advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বুড়িগঙ্গা পাড়ে লাশের সারি

লঞ্চের ধাক্কায় লঞ্চডুবি ৩২ জনের লাশ উদ্ধার পুরুষ ২১ নারী ৮ ও শিশু ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি
৩০ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২০ ২২:৫২
advertisement

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশেও প্রতিদিনই কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। চারপাশে অস্থিরতা, আতঙ্ক। শোক। এর মধ্যেই ঘটে গেল আরেকটি বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা। শোক বইতে যুক্ত হলো অন্তত ৩২ নাম। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর শ্যামবাজার-ফরাশগঞ্জ এলাকায় যাত্রীবাহী একটি লঞ্চডুবির ঘটনায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতা এখনো অব্যাহত আছে।

গতকাল সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গের সামনে ভিড় করেন নিহতদের স্বজনরা। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। শোকে-তাপে অনেককে করোনার আতঙ্ক ভুলে জনসমাগমের ভেতরই মাস্ক খুলে ফেলতে দেখা যায়। প্রিয়জনকে চিরতরে হারানোর ব্যথা সইতে না পেরে কেউ কেউ মূর্ছা যান। স্বজনদের পাশাপাশি উৎসুক জনতা করোনা ভাইরাস আতঙ্ক উপেক্ষা করে ভিড় জমান ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায়।

অন্যদিকে, লাশ উদ্ধার হওয়া স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। কেউ কেউ প্রিয়জনের লাশ শনাক্ত করে কাঁদছেন। কেউবা প্রিয়জনের খোঁজ না পেয়ে কাঁদছেন। তাদের স্বজনরা আরও বেশি দিশেহারা। কারণ তারা জানতেই পারছেন না প্রিয় মানুষটির ভাগ্যে কী ঘটেছে। এমনই এক অসহায় স্বজন মো. সেলিম। ভগ্নিপতির লাশের জন্য পাগলপ্রায় ষাটোর্ধ্ব নারায়ণগঞ্জের মো. সেলিম বুড়িগঙ্গা তীরে ছুটে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তার ভগ্নিপতির নাম মনির হোসেন। বয়স ৫০ বছরের মতো হবে। লঞ্চে করে তিনি ঢাকায় আসছিলেন। লঞ্চডুবির পর থেকে তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। সকাল থেকে তার ফোনও বন্ধ।’

স্কুল-কলেজ পড়–য়া তিন ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে পুরান ঢাকার কসাইটুলিতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন জজকোর্টে মুহুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা আবদুর রহমান। করোনা ভাইরাস সংকটে কাজ না থাকায় দুই মাস আগে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি মিরকাদিম আব্দুল্লাহপুরে চলে গিয়েছিলেন। এবার ঢাকার ওই বাসার মালপত্র বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্ত্রী হাসিনা রহমান ও আট বছরের ছেলে সিফাতকে নিয়ে গতকাল সকালে সদরঘাটমুখী লঞ্চে উঠেছিলেন আবদুর রহমান। বুড়িগঙ্গা

নদীতে ডুবে যায় তাদের লঞ্চ। এরই মধ্যে হাসিনা রহমান (৩৫) ও তার ছেলে সিফাতের লাশ উদ্ধার করা হলেও আবদুর রহমানে খোঁজ এখনো পাননি স্বজনরা।

চলমান করোনা মহামারীর মধ্যে লঞ্চ দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণ হারানোর ঘটনা নিয়ে শোকের মাতম চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।

এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ডুবুরি দল, নৌবাহিনী, ২টি হেলিকাপ্টার, নৌপুলিশসহ স্থানীয় ও সামাজিক সংগঠনের লোকজন উদ্ধারে অংশগ্রহণ করেন। এ ঘটনায় ৭ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার সকাল নয়টার দিকে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে এমএল মর্নিং বার্ড নামের ছোট্ট দোতলা লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি এলাকা থেকে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। ময়ূর-২ নামের একটি লঞ্চ সদরঘাট লালপট্টি থেকে চাঁদপুরের দিকে যাচ্ছিল। ওই লঞ্চটি মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়। এতে মর্নিং বার্ড ডুবে যায়।

এই ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ ধরা পড়েছে নদীপারের একটি সিসি ক্যামেরায়। তাতে দেখা যায়, এমএল মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ভেড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় পেছন দিক থেকে আচমকা ময়ূর-২ লঞ্চটি মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়। লঞ্চটি পুরো ডুবে গেলে আবার পেছনের দিকে সরে যেতে থাকে বড় আকৃতির ময়ূর-২ লঞ্চটি।

দুর্ঘটনার পর সাঁতার কেটে কিছু যাত্রী তীরে উঠতে পারলেও বেশিরভাগ যাত্রী নদীতে ডুবে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। এ সময় ডুবুরি দল নদী থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করে। নিহতের মধ্যে রয়েছে ২১ জন পুরুষ, ৮ জন নারী, ৩ জন শিশু। নিখোঁজ রয়েছে আরও অনেকেই। নদী তীরবর্তী এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক একেএম আরিফউদ্দিন জানান, ধাক্কা দেওয়া লঞ্চ ময়ূর-২ জব্দ করা হয়েছে। তবে লঞ্চের চালক পালিয়ে গেছেন।

