advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রাণের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদার্পণ

বাহালুল মজনুন চুন্নু
১ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ জুলাই ২০২০ ০১:০৩
advertisement

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। বাঙালি জাতির জন্য এ এক বিশেষ দিন। ওই ১৯২১ সালের ১ জুলাই থেকে পথচলা এই বিশ্ববিদ্যালয় এখনো নিরবচ্ছিন্ন গতিতে সৃষ্টি করে চলেছে একের পর এক অমরকাব্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘সত্যের জয় সুনিশ্চিত’ (ট্রূথ শ্যাল প্রিভেইল)Ñ এ লক্ষ্য সামনে রেখে একটি জাতির জšে§ পথিকৃতের ভূমিকা পালন করার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যাসাধনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মানবিক সত্তার উন্নয়ন ঘটিয়ে আদর্শ আলোকিত মানুষে পরিণত করার প্রয়াস চালিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠাকালীন থেকেই। এ ছাড়া পেশাগত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি আর মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে দেশ ও জাতির অগ্রগতিতেও রেখে আসছে অনন্য অবদান। তবে এর সবচেয়ে বড় অবদান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রধান প্রভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। যদি বাঙালি জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়, তা হলে দেখা যাবে তা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা।

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল জ্ঞানার্জনের চর্চা হয় না। এখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চাও হয়। শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা হয় সচেতন নাগরিক হিসেবে। তাই তো যে কোনো অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সূচনাকেন্দ্র হয়ে আসছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া পৃথিবীতে আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও খুঁজে পাওয়া যাবে নাÑ যে বিশ্ববিদ্যালয় তার জাতিকে একটি পতাকা উপহার দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়Ñ এর ইতিহাস এই বাংলার মানুষের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিবর্র্তনের ইতিহাস, পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনার ইতিহাস। এ কারণে বাঙালি জাতির ইতিহাস থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই পৃথক করা যায় না।

বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নেতৃত্বের অগ্রভাগে। এখান থেকেই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এই বিশ^বিদ্যালয়ের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুগে যুগে বিভিন্ন স্বৈরাচারী সরকার ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করেছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা। ক্ষমতাসীন সরকার যদি জনগণবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেয়, তা হলে প্রতিবাদের আগুন সর্বাগ্রে ঝলসে ওঠে এ বিশ^বিদ্যালয়ের চত্বরেই। এভাবেই এ বিশ^বিদ্যালয় জাতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে। এর প্রতিটি ধূলিকণা একেকটি অপরাজেয় সংগ্রামী ইতিহাসের সাক্ষী। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, দেশের আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আপন ভূমিকায় সর্বদাই সমুজ্জ্বল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিষ্ঠাকালীন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি, দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা এবং রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান ও চর্চার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে আসছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন্তাচেতনার গভীরে শিকড় সঞ্চার করেই বিকশিত হয়েছে আমাদের জাতিসত্তা ও স্বাধিকার চেতনা। ওই ঐতিহ্য আজও বর্তমান। অবিশ্বাস্য প্রত্যয়ে দেশের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে এবং প্রস্তুত করে চলেছে দেশ পরিচালনার ভবিষ্যৎ সারথিদের। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই এ দেশের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ, গবেষণাভিত্তিক অবকাঠামো আর মানবসম্পদের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। এ বিশ^বিদ্যালয়ে মেধার সঙ্গেই হৃদবৃত্তির গুরুত্ব দিয়ে চালানো হয় পঠন-পাঠন কার্যক্রম। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদের সময় এই বিশ^বিদ্যালয়ে সেশনজট তৈরি হলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে তার নির্দেশনা অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা মুক্তি পেয়েছে সেশনজটের ভয়াল থাবা থেকে। এখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করে নির্দিষ্ট দিনে পরীক্ষা নেওয়া হয়। কোনো সেশনজট নেই, অনিয়ম নেই। আধুনিক পঠন-পাঠন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও দেওয়া হয় সবিশেষ গুরুত্ব। শিক্ষার্থীদের দেশ ও সমাজ সচেতন হিসেবে যেভাবে গড়ে তোলা হয়, তেমনি গড়ে তোলা হয় ক্যারিয়ার সচেতন হিসেবেও। শিক্ষার্থীরা এই বিশ^বিদ্যালয় থেকে সর্বক্ষেত্রে পারদর্শী হয়ে বের হচ্ছে। ফলে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিকভাবে এখানকার শিক্ষার্থীরা নিজেদের ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

