতে কর্মরত। এ খাত যাতে টিকে থাকে সেজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমে এ খাতকে বড় অঙ্কের  প্রণোদনা দিয়েছেন। তারপরও লোকসানের কথা বলে এ খাত থেকে শ্রমিক ছাটাই করা হচ্ছে যা এ খাতের মালিকদের প্রতি মাননীয় সেতুমন্ত্রীর বারবার অনুরোধ থেকেই বুঝা যাচ্ছে। সবাই না হলেও কোনো কোনো মালিক যে গবির শ্রমিকদের এই দুঃসময়ে ছাটাই করে ধর্মের সেই শ্বাশত বাণীতে ভ্রুক্ষেপ করছেন তা কি তারা প্রমাণ করছেন না?

একই ভাবে সেসরকারি ব্যাংক মালিকরাও তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। নিজেদের ভোগ বিলাস আরাম আয়েস ঠিক রেখে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা কমানোকে তো অনেকে ব্যভিচারের সঙ্গে তুলনা করছেন। যারা মালিক সমিতির এ সিদ্ধান্তকে ব্যভিচার বলছেন তাদেরকে কি দোষ দেওয়া যাবে?

তাই কেউ যদি বলেন দুর্যোগ মহামারিকে কাজে লাগিয়ে যারা নিজেদের আখের গোছাতে সদা ব্যস্ত, সেই স্বার্থপরদের কাছে না হলেও অনেকের কাছেই মানব কল্যাণে ধর্মের শ্বাশত বাণী এখনো মূল্যবান। এদেরই অন্যতম একজন হলেন শেরপুর জেলার শ্রীবর্দি উপজেলার বৃদ্ধ ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন। যিনি কোনো চাওয়া-পাওয়া বা প্রণোদনার কথা না ভেবে তার সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ করোনাভাইরাস জনিত মহামারিকালে নিজের কথা জিন্তা না করে অপরের জন্য দান করেছেন।

এই নাজিম উদ্দিনের মতো আরও হয়তো কেউ কেউ থাকতে পারেন। এ ধরনের নাজিম উদ্দিনদের সংখ্যা যতই সমাজে বাড়বে ততই ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি” গ্রাম বাংলার এ প্রবাদটির প্রাসঙ্গিকতা হারাবে। বিদ্যজনেরা তো এমনটাই মনে করেন।

লেখক : অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস, সংবাদকর্মী, সাবেক কমান্ডার মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল।

   

 

 

advertisement
Evaly
advertisement