মুন্সীগঞ্জের সত্যরঞ্জন বণিক আর আবদুর রউফ প্রতিদিনের মতো গতকাল সকালেও মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে মর্নিং বার্ড লঞ্চটিতে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন। তারা প্রায় ২০ বছর ধরে এই লঞ্চলে প্রতিদিন মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকা এসে কাজ শেষে আবার বিকালে বাড়ি ফিরতেন। লঞ্চ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া আবদুর রউফ বলেন, ‘লঞ্চটি সদরঘাটের একেবার কাছে চলে আসে। আমরা নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ঘাটের খালি একটি লঞ্চ আমাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। ভয়ে আমরা সবাই চিৎকার দিই। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে লঞ্চটি উল্টে যায়। আমরা ছিলাম লঞ্চের নিচের তলায়। পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকি। দম আমার বের হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি পানির ওপরে উঠতে পারি। বেঁচে যাই। কিন্তু আমার বন্ধু সত্যরঞ্জন উঠতে পারেনি, সে মারা গেছে।’

মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর থানার ঘুপপাড়া গ্রামের আবু সাঈদ (৪০)। লঞ্চডুবিতে প্রাণ গেছে তার। ঢাকার বাদামতলী থেকে ফল নিয়ে মুন্সীগঞ্জেই ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানের পরিবারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। ঢাকার বাদামতলী থেকে ফল নিতে বন্ধু ফল ব্যবসায়ী সোহাগের সঙ্গে সকালে লঞ্চে উঠেছিলেন। বন্ধু সোহাগ লঞ্চ ডুবে যাওয়ার আগেই লাফিয়ে প্রাণ নিয়ে বাঁচতে পারলেও বের হতে না পারায় প্রাণ গেছে আবু সাঈদের।

আবু সাঈদের স্ত্রী নূরজাহান জানান, তাদের সজিব (১৪) এবং সামির (৫) নামের দুটি ছেলে। স্বামীর ব্যবসায় তাদের সংসার চলত। এখন রাস্তায় দাঁড়াতে হবে।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যয় নামের উদ্ধার জাহাজটি পোস্তগোলা ব্রিজের এসে আটকে গেছে। পানি বৃদ্ধির কারণে ঘটনাস্থলে আসতে পারেনি। এ ছাড়া মর্নিং বার্ড-২ লঞ্চটির বয়াবাতি, লাইফ জ্যাকেটসহ সুরক্ষা সরঞ্জাম ছিল না বলে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এমনকি লঞ্চটির ফিটনেস সনদও ছিল না।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, আমরা এ পর্যন্ত ৩২ লাশ উদ্ধার ও লাঞ্চ শনাক্ত করেছি। লঞ্চটি উল্টে রয়েছে। কেবিনের ভেতরে আরও লাশ আছে কিনা সম্পূর্ণভাবে বলা যাচ্ছে না। উদ্ধার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, নৌ খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে এ দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে। মালিকদের গাফিলতি আছে কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অতীতে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবার তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নৌদুর্ঘটনা প্রায় শূন্যে কোঠায় এসেছিল। সঠিক ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যেক লাশের জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা এবং প্রত্যেক পরিবারের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ সূত্র জানিয়েছে, ৩২ লাশ ময়নাতদন্ত করে প্রশাসনের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

প্রাণ গেল যাদের

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ শাহজামান জানান, যে ৩২ জনের লাশ মর্গে এসেছে, তাদের সবাইকে শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। তারা হলেন- শাহাদাত হোসেন (৪৪), আবু তাহের বেপারি (৫৮), সুমন তালুকদার (৩৫), ময়না বেগম (৩৫), তার মেয়ে মুক্তা আক্তার (১৩), আফজাল শেখ (৪৮), মনিরুজ্জামান মনির (৪২), গোলাপ হোসেন (৫০), সুবর্ণা বেগম (৩৮), তার ছেলে তামিম (১০), আবু সাঈদ (৩৯), সুফিয়া বেগম (৫০), শহিদুল ইসলাম (৬১), মিজানুর রহমান কনক (৩২), সত্যরঞ্জন বণিক (৬৫), শামীম বেপারি (৪৪), বিউটি আক্তার (৩৮), আয়শা বেগম (৩৫), মো. মিল্লাত (৩৫), মো. আমির হোসেন (৫৫), সুমনা আক্তার (৩২), পাপ্পু (৩২), মো. মহিম (১৭), দিদার হোসেন (৪৫), হাফেজা খাতুন (৩৮), হাসিনা রহমান (৩৫), সিফাত (৮), আলম বেপারি, তালহা (২), ইসমাইল শরীফ (৩৫), সাইফুল ইসলাম (৪২) ও বাসুদেব নাথ (৪৫)।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেছেন এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়, সরকারপ্রধান লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন। ঘটনার পর থেকে তিনি সার্বক্ষণিক উদ্ধার কাজের খোঁজখবর রাখছেন বলেও তার দপ্তর থেকে জানানো হয়।

advertisement