advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

যার গানে জুড়িয়ে যায় প্রাণ

শুভ জন্মদিন সৈয়দ আব্দুল হাদী

তারেক আনন্দ
১ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ জুলাই ২০২০ ০৯:০৭
advertisement

‘সত্যি কথা বলতে কি, আমার জন্মদিন আমি নিজেই ভুলে যাই। কখন আসে, না আসে। যখন তোমরা ফোন করে মনে করিয়ে দাও তখনই মনে হয়। আমি কখনো জন্মদিন পালন করা, বরং কেউ করতে চাইলে না করেছি। জাস্ট তোমরা শুভেচ্ছা জানিয়েছো থ্যাংক ইউ। আমার জন্মদিন সম্পর্কে কোনো উত্তেজনা নেই। সোজা কথা, জন্ম হয়েছে মৃত্যু হবে- এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এর মাঝখানে আমি কী করলাম সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি যদি কিছু করে থাকি সেটাই ইমপরটেন্ট। কবে জন্ম নিলাম, বয়স কত হলো; সত্তর না আশি-এগুলো ডাজ নট মেটার। বয়স হওয়াটা কোনো গুণের ব্যাপার না, এগুলো হবেই।’ সাদামাটাভাবে কথাগুলো বলছিলেন দেশের জীবন্ত কিংবদন্তি সৈয়দ আব্দুল হাদী। আজ এই গুণী কণ্ঠশিল্পীর জন্মদিন।

আশি বছরে পা রাখা গানের এই মানুষ সংগীতজীবনের ষাট বছর পূর্ণ করেছেন। তিনি বাংলাদেশি সংগীতের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ। বাংলা গানের সবচেয়ে পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠের অধিকারী এই শিল্পী। যার গানে জুড়িয়ে যায় প্রাণ। এত ভরাট কণ্ঠ দুর্লভ।

সংগীতে আসার পরিকল্পনা প্রথম জীবনে ছিল না সৈয়দ আবদুল হাদীর। একটা সময় শুধু ‘প্যাশন’ ছিল গান করা। বাবার শখের গ্রামোফোন রেকর্ডের গান শুনে সেই কৈশোর জীবন থেকেই সংগীতের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন তিনি। তখন হাতে-কলমে শিখেছেন গান; কিন্তু কখন কীভাবে যে এটাই পেশা হয়ে গেল, তা তিনি নিজেও জানেন না। বললেন, ‘আমাদের সময়ে এমন কোনো পরিস্থিতি ছিল না যে, গান নিয়ে জীবনধারণ করা যাবে; কিন্তু জীবন চলার পথে সরকারি চাকরি, শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় নিয়োজিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত শুধু গানটাই রয়ে গেছে জীবনে।’

সৈয়দ আবদুল হাদীর জন্ম বৃহত্তর কুমিল্লা জেলায়। বেড়ে উঠেছেন আগরতলা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কলকাতায়। তবে তার কলেজজীবন কেটেছে রংপুর আর ঢাকায়। ১৯৫৮ সালে সৈয়দ আবদুল হাদী ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৬০ সালে ছাত্রজীবন থেকেই চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে সৈয়দ আবদুল হাদী একক কণ্ঠে প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র ‘ডাকবাবু’তে কণ্ঠ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সুবল দাস, পিসি গোমেজ, আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফ প্রমুখ তাকে গান শেখায় সহায়তা ও উৎসাহ জুগিয়েছেন। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বেতারে। বেতারে গাওয়া তার প্রথম জনপ্রিয় গান ‘কিছু বলো, এই নির্জন প্রহরের কণাগুলো হৃদয় মাধুরী দিয়ে ভরে তোলো’।

বেতার, চলচ্চিত্র ও অডিওর গানে অনেক কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন তিনি। একক অ্যালবামের মধ্যেÑ ‘একবার যদি কেউ’, ‘পৃথিবীর পান্থশালায়’, ‘একদিন চলে যাবো’, ‘কথা বলবো না’, ‘মেঘের পালকি’, ‘যখন ভাঙলো মিলন মেলা’, ‘নিয়তি আমার’, ‘হাজার তারার প্রদীপ’ প্রভৃতি। এ ছাড়া সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া অ্যালবামগুলো হচ্ছেÑ ‘নীল বেদনা’, ‘বলাকা’, ‘নয়নমণি’, ‘জন্ম থেকে’ এবং ‘গোল্ডেন হিট’।

