advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিক্ষানবিশের হাতে ছিল ময়ূরের ভার

মাস্টার ছাড়াই চলছিল মর্নিং বার্ড

ইউসুফ সোহেল
১ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ জুলাই ২০২০ ১১:৪৪
বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে ৩২ জন নিহত হয়েছেন, নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েকজন
advertisement

বুড়িগঙ্গার শ্যামবাজার উল্টিগঞ্জ পয়েন্টে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ‘ময়ূর-২’ লঞ্চের ধাক্কায় ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ রুটের অর্ধশতাধিক যাত্রীবাহী ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ লঞ্চডুবির ঘটনায় দায় ছিল দুটি লঞ্চেরই। গত সোমবার সকালে ভয়াবহ এই লঞ্চ দুর্ঘটনার সময় মূল মাস্টার ছাড়াই ময়ূর-২ চালাচ্ছিলেন একজন শিক্ষানবিশ। বেতন কম দিতে অভিজ্ঞ চালকের বদলে অনভিজ্ঞ চালক দিয়েই লঞ্চটি চালাচ্ছিল লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।

সার্ভে সনদে একজন করে দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ও ড্রাইভার থাকলেও দীর্ঘদিন থেকে অভিজ্ঞ মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়াই লঞ্চটির অপারেশন পরিচালিত হচ্ছিল। সার্ভে সনদ ও ফিটনেস নেওয়ার সময় নৌ অধিদপ্তরে জমা দেওয়া কাগজে-কলমে একজন দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ও একজন ড্রাইভার দেখানো হলেও সোমবার সকালে কেরানীগঞ্জের একটি ডকইয়ার্ড থেকে মেরামত শেষে ময়ূর-২ নদীতে নামানোর সময় ‘এমভি মর্নিং বার্ডের ওপর তুলে দেয় লঞ্চটি। এ সময় ওই লঞ্চে কোনো মাস্টার ড্রাইভার কর্মরত ছিল না। অনভিজ্ঞ ওই মাস্টারের ভুলেই ঘটে অনাকাক্সিক্ষত এই ঘটনা।

এদিকে দুর্ঘটনার সময় যাত্রীবাহী মর্নিং বার্ড লঞ্চটি পরিচালনার ভারও ছিল অদক্ষ চালকের হাতে। ওই চালকের অদক্ষতার কারণে ‘ময়ূর-২’ লঞ্চকে আসতে দেখলেও মর্নিং বার্ডকে সঠিক নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি চালক। আপডেট ফিটনেস

সনদ ছিল না দুটি লঞ্চের। ফলে দুই লঞ্চ চালকের অসতর্কতায় চোখের পলকে এতগুলো প্রাণের সলিল সমাধি ঘটে। দুর্ঘটনার পর থেকে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক ও মাস্টারসহ সব স্টাফ পলাতক রয়েছেন।

এই লঞ্চ দুর্ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ৭ সদস্যবিশিষ্ট ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র, পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভয়াবহ ওই লঞ্চ দুর্ঘটনার পর সোমবার রাত পর্যন্ত ৩২ জন যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ডুবে যাওয়া ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উদ্ধার করা হয় অচেনা এক কিশোরের মরদেহ। লঞ্চডুবির ঘটনায় ৩৩ জনের লাশ উদ্ধারের পর মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে এমভি মর্নিং বার্ড উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক। এ সময় ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও নৌ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন জানান, ডুবে যাওয়া লঞ্চ মর্নিং বার্ডকে টেনে সদরঘাটের কুমিল্লা ডকইয়ার্ডের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভেতরে আর কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি।

এদিকে উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণার আড়াই ঘণ্টা পর বুড়িগঙ্গায় ভেসে ওঠে আরেকটি মৃতদেহ। তাকে নিয়ে এই লঞ্চডুবিতে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৪ জনে। ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা এরশাদ হোসাইন জানান, মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে একজন পুরুষের মৃতদেহ দুর্ঘটনাস্থলের ৫০ গজের মধ্যে ভেসে ওঠে। রাত ৮টা পর্যন্ত মৃতদেহটি কেউ শনাক্ত করেনি।

লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃতদের মধ্যে ৩২ জনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই সোমবার রাতে মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গের মাঠ থেকে স্বজনদের কাছে পুলিশ হস্তান্তর করেছে বলে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে জানায় মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গ সহকারী শ্যামল।

এদিকে লঞ্চডুবির ১৩ ঘণ্টা পর সোমবার রাতে সুমন ব্যাপারী নামে একজন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তিনি বর্তমানে মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পানির নীচে ১৩ ঘণ্টা বেঁচে থাকার শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের বর্ণনা দিয়েছেন মর্নিং বার্ডের যাত্রী সুমন। তার এই অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। এ ঘটনায় ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এখন ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্যের ঝড় বইছে। অনেকেই বলছেন, ঘটনাটি মিরাকল, কেউ বলছেন ঘটনা সাজানো। কেউ আবার বলছেন এটি বিজ্ঞানের বিস্ময়।

মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রাশীদ উন নবী জানান, সুমন বেপারী শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন, ভালো আছেন, কথাবার্তা বলছেন। তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে।

বুড়িগঙ্গায় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনায় সোমবার রাতেই অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগ এনে এমভি ময়ূর-২ লঞ্চের মালিকসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। আসামিরা হলেনÑ এমভি ময়ূর ২-এর মালিক মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদ (৩৩), মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা (৬৫), জাকির হোসেন (৩৯), ইঞ্জিনচালক শিপন হাওলাদার (৪৫), চালক শাকিল হোসেন (২৮), সুকানি নাসির মৃধা (৪০) ও সুকানি হৃদয় (২৪)। নৌ পুলিশ সদরঘাট থানার এসআই মোহাম্মদ শামসুল বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন বলে জানান, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার। তিনি বলেন, মামলাটি তদন্ত করছে নৌ পুলিশ।

নৌ পুলিশের ঢাকা জোনের পুলিশ সুপার খন্দকার ফরিদুল ইসলাম জানান, নৌ পুলিশের জুরিডিকশনে ঘটনা ঘটায় মামলাটি তদন্ত করবে নৌ পুলিশ। এ ঘটনায় কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা ছাড়া আসামি কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। কারণ ঘটনার পর থেকেই তারা পলাতক। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে তাদের বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালানো হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে দুর্ঘটনার ২৬ ঘণ্টা পর গতকাল বেলা ১২টার দিকে বুড়িগঙ্গার মাঝনদীর তলদেশ থেকে এয়ার লেপ্টিংয়ের (ডুবন্ত জাহাজের শরীরে বিশেষ প্লাস্টিক-জাতীয় বেলুন বেঁধে পরে ওই বেলুনে হাওয়া ফুলিয়ে লঞ্চটি ভাসিয়ে তোলা) মাধ্যমে তীরে টেনে আনা হয় ডুবন্ত মর্নিং বার্ডকে। বিআইডব্লিউটিএর দুরন্ত জাহাজের সাহায্যে লঞ্চটিকে রশি দিয়ে বেঁধে তীরে নিয়ে আসে উদ্ধারকারীরা। লঞ্চডুবির পর পরই আশপাশে থাকা নৌকা ও ট্রলারের মাঝি ও যাত্রীরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সংস্থার ডুবুরিরা এতে অংশ নেন। কিন্তু ৪০-৪৫ ফুট পানির গভীরতা থাকায় লঞ্চটি তোলা সম্ভব হয়নি। পরে লঞ্চটি উদ্ধারে নারায়ণগঞ্জে থাকা বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় রওনা হয়ে দুপুরে শ্যামপুর পর্যন্ত এলেও পোস্তগোলা ব্রিজের কারণে সেখানে আটকে যায়। পরে স্থানীয় এয়ার লেপ্টিং পদ্ধতিতে রাতভর চেষ্টা করেও লঞ্চটি উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

