advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মন্তব্য প্রতিবেদন
চিকিৎসক সুরক্ষা আইন খুবই জরুরি

অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন সভাপতি বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতি
৩০ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২০ ২২:৫২
advertisement

রোগীর মৃত্যুতে দায়ী করে খুলনার প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. মো. আবদুর রাকিব খানকে স্বজনরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। জনসমক্ষে নির্মমভাবে আঘাত করা হয় তাকে। এ ঘটনার পর সহকর্মীসহ সমগ্র চিকিৎসক সমাজ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এর পর পরই অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়। এখানে অবাক, হতবাক হওয়ার মতো নতুনভাবে বিশেষ এমন কিছুই করা হয়নি। যে কোনো উদ্দেশ্যমূলক হত্যাকা-ের জন্য দেশে প্রচলিত আইন আছে। হত্যাকারী বা হত্যাকারীরা বিচারিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে আইনানুগ শাস্তি পাবে। এটাই রাষ্ট্রের আইনি বিধান। কারণ অপরাধীর সাজা না হলে সামাজিক বিধিবিধান ব্যাহত হয়। আজকের আলোচনার বিষয় এটা নয়। একজন প্রৌঢ় অভিজ্ঞ চিকিৎসককে জনসমক্ষে হত্যা করা হলো- এটাই এই মহামারীর সংকটকালে আমাকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

রোগীর ভুল চিকিৎসার প্রশ্ন তুলে ডাক্তারদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, চেম্বার বা হাসপাতাল ভাঙচুরের খবর আগেও ঘটেছে গণমাধ্যমে দেখা গেছে। অনেক চিকিৎসক হামলার শিকার হলেও কোনোটারই বিচারের নজির নেই। সেই বিচারহীনতার হাত ধরেই আমরা একজন গুণী চিকিৎসককে হারালাম। মানুষের মনে এমন ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, ডাক্তারের গায়ে হাত তুললে কিছুই হয় না। চাইলেই একজন ডাক্তারকে পেটানো যায়।

রাকিব হত্যার মধ্য দিয়ে সমাজের এক ভয়াবহ দিক সামনে এলো।

করোনার এ অসহনীয় সময়ে চিকিৎসকরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ তখন একজন সম্মুখযোদ্ধাকে এভাবে হত্যা করতে ওদের বিবেকে একটুও বাধল না! একটুও কেঁপে উঠল না হাত? এই করোনাকালে চিকিৎসকদের ওপর এই নৃশংসতা কি কাম্য? সারা পৃথিবীর মানুষ যখন এই করোনাকালীন চিকিৎসকদের সম্মান প্রদর্শন করে তখন বাংলাদেশে আমরা ডাক্তারকে পিটিয়ে মেরে ফেলি। তবে যে দেশে করোনার জন্য মাকে জঙ্গলে রেখে আসে, ডাক্তার করোনা চিকিৎসা করে বলে বাড়িওয়ালা বাসা থেকে বের করে দেয়, করোনায় মারা গেলে মৃতদেহ ফেলে পালায়- সে দেশে আর কীই বা আশা করা যায়। তাই চিকিৎসক সুরক্ষা আইন এখন সময়ের দাবি। ইতোমধ্যেই ভারত সরকার এ বিষয়ে নতুন আইন পাস করেছে। বাংলাদেশেও চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য চিকিৎসক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন অতিজরুরি।

করোনাকালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আক্রমণ রুখতে মহামারীকালীন অর্ডিনেন্সে সম্মতি দিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। এই আইনের ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আক্রমণ গ্রেপ্তারযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। নতুন এই আইনের ফলে দোষী ব্যক্তির সাত বছর পর্যন্ত কারাবাস ও সম্পত্তি নষ্টের জন্য বিপুল পরিমাণ জরিমানা হতে পারে। অর্ডিন্যান্স জারি করে এই আইন প্রণয়নের গুরুত্ব বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি টুইট করে বলেন, ‘মহামারী আইনের সংশোধনী অর্ডিনেন্স ২০২০, সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মী যারা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে কোভিড ১৯-এর সঙ্গে লড়াই করছেন তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রকাশ। এটি (অর্ডিনেন্স) আমাদের পেশাদারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো রকম সমঝোতা করা হবে না।

স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের সমস্ত রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের প্রশাসনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর কাজে সমস্যা সৃষ্টি করে অথবা কোভিড-১৯ সংক্রমণে মৃত স্বাস্থ্যকর্মীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তা হলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে যেন কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এ ছাড়া চীনেও চিকিৎসাকর্মীদের প্রতি সহিংসতা রোধের লক্ষ্যে একটি নতুন আইন চালু করেছে। আইনটি কোনো সংস্থা বা ব্যক্তিকে চিকিৎসাকর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মর্যাদার হানি বা ক্ষতি করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

