advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বৈশ্বিক রূপ

তারেক শামসুর রেহমান
২৫ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২০ ১৩:৪৯
ড. তারেক শামসুর রেহমান
advertisement

সারাবিশ্ব আজ বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে উত্তালন। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রায় এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বড় শহরে যে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, তা ছড়িয়ে গেছে আটলান্টিকের অপর পাড়ের দেশ যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের প্রতিটি দেশে। লন্ডনে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের সামনে স্থাপিত চার্চিলের স্ট্যাচুও সরিয়ে ফেলতে চাইছে-অভিযোগ চার্চিল বর্ণবাদী রাজনীতি সমর্থন করতেন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়াতেও এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। সমসাময়িক কালে বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদবিরোধী এমন আন্দোলন আর দেখা যায়নি। গত ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে পুলিশের হাঁটুর নিচে শ^াসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর আবারও ফুঁসে উঠছে আমেরিকা। ‘ব্লাক লাইভ ম্যাটারস’-এর ব্যানারে চার সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বিক্ষোভের কারণে চাপা পড়ে গেছে করোনা ভাইরাসের মৃত্যুর খবরটি পর্যন্ত। মিডিয়ায় এখন জর্জ ফ্লয়েড আর বিক্ষোভের খবর যত বেশি প্রচার পাচ্ছে, ততটা প্রচার পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রের করোনা ভাইরাসের মৃত্যুর খবর। অথচ গত ১৬ জুন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গেছে ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৩ জন। স্বাস্থ্য খাতে এই অব্যবস্থাপনা যখন চরমে পৌঁছেছে, যখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ সেখানে বাড়ছিল, তখনই জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ফুঁসে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। মানুষ সেখানে এখন বর্ণবাদ নিয়ে যত কথা বলে, করোনা ভাইরাস নিয়ে অত কথা বলে না। এরই মাঝে আবার যোগ হয়েছে আরেক কৃষ্ণাঙ্গ রেজার্ড ব্রুকসের মৃত্যুর খবর।

