advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিল্প-সংস্কৃতি খাতের এবারের বাজেট প্রসঙ্গে

গোলাম কুদ্দুছ
১ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ জুলাই ২০২০ ০১:০৩
advertisement

করোনা দুর্যোগের সময় এবারের বাজেট প্রেক্ষাপটটি একেবারেই অন্যরকম। আমাদের সব সময়ের দাবি ছিল সংস্কৃতি খাতের বাজেট জাতীয় বাজেটের ১ শতাংশ হোক। সে দাবিটি এখনো আছে। তবে এবারের পরিস্থিতি বিবেচনায় সংস্কৃতি খাতের বাজেট আরেকটু বাড়ানো যেত। কারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা, মানবিকতাবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য সারাদেশের সংস্কৃতিকর্মীদের মাধ্যমে কাজ করা যেত। একটি জাতির পরিচয় প্রকাশ পায় তার সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। আমরা সবাই সংস্কৃতি নিয়ে চিল্লাচিল্লি করি, অথচ সংস্কৃতির উন্নয়নে আমাদের কোনোই মাথাব্যথা নেই। জাতীয় বাজেটের মাত্র দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বরাদ্দ পায় সংস্কৃতি খাত! এই ন্যূনতম বাজেট দিয়েই সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা এবং এর উন্নয়ন সাধন করতে হয়। এই যখন অবস্থা, তখন দেশ যে গোঁড়ামি আর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, ক্রমান্বয়ে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

এবারও আমাদের জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ মাত্র দশমিক শূন্য ১ শতাংশের মতো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখেছিলেন এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের, এক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিসমৃদ্ধ সোনার বাংলার। সেই বাংলাদেশ আজ সাম্প্রদায়িক কূপম-ূকতার আধার হয়েছে। সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে ভরে গেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বাইরের দেশের সংস্কৃতি এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, মানুষ এখন আর বাংলাদেশের টিভি, গান, নাটক বা চলচ্চিত্র দেখছে না।

বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার চর্চা না হয়ে আজ অন্য সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে। ফলে সংস্কৃতির উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করলে যে সংস্কৃতি মানুষকে মুক্ত ও স্বাধীন করবে, সেই সংস্কৃতিকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। এখন বৈশ্বিক মহামারীতে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ খুবই কম হয়ে গেছে। এটা নিয়ে সরকারের পুনরায় বিবেচনা করা উচিত। আমরা এখন ক্রান্তিকাল পার করছি। সংস্কৃতির সবকিছুই এখন বন্ধ। অনেকে খুব কঠিন সময় পার করছেন। এখানে বাউলশিল্পী, যাত্রাশিল্পী, রূপসজ্জা করা, যন্ত্রশিল্পী, ক্যামেরাম্যান, টিভি নাটকের শিল্পী, নাটকের সঙ্গে কারিগরি কাজে হাজার হাজার লোক যুক্ত। তাদের পরিবারও এর সঙ্গে যুক্ত। এখানে তো এসব পরিবারকে দেখতে হয়। তার জন্য তো আমাদের অর্থ লাগবে। যে বাংলাদেশে লোকশিল্পী, কারুশিল্পী যারা আছেনÑ তাদের কী অবস্থা।

এ বছর তো বৈশাখী মেলা নেই। এ ছাড়া তো অন্য কোনো মেলাও হচ্ছে না। তা হলে এসবের সঙ্গে যাদের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে তাদের কী হবে? তাদের কারোরই এখন কোনো কাজ নেই। এই মানুষগুলো এখন কোথায় যাবে। তাদের অবস্থাটা এখন কী। এরা তো এ দেশেরই নাগরিক। এদের জন্য কী করবেন। তাদের খোঁজ তো আমাদের রাখতে হবে। এর জন্য তো অর্থ দরকার। আর এটির যদি বাজেট না থাকে, তা হলে কী করবেন। সংস্কৃতিকর্মীদের রক্ষা করতে বাজেটে বরাদ্দ যা বাড়ানো হয়েছে তা খুবই সীমিত। পাশাপাশি বিশেষ প্রণোদনা তো আমরা পাইনি। সব মিলিয়ে এ খাত চরম বিপদে পড়বে।