রব হেন্ড্রি কোভিড-১৯ সংকটে ডাক্তারদের জন্য আইনি সুরক্ষা কেন প্রয়োজন সে সম্পর্কিত এক প্রবন্ধে লেখেন ‘করোনা ভাইরাস সংকটের সময় চিকিৎসকরা কিছু চ্যালেঞ্জমূলক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন যা নিয়ে পরবর্তী সময় আইনত প্রশ্ন উঠতে পারে। বর্তমান আইনি কাঠামোটি এই সময়ের মধ্যে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মেডিক্যাল প্রোটেকশন থেকে রব হেন্ড্রি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, সরকারের উচিত এই মুহূর্তে স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের যে সমস্ত সিদ্ধান্ত তারা ভালো বিশ্বাসের সঙ্গে নেয় সেগুলোর জন্য সুরক্ষা দেয় এমন জরুরি আইন প্রবর্তনের দিকে নজর দেওয়া’। নিউইয়র্কে অনুরূপ একটি আইনে পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন- মরণাপন্ন রোগীর জীবন দীর্ঘায়িত করতে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া বা প্রত্যাহার করতে হবে কিনা সে সিদ্ধান্তগুলো হলো ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত যা শুধু চিকিৎসকরাই ভালো বোঝেন, যদিও এ জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রোগীদের এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা এবং সম্মতিগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাদাররা যারা এই জাতীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তারা যদি পরবর্তী সময় আইনি চ্যালেঞ্জের মধ্যে না পড়েন সেজন্য আইনি কাঠামো জরুরি। নতুবা চিকিৎসকরা নিজেরা একটি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন এবং চিকিৎসাক্ষেত্রেও দ্বিধান্বিত হতে পারেন। এ কারণেই নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো “জরুরি অবস্থা বিপর্যয় চিকিৎসা সুরক্ষা আইন”-এ স্বাক্ষর করার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, যা জনস্বাস্থ্য, সুরক্ষা এবং সকলের কল্যাণ প্রচারের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি দায়বদ্ধতা থেকে সামাজিক দায়মুক্তি দেয়। যুক্তরাজ্য সরকারকেও অনুরূপ জরুরি আইন প্রবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছে। অতএব আইনি সুরক্ষা হলে, চিকিৎসকরা জানবেন যে তারা যখন চূড়ান্ত বিশ্বাসের সঙ্গে এবং প্রাসঙ্গিক স্থানীয় ও জাতীয় নির্দেশনা মেনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সে রকম চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তারা আইনগতভাবে সুরক্ষিত থাকবেন। এই কারণেই বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সরকারকে জরুরি আইন সম্পর্কিত আইন সংশোধন প্রয়োজন। নতুন আইন তৈরি যেহেতু সময়সাপেক্ষ, সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন এজন্য ডাক্তারদের অস্থায়ীভাবে দেওয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি অর্ডিনেন্স জারি করা দরকার।

সাধারণত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাগুলোর কারণ হলো- রোগীর কাছে উপস্থিত হতে বিলম্ব হওয়া বা চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব, ওষুধের পার্শপ্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয় রোগী, অ্যালকোহল বা ড্রাগের নেশাগ্রস্ত লোকজন বা খুবই খারাপ আবস্থায় বা শেষ পর্যায়ে রোগী এলে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সহিংসতার সর্বাধিক সাধারণ কারণগুলো ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার সময় (৪.২.২%), চিকিৎসা নিয়ে অসন্তুষ্টি (১৫.৪%) এবং যেসব চিকিৎসক আক্রান্ত বা লাঞ্ছিত হয়েছেন তাদের মধ্যে হতাশা, অনিদ্রা, ট্রমাজনিত পরবর্তী স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, এগ্রোফোবিয়া এবং এমনকি ভয়ভীতি এবং উদ্বেগে ভোগার প্রবণতা দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশে ডাক্তার এবং রোগী বা তাদের উদ্বিগ্ন আত্মীয়দের মধ্যে যোগাযোগের অভাব একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কখনো কখনো কোনো উত্তরকে ডাক্তারদের দায়িত্বের অভাব হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়, এমনকি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার জন্যও ডাক্তারকে দোষারোপ করা হয়।

প্রায়শই দেখা যায়, গণমাধ্যমে কোনো ঘটনা শুধু রোগীর ভাষায় উপস্থাপন করা হয়। ‘ভুল চিকিৎসা’ এমন একটা বিষয়কে ঢালাওভাবে বলা উচিত নয়। এটার বিশ্লেষণের দরকার। চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক উন্নতি করা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিকিৎসক এবং রোগী বা তাদের আত্মীয়দের মধ্যে কোনো যোগাযোগের ব্যবধান থাকলে চলবে না। আগের হাসপাতাল বা রেফারিং ডাক্তারকে কোনো পরিস্থিতিতে সমালোচনা করা উচিত নয়। যখন রোগ নির্ণয় গুরুতর হয় তখন সিনিয়র ডাক্তারকে অবশ্যই আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন

সভাপতি, বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতি

advertisement