লঞ্চডুবির ঘটনায় এখনো আরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনাকবলিত মর্নিং বার্ডের নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে গতকালও অনেকে ঘটনাস্থলসহ বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে ভিড় করেছেন। স্বজনদের লাশটুকু অন্তত ফিরে পেতে নদীর পাড় ধরে ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে তাদের। দুপুরে হাসিব নামে এক যুবক সদরঘাটের লালকুটি টার্মিনালে বিলাপ করে খুঁজছিলেন তার বাবা আব্দুর রহমান বেপারীকে। তিনি বলেন, সোমবার তার বাবা-মা হাসিনা রহমান ও ভাই সিফাত একসঙ্গে মর্নিং বার্ড লঞ্চে রওনা হয়েছিলেন। বিকালে মা ও ভাইয়ের লাশ পেলেও মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বাবার হদিস পাননি। তিনিসহ স্বজনদের খোঁজে আসা অনেকেই উদ্ধার অভিযান চালু রাখার দাবি জানান।

বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক জানান, ক্রেনবাহী জাহাজ আসতে না পারায় দুরন্ত জাহাজ দিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি নদীর তীরে টেনে এনে রাখা হয়েছে। সেখানে আর কোনো লাশ নেই। কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনরা যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন জানান, সোমবার সকালের এ ঘটনায় নিখোঁজদের সন্ধানে রাতভর তল্লাশির চলে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সদরঘাটে আসা লঞ্চের বার্থিংয়ের জন্য মঙ্গলবার সকালে এক ঘণ্টা বিরতি দেওয়া হয়। এর পর সকাল সাড়ে ৯টায় আবার তল্লাশি শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর কর্মীরাও অভিযানে অংশ নেয়। অভিযানের একপর্যায়ে দুপুর পৌনে ১টার দিকে আরও এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে একটি ডুবুরি টিম সার্বক্ষণিক অবস্থান করে উদ্ধার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সদরঘাট নৌ পুলিশের ইনচার্জ রেজাউল করিম জানান, নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনরা ভিড় করায় নদীতে প্যাট্রলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উৎসুক জনতাদের দূরে রাখতেও পুলিশ কাজ করছে।

জানা গেছে, ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদ ঢাকার বাসিন্দা। হানিফ ছোয়াদের কোম্পানির নাম সি-হর্স করপোরেশন। তিনি ময়ূর-২ লঞ্চের রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন এই কোম্পানির নামে। আর ডুবে যাওয়া ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চের মালিক মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন ও আব্দুল গফুর। ‘তালতলা ওয়াটার ওয়েজ’ কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রেশন করা মর্নিং বার্ড লঞ্চের। ময়ূর-২ লঞ্চের চালক শিপন হাওলাদার বেশ কিছুদিন ধরেই ছুটিতে রয়েছেন। শিপন জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি লঞ্চে ছিলেন না। তার অবর্তমানে ময়ূর-২ চালাচ্ছিলেন লঞ্চের মাস্টার।

লঞ্চডুবির ঘটনার ১৩ ঘণ্টা পর পানির নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া সুমন ব্যাপারী বর্তমানে সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মঙ্গলবার সেখানেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই ব্যক্তি। তিনি জানান, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাহপুর তার গ্রামের বাড়ি। সদরঘাটের বাদামতলী এলাকায় ফলের ব্যাবসা করেন তিনি। ব্যবসার খাতিরে ঢাকায় সপ্তাহে তিন দিন থাকলেও মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর আব্দুল্লাহপুরে নিজ বাড়িতে থাকেন চার দিন। আট ভাই ও এক বোনের সংসারে বাবা ফজল বেপারী মারা যান ৬ বছর আগে। এ সময় তিনি বিদেশে ছিলেন কর্মের তাগিদে। দেশে ফিরে সত্তরোর্ধ্ব মা আমেনা খাতুনকে নিয়ে নিজ বাড়িতেই আলাদা থাকেন তিনি।