বাংলাদেশে যে অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়ন চলছে। আর এই উন্নয়নকে যদি টেকসই করতে হয় এবং দেশকে যদি একটি প্রগতিবাদী, আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হয়, তা হলে মানুষের মনোজগতের একটি ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। এবং তার জন্য শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতির একটি বড় ভূমিকা ও অবদান রয়ে গেছে। আমরা মনে করি যে, বিদ্যমান বাজেট দিয়ে দেশের সংস্কৃতির জাগরণ সম্ভব নয়। গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত যদি সংস্কৃতিকে গড়ে তুলতে হয়, পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়, তা হলে জাতীয় বাজেটের অন্ততপক্ষে ১ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। তা ছাড়া এটি করা সম্ভব নয়। ব্যক্তি-উদ্যোগে বা ব্যক্তির ভালো লাগা থেকে সংস্কৃতি আর বেশি দূর এগোবে না। এবারের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। এবারের ক্ষেত্রে আমরা বলব যে, স্বাস্থ্য খাত, কৃষি খাত, হতদরিদ্র মানুষের সামাজিক নিরাপত্তাবলয় এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশ এসব ক্ষেত্রে বেকারত্ব দূর করার জন্য সরকারের বাজেট বরাদ্দ বেশি করা উচিতÑ এটা আমরা মনে করি। তবে এর পাশাপাশি হাজার হাজার সংস্কৃতিকর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাদের বাঁচিয়ে রাখা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া দরকার সরকারের। আজ করোনাকালীন আমরা কী দেখলাম? মানুষ যে কত অসচেতন, এখনো মানুষ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এবং ধর্মান্ধ। এরা ভাবে আল্লাহ বাঁচালে বাঁচব, না হলে মরে যাব। তার মানে কি আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাকে তারা গ্রাহ্য করছে না। এবং মানবিকতা কীভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে সমাজ থেকে। করোনাকালে মায়ের মৃতদেহ রাস্তায় কিংবা বাগানে ফেলে দিয়ে চলে যাচ্ছে নিজের সন্তান। তার মানে এটা মানবিকতার ক্ষরণ যে কোন জায়গায় চলে গেছে, তা ভাবা যায় না। এ জায়গাটিকে যদি আমরা ফিরিয়ে আনতে চাই, তা হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে সংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তার জন্য তো বাজেট দরকার। শুধু মুখে বললে তো হবে না। যার কারণে আমরা হতাশ হয়েছি। আমরা মনে করছি যে, বিদ্যমান এই সংকটের মধ্যেও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য এবং উন্নয়নধারাকে টেকসই করার জন্য সংস্কৃতি খাতে বাজেট বরাদ্দ আরও বেশি করার দরকার।

বর্তমান যে সময়, এ সময়ে তার পরও সংস্কৃতিকর্মীরা নানাভাবে মানুষকে জাগিয়ে রাখছে, সাহস দিচ্ছে এবং দিয়ে যাবে। তবে কতদিন এভাবে সংস্কৃতিকর্মীরা নিজেকে অনিশ্চতায় রেখে দেশের মানুষকে জাগিয়ে রাখবে, এটাই এখন বোঝার বিষয়। কবে আবার সব স্বাভাবিক হবে এটা কে জানে। দর্শক নিয়ে কবে আবার অনুষ্ঠান শুরু হবেÑ এটা আমরা জানি না। এই সময় কি, তিন মাস পর, নাকি ছয় মাস পর হবে, নাকি এক বছর পর হবেÑ এটাও আমরা কেউ জানি না। এটি একটি বড় অনিশ্চয়তার বিষয়। আর এই অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে বেশি আছে সংস্কৃতি খাত ও সংস্কৃতিকর্মীরা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তো আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা যাবে না। তাই এর জন্য সবকারকে সংস্কৃতি খাতের বাজেটটির বিষয়ও মাখায় রাখা দরকার।

গোলাম কুদ্দুছ : সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট

advertisement