পেশাগত দিক দিয়ে মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জুড়ি মেলা ভার। তবে এটিও অস্বীকার করার জো নেই, এ বিশ্ববিদ্যালয় কর্মদক্ষ পেশাজীবী তৈরি করতে সক্ষম হলেও বর্তমানে গবেষণা ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় গবেষণার প্রজনন ক্ষেত্র। গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবনী চিন্তাচেতনার বিকাশ প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এডওর্য়াড শিলস তার ‘দ্য কলিং অব এডুকেশন’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের মৌল কাজ হলো জ্ঞানের চর্চা ও জ্ঞানকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা, বিচার করা, পরিচর্যা করা। তাই গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের জন্য অবশ্যকরণীয় কাজ। কারণ এ ছাড়া জ্ঞানের মর্মে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প নেই।’ তবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।

কিছু গবেষণাকেন্দ্রে তেমন কোনো গবেষণা হয় না। মাঝে মধ্যে সেমিনার আয়োজন করে কেবল নিজেদের উপস্থিতিই জানান দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ এগুলোর কর্মকা-। এর কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের অভাব। প্রতি অর্থবছরে গবেষণা খাতের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ প্রস্তাব করা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এর অনেকাংশই কাটছাঁট করে ফেলে। ফলে গবেষণাকেন্দ্রগুলোয় সেভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না। তবে কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণা খাতে বাজেটের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করছে। স্নাতক শ্রেণিতে মৌলিক গবেষণার ওপর আলাদা বেসিক কোর্সও চালু করা হয়েছে অনেক বিভাগে। তা শিক্ষার্থীদের মৌলিক গবেষণা উদ্ধুদ্ধ করবে। তা ছাড়া তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে গঠন করা হয়েছে ‘ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন ল্যাব’ তথা উদ্ভাবন ও পরিচর্যা পরীক্ষাগার।

পাকিস্তানি শাসনামলে, জিয়া-এরশাদের শাসনামলে এবং বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নানা কৌশলে এ অপশক্তিগুলো এ বিশ^বিদ্যালয়কে দুর্বল করে এ দেশের মেরুদ-ই ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছে। তবে সাময়িক কিছু ক্ষতি হলেও এ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষকদের কারণে বরাবর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য সর্বদা সচেষ্ট। তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন কিংবা পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়ে চলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ওই মোতাবেক চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ালেখার মানোন্নয়নে নানা অবকাঠামোগত সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। ক্যাম্পাসকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ফলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তবে করোনার কারণে সারাদেশের মতো এ বিশ^বিদ্যালয়েরও একাডেমিক কার্যক্রম থমকে গেছে।

ইতোমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েকজন সম্মানিত শিক্ষক ও ছাত্র, এমনকি একজন মারাও গেছেন। করোনায় আজ সাড়ে তিন মাসের বেশি বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বড় ধরনের সেশনজটের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিশ^বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া ও ছুটি কমিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যেমে সেশনজট হ্রাস করার আশ^াস দেওয়া হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হলো, এ বিশ^বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এই জুন মাসের সিনেট অধিবেশনে পাঁচ বছর মেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে গবেষণার উন্নয়ন ঘটানো, শিক্ষা পরিবেশ ও আধুনিকায়ন, প্রশাসনিক দক্ষতার উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ, বিশ^বিদ্যালয় কমিউনিটির উন্নয়ন, বিশ^বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নান্দনিক পরিবেশ, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহণে উৎসাহিতকরণ, সক্রিয় নাগরিকতা উদ্যোগ চালুকরণ, বিশ^বিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং উন্নীতকরণ এবং বিশ^বিদ্যালয়ের সামগ্রিক কার্যাবলিকে ২০৩০ সালের এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা ও ভিশন ২০৪১-এর সঙ্গে সমন্বয় সাধন। এই উদ্যোগগুলো যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তা হলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ফিরে পাবে এর অতীত ঐতিহ্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সিনেট সভায় বঙ্গবন্ধু ‘শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টি’ প্রস্তাবটি অনুসমর্থিত হয়েছে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে জাতির পিতাকে নিয়ে একাডেমিক রিসার্চ সেন্টার থাকলেও আমাদের দেশে এ রকম কিছু ছিল না। যে জাতির জনকের জন্য আজকের এই বাংলাদেশ, তাকে যদি আমরা ভালোভাবে জানতে না পারিÑ তা হলে প্রকৃত উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়। তার আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একাডেমিক রিসার্চ সেন্টার খুবই প্রয়োজন ছিল। তা অন্য অনেক কিছুর মতোই অগ্রনায়কের ভূমিকা নিয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শুরু করছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দেশপ্রেম, কর্ম ভালোভাবে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে আগামী প্রজন্ম এগিয়ে যাবে, দেশকে এগিয়ে নেবে এবং এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে রইবে আমার প্রাণের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।

বাহালুল মজনুন চুন্নু : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

advertisement