অলৌকিকভাবে ১৩ ঘণ্টা পানির নিচে থাকার শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনায় সুমন বলেন, ব্যবসার কাজেই ঢাকায় ফিরছিলাম। দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া লঞ্চটি সোমবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে মুন্সীগঞ্জ ছেড়ে আসে, সে সময় তিনি লঞ্চের ইঞ্জিন রুমের পাশের একটি রুমের সাইডে বসা ছিলাম। লঞ্চ ছাড়ার পর থেকে আমার চোখে কিছুটা ঘুম ছিল, তখন হঠাৎ দেখি লঞ্চটিতে আরেকটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। এর পর এক সাইড ডুবে যাচ্ছিল, আমি দৌড়ে লঞ্চের আরেক প্রান্তে গেলাম। কিছুক্ষণ পর সেই সাইডও ডুবে গেল। এর পর আল্লাহ আমাকে কোন জায়গায় রাখছে আমি নিজেও বলতে পারব না। তবে মনে আছে যে পানির নিচে যাওয়ার পর আমি লঞ্চের একটা রড ধরে ছিলাম। পরে আল্লাহ আস্তে আস্তে আমাকে একটি জায়গায় নিয়ে এসেছে, সেখানে কোনো পানি ছিল না। পা পর্যন্ত একটু পানি ছিল, আমি সেই পানি দিয়ে অজুু করেছি। এর পর দোয়া-দরুদ পড়েছি। আমার শরীরে যে পোশাক ছিল সেটা ভেসে গেছে, শুধু গেঞ্জিটা ছিল। লঞ্চটি ডোবার পরেই আমি আমার গেঞ্জিটা খুলে কোমরে বেঁধে নিই যাতে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা থাকে। আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করিনি। চেষ্টা করলে হয়তো বের হতে পারতাম আবার না-ও পারতাম। তাই আমি সেখানেই ছিলাম। রাতে আমাকে উদ্ধার করা হয়। আমার কাছে মনে হইল, ১০ মিনিট ছিলাম। আল্লাহ যে ক্যামনে ১২-১৩ ঘণ্টা পার কইরা দিল বলতে পারি না। আমি ভেতরে কীসের মধ্যে ছিলাম, কিচ্ছু বুঝতে পারি নাই। তবে পানির তলে ছিলাম এইটুক জানি।’

লঞ্চ থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বাইর কইরা নিয়ে আসছে। বের হওয়ার সময় কিচ্ছু বুঝি নাই। পানির মধ্যে যখন ছিলাম, তখন সাঁতার কাটার ফোম দেখছিলাম চোখের সামনে। হাতড়ায় নিতে পারতেছিলাম না। পরে লোহার রড ধরে বসে ছিলাম।’ নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল কিনাÑ জানতে চাইলে সুমন বলেন, নিঃশ্বাস আল্লাহ দিসে। না দিলে তো মইরাই যাইতাম। ওপরে যখন উঠি, তখন কিছুই বুঝতে পারি নাইÑ ক্যামনে উঠলাম, কীভাবে উঠলাম। মায়ের দোয়াতেই মনে হয় বেঁচে ফিরছি, জানান সুমন।

সুমন ব্যাপারীর বেঁচে ফেরার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশিষ বর্ধন বলেন, সাধারণত পানির নিচে ডুবে গেলে যে কোনো মানুষের এক মিনিট থেকে সর্বোচ্চ দেড় মিনিটের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়াটাই স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা ধারণা করছি, উদ্ধার হওয়া সুমন সম্ভবত ইঞ্জিন রুমে ছিলেন। সাধারণত ইঞ্জিন রুম এয়ারটাইট হওয়ায় সেখানে পানি প্রবেশ করে না। রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে কুশন পদ্ধতি ব্যবহার করে জাহাজ ভাসানোর চেষ্টা করা হলে সম্ভবত ইঞ্জিনরুম খুলে যায়। সে সময় তিনি বের হয়ে আসেন এবং উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন।

 

advertisement