advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাজেটে কৃষকের প্রত্যাশা

রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়
২৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২০ ০৯:১২
advertisement

মানবজাতি আজ নজিরবিহীন দুরবস্থায় নিপতিত। করোনা ভাইরাসে বিশ^ব্যাপী মহাসংকট সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ করোনার আক্রমণে ক্রমাগত বিপদ থেকে মহাবিপদের দিকে এগিয়ে চলেছে। এ সংকটময় সময়ে পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এই বাংলাদেশে ২০২০-২১ সালের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটের আকার যেমন বড়, তেমনি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মাথার ওপর করের বোঝা তার থেকেও বড়। সর্বমোট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ রয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণ হবে জনগণের ওপর করের ভ্যাটের বোঝা বাড়িয়ে, বৈদেশিক ঋণগ্রহণ করে এবং ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে। এর সবকিছুর প্রতিক্রিয়া হবে জনগণের জন্য কষ্টকর, বেদনাদায়ক। করের বোঝা বাড়লে জনগণের জীবনযাত্রা নি¤œগামী হবে। বৈদেশিক ঋণ জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে এবং সরকার ব্যাংক থেকে টাকা নিলে ব্যাংকের নগদ অর্থে কম পড়বে। বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে। জনগণের সংকট বাড়তে থাকবে।

আমাদের আলোচনা বাজেটে কৃষকের অবস্থানের ওপরই সীমাবদ্ধ রাখব। তবে শহরের স্থানীয় শ্রমিকসহ সব শ্রমজীবী মানুষ কৃষকদের মতোই দারিদ্র্যের নি¤œস্তরে তলিয়ে যাবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, শহরের শ্রমিক ও কৃষকদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া কোনো জাতীয় উন্নয়ন বা অগ্রগতি প্রত্যাশা করা যায় না।

আমরা আগেই বলেছি, বিশ^ অর্থনীতি বিধ্বস্ত। বাংলাদেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। জাতীয় অর্থনীতির এ পরিস্থতিকে সামাল দেওয়া যেতÑ যদি কার্যক্রমের শুরু থেকেই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। কিউবা, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, চীন, থাইল্যান্ড যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলÑ এর থেকে আমরা অভিজ্ঞতা নিতে পারতাম। নিকট প্রতিবেশী নেপাল এখনো অসাধ্য সাধন করে চলেছে। যাই হোক, এখন রাষ্ট্র যে পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়েÑ আমরা যদি বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারি, তা হলে এখনো শেষ রক্ষা হতে পারে। আর ওই পদক্ষেপ নিতে হবে এবারকার বাজেটেই এবং তা গ্রহণ করতে হবে কৃষি ক্ষেত্রে।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিল্প আজও প্রধান উন্নয়ন উপকরণ হিসেবে বিবেচিত নয়। এখনো কৃষিতে জনবল বেশি খাটে। ভোগ্যপণ্যের মোটা অংশটি কৃষি থেকেই উৎপাদিত হয়। এখনো আমাদের দেশের শিল্পের কাঁচামালের বড় একটা অংশ (পাট, তুলা, আখ, তামাক প্রভৃতি) কৃষি উৎপাদন থেকেই আসে। তবুও আমাদের পাললিক জমির উর্বরতা এবং পরিশ্রমী-মেধাবী কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তা আমাদের মহামূল্যবান সম্পদ। এই সুযোগ-সুবিধা ও কৃষি ক্ষেত্র কাজে লাগিয়ে আমরা করোনা আক্রান্তের লোকসান শুধু পুষিয়ে নিতে পারি তা-ই নয়, আমরা আরও অধিক পরিমাণে উন্নয়নের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে পারি। উর্বর ভূমি ও দক্ষ কৃষক জনবলকে অবলম্বন করে গ্রামাঞ্চল বা উপজেলা পর্যায়ে কৃষির প্রয়োজনীয় শিল্পেরও আমরা বিকাশ ঘটাতে পারি। এর বাস্তব প্রতিফলন বাজেটে নিয়ে আসতে হবে। আমরা পারি কৃষির সব সরঞ্জাম তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে। এতে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাতে পারি। আমরা সার-বীজ-কীটনাশকের মতো অতি আবশ্যকীয় সামগ্রীগুলোর উৎপাদনের জন্য গ্রামাঞ্চলে কারখানা প্রতিষ্ঠা করত পারি। আমাদের কৃষকদের সামান্য প্রশিক্ষণ দিলে বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে তা বিদেশে রপ্তানি করে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা আমরা অর্জন করতে পারি। নিজ দেশে জৈবসারের অজ¯্র কাঁচামাল রয়েছে আমাদের। কীটনাশকের জন্য কেবল নিমগাছ থেকে আমরা যেসব মূল্যবান সামগ্রী উৎপাদন করতে পারি, তা বিশ^বাসীর কাছে অভাবনীয়। এ ক্ষেত্রেও চাই বাজেটের সুষ্ঠু প্রণোদনা। এক কথায়Ñ আমাদের জমি, মাটি, সুপেয় পানি ও কৃষকদের ওপর নির্ভর করাটাই এখন কর্তব্য।