তবে এটি ঠিক, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বর্ণবাদ যে কত শক্তভাবে অবস্থান করছে, শে^তাঙ্গ পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুই এর সর্বশেষ উদাহরণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ নিয়ে শত শত গবেষণাপত্র ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব গবেষণাপত্রে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গরা শে^তাঙ্গদের চাইতে পিছিয়ে আছে। ইতিহাস বলে, ১৬১৯ সালে আজকের যে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্য, সেখানে প্রথম আফ্রিকান নাগরিকদের দাস ব্যবসার মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়েছিল। আজকের অ্যাঙ্গোলা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের পর্তুগিজ দাস ব্যবসায়ীরা চুরি করে নিয়ে এসেছিল। সাগরে ব্রিটিশ ডাকাতরা পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের ছিনিয়ে নিয়েছিল। এর পরের ইতিহাস সবাই জানে-কৃষ্ণাঙ্গরা যুক্তরাষ্ট্রে দাস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৮৬৫ সালে এই দাস ব্যবসার বিলুপ্তি ঘোষণা করা হলেও কৃষ্ণাঙ্গদের (মোট জনসংখ্যার ১৩ ভাগ) জীবনযাত্রার মানের কোনো উন্নতি হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গরা প্রতিটি ক্ষেত্রে-শিক্ষায়, চাকরিতে, ব্যবসায় আজও অবহেলিত। এমনকি করোনা ভাইরাসে তুলনামূলক বিচারে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর হার শ্বেতাঙ্গদের চাইতে বেশি। কৃষ্ণাঙ্গদের অনেকেরই কোনো স্বাস্থ্যবীমা নেই। ফলে অবহেলা, বিচার না পাওয়া, বেকারত্ব, অবর্ণনীয় জীবনযাপন কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে বারবার রাস্তায় টেনে নিয়ে আসে। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বারবার সমতা বজায় রাখা, তাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতির দাবি জানানো হলেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মাঝে যে ক্ষোভ ছিল, তা আবার বিস্ফোরিত হয়েছে। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক এরিক গার্নারের মৃত্যুর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পুলিশ যখন গার্নারের গলা চেপে ধরেছিল, গার্নারকেও বলতে শোনা গিয়েছিল ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না!’ জর্জ ফ্লয়েডও একই প্রক্রিয়ায় একই কথা বললেন এবং পুলিশ হেফাজতে মারা গেলেন। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর খবরটিও সামনে চলে এসেছে। ‘ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স’-এর তথ্যমতে, গত বছর পুলিশ হেফাজতে যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছে এক হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে শতকরা ২৪ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ। অথচ জনসংখ্যার মাত্র ১৩ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ, কিন্তু পুলিশ হেফাজতে তাদের মৃত্যুহার বেশি। এমনকি ১৯৮০-২০১৯ সাল পর্যন্ত যারা জেলে ছিলেন তাদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, জেলে বন্দি জনগোষ্ঠীর ৩৪ ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ। গবেষণায় দেখা গেছে, পুলিশ হেফাজতে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের চাইতে শতকরা ৬ ভাগ, আর জার্মানির চাইতে ৪ ভাগ বেশি মানুষ মারা যায়। আরও দুঃখজনক খবর হচ্ছে, ২০১৩-২০১৯ সালে পুলিশ নির্যাতনের (যুক্তরাষ্ট্র) ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের আদৌ কোনো বিচার হয়নি। বর্ণবাদ যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকে বিভক্ত করেছে। বলা হচ্ছে, ‘মহামারীর মধ্যে এই বর্ণবাদ আরেকটি মহামারী।’ দুঃখজনক হচ্ছে এটাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৪৪ বছরের ইতিহাসে জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে তাদের ন্যূনতম অধিকারের দাবিতে এখনো আন্দোলনে নামতে হয়। তবে এবারের আন্দোলনের চরিত্র একটু ভিন্নতর। এই আন্দোলনের একটি বৈশি^ক রূপ পেয়েছে। লন্ডন কিংবা জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে যে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, তাতে স্থানীয়ভাবে যারা দাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিংবা বর্ণবাদী রাজনীতিকে সমর্থন করতেন, তাদের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ পরিলক্ষিত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলের একজন দাস ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ এডওয়ার্ড কোলস্টোনের স্ট্যাচুও সরিয়ে নিয়ে একটি পুকুরে ফেলে দেয়। কোলস্টোনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সতেরো শতকে কৃষ্ণাঙ্গ দাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে প্রচুর অর্থবিত্ত অর্জন করেছিলেন। চার্চিলের স্ট্যাচুও তারা সরাতে চায়। জুনের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতেও সেখানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিক্ষোভকারীরা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো লুণ্ঠন করেছে। আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠান আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। এসব বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শে^তাঙ্গদের দখলে। শে^তাঙ্গদের প্রতি ক্ষোভটা কেন তা আগুন ও লুট করার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত, এটাই হচ্ছে বিক্ষোভের মূল কারণ। বলতে ™ি^ধা নেই যে, চার বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেভাবে ‘হোয়াইট সুপ্রেমেসি’র ধারণা প্রমোট করছেন তাতে একদিকে কৃষ্ণাঙ্গরা, অন্যদিকে এশীয় ও হিস্পানিক বংশোদ্ভূতরা এক ধরনের আতঙ্কে ভুগছেন। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তাদের যে অধিকার দিয়েছে, তা ট্রাম্প খর্ব করছেন বা খর্ব করতে চাচ্ছেন। বিক্ষোভের পেছনে এটাই মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গরা বরাবরই অবহেলিত। তাদের চাকরির বাজার সীমাবদ্ধ। বেকারত্বের হার তাদের মাঝে বেশি। পিউ (Pew) রিসার্চ সেন্টারের মতে, জি৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অসমতার হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মাঝে আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ১৯৬৩ সালে শে^তাঙ্গ পরিবারপ্রতি মাত্র ১ লাখ ২১ হাজার ডলার (বছরে), ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শ্বেতাঙ্গ পরিবারপ্রতি ৯ লাখ ১৯ হাজার ডলার, আর কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারপ্রতি মাত্র ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার (আর হিস্পানিক বা স্প্যানিশ বংশোদ্ভূতদের ১ লাখ ৯২ হাজার ডলার)। এতে দেখা যায়, একটি কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের চাইতে একটি শে^তাঙ্গ পরিবার ৭ লাখ ডলার বেশি আয় করে। এত বছরেও এই বৈষম্য কমেনি, বরং বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে, সমাজের শীর্ষ পদগুলো শুধু শে^তাঙ্গদের জন্যই অলিখিতভাবে নির্ধারিত। কৃষ্ণাঙ্গদের সেখানে কোনো প্রবেশাধিকার নেই। এতে করে কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। এই ক্ষোভই বারবার এ ধরনের আন্দোলনের জš§ দেয়। যদিও এটা ঠিক, ৩০ কোটির অধিক জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শে^তাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আধিক্য বেশি, শতকরা ৭২ দশমিক ৪১ ভাগ, আর কৃষ্ণাঙ্গদের মাত্র ১২ দশমিক ৬১ ভাগ। তুলনামূলক বিচারে কৃষ্ণাঙ্গদের চাকরির কোনো গ্যারান্টি নেই। এক ধরনের হতাশার মধ্যে থেকে তাদের মাঝে হিংসাত্মক প্রবণতার জš§ হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে সমঅধিকার স্বীকৃত হয়নি এত বছর পরও। ™ি^তীয় শ্রেণির নাগরিক জীবন তাদের। শিক্ষা নেই, বাসস্থান নেই, চাকরি নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই, দারিদ্র্য তাদের মাঝে চরমে। কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই তাদের মূল ধারায় নিয়ে আসতে পারেননি। ফ্লয়েডের মৃত্যু তাই স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করেছে। কিন্তু জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদরা কি কোনো শিক্ষা নেবেন? মনে হয় না তারা কোনো শিক্ষা নেবেন। যেভাবে ট্রাম্প কথা বলেন, হুমকি দেন, তাতে এটা স্পষ্ট-তিনি এই আন্দোলনকে আদৌ গুরুত্ব দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির জন্য এটাই একটা বড় ব্যর্থতা।

 

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

 

advertisement
Evaly
advertisement