advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নৌ দুর্ঘটনায় পার পেয়ে যাচ্ছেন দোষীরা
দোষী হলেও সাজা হয় লঘু

৫৭০ নৌ দুর্ঘটনায় ৩৬৫৪ প্রাণহানি

তাওহীদুল ইসলাম
১ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২০ ২৩:৫৩
advertisement

বুড়িগঙ্গায় সোমবার ময়ূর ২-এর ধাক্কায় মর্নিং বার্ড নামে লঞ্চডুবিতে এ পর্যন্ত ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। দুর্ঘটনার পর সিসি ক্যামেরা পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে এই মত দেওয়া হয়েছে চালকের অদক্ষতা ও গাফিলতিতে দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই ৫৭০টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মারা যায় প্রায় ৩ হাজার ৬৫৪ জন। কেবল গত বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাবেই মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ৬২৭। একই সময়ে ২৩৬টি দুর্ঘটনায় ৩৪০টি মামলা হয়েছে। নিহতের চেয়ে আহতের সংখ্যা কম ৪৮১; নিখোঁজ ৪৫৭ জন। একই সময়ে মামলায় সাজা হয়েছে ২০০ জনের এবং বিচারাধীন রয়েছে ৯০টি মামলা। অব্যাহতি পেয়েছে ৫০ জন। ১৯৯১ সাল থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৩৬টি যাত্রীবাহী লঞ্চ ও ১৪৬টি মালবাহী জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া অন্য নৌযান দুর্ঘটনাকবলিত হয় ১৮৮টি। এ পর্যন্ত ৫৭০টি দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৬৫৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫১৬ জন। নিখোঁজ রয়েছেন ৪৮৯ জন। অধিকাংশ মামলায় তথ্য-প্রমাণের অভাব এবং প্রভাবশালীদের চাপের কারণে লঘু সাজায় পার পেয়ে যান দায়ী ব্যক্তিরা। সারাদেশে ১২ হাজার ৯৫৯টি অনুমোদনপ্রাপ্ত তথা সার্ভে সনদধারী নৌযান রয়েছে।

নৌ দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকের অদক্ষতা অথবা গাফিলতিকে দায়ী করা হয়। প্রকৃত চালকের পরিবর্তে অন্য স্টাফের মাধ্যমে লঞ্চ চালনার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। ময়ূর-২ লঞ্চটির ক্ষেত্রেও মূল চালকের পরিবর্তে

কোনো সহকারীর হাতে স্টিয়ারিং ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তে এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নৌ দুর্ঘটনার বড় একটি কারণ ফিটনেসবিহীন নৌযান। একে নৌ খাতে বলা হয় সার্ভে রিপোর্ট। ফিটনেস বা সার্ভে রিপোর্ট প্রদানের কাজটি করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় আকার বড় করা, নির্মাণকালে অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ না রাখার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। প্রভাবিত হয়ে সার্ভেয়ারদের সার্ভে সনদ দেওয়া এবং নকশা জালিয়াতির ঘটনা নৌ খাতে পুরনো অভিযোগ। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ দুটির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দুটিরই সার্ভে সনদ বা ফিটনেস রয়েছে। কোন লঞ্চের কী ত্রুটি আছে তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত কম। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বলেন, এবার আগের মতো হবে না। দুর্ঘটনার প্রতিবেদন অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লঞ্চ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে একাধিক কারণের মধ্যে অন্যতম, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন। তা ছাড়া কম উচ্চতার লঞ্চ নদীতে নামানো। খালে চলাচলের লঞ্চও নদীতে যাতায়াত করে। এসব লঞ্চ অনেক সময় রুট পারমিট পেয়ে থাকে। এই রুট পারমিট প্রদানে জড়িতদের শাস্তি আওতায় আনা হয় কম। ফলে নৌ দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৪৩টি রুটে ঢাকা থেকে শতাধিক লঞ্চ চলাচল করে। এ ছাড়া এক জেলা থেকে অন্য জেলায় চলাচলকারী লঞ্চও রয়েছে। এর মধ্যে মতলব, ভেদরগঞ্জ, ডামুঢ্যা, মূলাদী, গৌরনদী, পাতারহাট, রাঙ্গাবালি, গোসাইরহাট, কালাইয়া, পটুয়াখালী, মোরেলগঞ্জসহ ২৭টি নৌরুটে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করছে।

জানা গেছে, সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সারাদেশে ৮৩৯টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে। এ ছাড়া যাত্রীবাহী বোট ৪১৭টি, মালবাহী ৩ হাজার ২০১টি, তৈলবাহী ৩৩৩টি, বালিবাহী ৪ হাজার ৯১০টি, ড্রেজার ১ হাজার ৩৬৯টি, পণ্যবাহী ৮৮৭টি, বার্জ ৪৫৩টি, টাগ ১৪৭টি, স্পিড বোট ৩০৩টি, ফেরি ৪০টি, ওয়ার্ক বোট ৫৫টি, পরিদর্শন বোট ২৬টি ও অন্য ক্যাটাগরিতে ৭৯টি নৌযান রয়েছে। সব মিলিয়ে সারাদেশে ১২ হাজার ৯৫৯টি ফিটনেসপ্রাপ্ত নৌযান রয়েছে। এর বাইরে কয়েকগুণ রয়েছে ফিটনেসবিহীন নৌযান। সেই সংখ্যাটা ৪০ হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পর্যন্ত নৌ দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯১ সালে নিহত হয়েছেন ১৯, পরের বছর ৫, এর পরের বছর ১৮৩ জন। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে ৩০৩ জন মারা যান। পরের বছর ৪০ জন, এরও পরের বছর ১৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। এভাবে বছর হিসাবে ধরলে ১৯৯৭ সালে ১০২, ১৯৯৮ সালে ৯১ জন মারা যান। পরের বছর থেকে ৩৫৩, ৩৩, ২৯৭, ৪৬৪, ১২৭, ২৪৮, ৫১, ২, ১২০, ২৬০, ১১৮, ৭৪, ১৬৩, ২২, ১২৩, ১২০, ৩৫, ৪৫, ২ ও ৩ জন।

advertisement