২০২০-২১ অর্থবছরের যে বাজেট উত্থাপিত হয়েছে, এতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আমরা বিনয়ের সঙ্গে স্পষ্ট কথা বলতে চাই, এই বরাদ্দ সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। এতক্ষণ আমরা যে আলোচনা করলাম, এতে বোঝা যায়Ñ এই বরাদ্দের পরিমাণ আরও অনেক বেশি বাড়াতে হবে। কারণ এই যে বরাদ্দ-এর মধ্যে সারাদেশের কৃষি কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবকাঠামো গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, গাড়ি-ঘোড়া, যাতায়াত-যোগাযোগ ইত্যাদির ব্যয়ও সংযুক্ত আছে। এ সব কিছুর খরচ মিটিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রকৃত কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের হাতে পৌঁছবে সামান্যই। যাই হোক, বর্তমান করোনা আক্রান্তের দেশে বিধ্বস্তপ্রায় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য আমরা আবারও কৃষি খাতের ওপর জোর দিতে বলব, গুরুত্ব দিতে বলব। এ উপলক্ষে করণীয় বিবেচনার জন্য আমরা এখানে উত্থাপন করলাম-

১। প্রথম কথা হলো, বাজেটে কৃষি খাতে টাকার অঙ্ক অনেক বাড়াতে হবে। এই উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধনের দাবি রাখে।

২। সব ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও কৃষক হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

৩। টেকসই উন্নয়নের বাস্তব কর্মসূচির দর্শন ঠিক করতে হবে জনগণের কল্যাণের দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

৪। কৃষিতে সমবায় প্রথা চালু করতে হবে। উৎপাদনের পর সব পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন ও বিতরণের সব দায়িত্ব সরকারকে পালন করতে হবে। এতে একদিকে যেমন বিপুল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, তেমনি অন্যদিকে অর্থনীতির সচলতা নতুন মাত্রা পাবে।

৫। কৃষিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দূর করতে হবে। চাঁদাবাজ, দলবাজ ও প্রতারণাকারীদের বিদায় করতে হবে।

৬। আরও কম সুদে কৃষকদের ঋণ দিতে হবে। কৃষি সংক্রান্ত বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

৭। গ্রামাঞ্চলে চাল, ডাল, তেল, নুন, চিনি, আটা ও শিশুখাদ্য স্বপ্লমূল্যে দিতে হবে।

৮। ক্ষেতমজুরদের বেকার ভাতার ব্যবস্থা বাজেটে থাকতে হবে। ভূমিহীনদের খাসজমির বন্দোবস্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং এর উল্লেখ বাজেটে আনতে হবে।

৯। মাছ-চিংড়ি, দুধ-ডিম, মাংস (গরু-ছাগল) প্রভৃতি উৎপাদনকারীদের প্রতি বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখলে চাহিদা মিটিয়ে এগুলো রপ্তানিও সম্ভব।

১০। ভূমি সংস্কার করে অকৃষকদের হাতের জমি প্রকৃত কৃষকদের দিয়ে তাদের ভূমির মালিকানা দিতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাজেটে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই চলবে না। এর সঠিক বাস্তবায়ন হলো গুরুত্বপূর্র্ণ। কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর সব দপ্তর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্র্ণ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করে তা যথাযথভাবে কার্যকর করতে পারলেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।

রণজিৎ চট্টোপাধ্যায় : লেখক ও গবেষক

 

advertisement