সৈয়দ আব্দুল হাদীর জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছেÑ ‘আছেন আমার মোক্তার’, ‘আমি তোমারি প্রেম ভিখারি’, ‘চোখ বুজিলেই দুনিয়া আন্ধার’, ‘চক্ষের নজর’, ‘চলে যায় যদি কেউ’, ‘একবার যদি কেউ ভালবাসতো’, ‘এমনো তো প্রেম হয়’, ‘যেও না সাথী’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘সতি মায়ের সতি কন্যা’, ‘তোমাদের সুখের নীড়ে’, ‘কারো আপন হইতে’, ‘যে মাটির বুকে’, ‘এই পৃথিবীর পান্থশালায়’, ‘কথা বলবো না বলেছি’, ‘জানি তুমি চলে যাবে’, ‘সখী চলো না জলসা ঘরে’, ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তে তুমি’সহ একজীবনে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য গান।

আধুনিক, দেশাত্মবোধক ও চলচ্চিত্রে গাওয়া তার অধিকাংশ গানই গেঁথে আছে ভক্ত-শ্রোতার মনে। সৈয়দ আব্দুল হাদী প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিতে। তিনি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন এবং ২০০০ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

তার সুন্দর, সুস্বাস্থ্য জীবন কামনা করছি

খুরশীদ আলম

আমি শুধু অবাক হই, এত বছর বয়স পর্যন্ত তিনি কীভাবে সমানতালে গেয়ে যাচ্ছেন! সম্প্রতি আসিফের সঙ্গে নতুন একটি গান করলেন। এটা অল ক্রেডিট গোস টু সৈয়দ আব্দুল হাদী সাহেব। এটা নিজের অধ্যাবসায়। জীবনের প্রথম দিকে যখন বেতারে ঘোরাঘুরি করতাম, তখন হাদী ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমার ব্যক্তিগতভাবে পর্যবেক্ষণÑ হাদী ভাই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। সেই সময় মাস্টার্স কমপ্লিট করা স্টুডেন্ট। হাদী ভাই অনেক জায়গায় চাকরি করেছেন। তিনি অধ্যাপনাও করেছেন। আসাফ-উদ-দৌল্লাহ খান যেমন সচিব হয়েছিলেন। তিনিও চাইলে সচিব হতে পারতেন। হাদী ভাই শুধু গানের প্রতি ভালোবাসার কারণেই আমলা হননি। তিনি ইচ্ছে করলেই আমলা হতে পারতেন। ওনাদের একটি গ্রুপ ছিলÑ আনোয়ার উদ্দিন খান, আজমল হুদা বাচ্চু, সৈয়দ আব্দুল হাদী, মোবারক হোসেন খান; তারা আমলা হলেন না। হাদী ভাই ইচ্ছে করলে বিসিএস ক্যাডার হতে পারতেন। তিনি গানকে ভালোবেসে পাবলিক লাইব্রেরিতেই থেকে গেলেন। ওখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। হাদী ভাই এই জায়গায় এসেছেন অনেক কষ্ট করে, যেটি আমি ফিল করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন ছাত্র হিসেবে কিংবা একজন ক্ষুদ্র সংগীতশিল্পী হিসেবে সিনিয়রদের কাছ থেকে শেখা, যতটুকু নেওয়ার, সেইটুকু নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর আমি নতুন প্রজন্মকে বলবÑ ফেসবুকে অনেক কিছু সমালোচনা করার চেষ্টা করা হচ্ছে, এগুলো না করাই ভালো।

হাদী ভাইয়ের সঙ্গে আমার পার্থক্য- আমি কথাবর্তা গুছিয়ে বলতে পারি না। হাদী ভাই পাঁচ মিনিটে যেটা বলবেন, আমি সেটি পঞ্চাশ মিনিটেও বলতে পারব না। উনি গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। এর কারণ তোমরা হয়তো অনেকে জানো না, হাদী ভাই জগন্নাথ ভার্সিটিতে অধ্যাপনা করতেন। পিটিসিতে (পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশন) চাকরি করতেন। আমি বলবÑ মনেপ্রাণে একজন জাত শিল্পী। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। হাদী ভাইয়ের এইটুকু আসার পেছনে যাদের অবদান অনেক বেশি তারা হলেনÑ আব্দুল আহাদ সাহেব, সুবল দাস, সমর দাশ। এগুলো আমার নিজের চোখে দেখা। আগে প্রত্যেক শিল্পী পশ্চিমবঙ্গের কোনো না কোনো শিল্পীকে আইডল মনে করত।

কেউ মান্না দে, কেউ সতিনাথ, হেমন্ত প্রমুখ শিল্পীকে আইডল মনে করতেন। হাদী ভাই কাকে আইডল মানতেন জানি না। তখনকার চর্চাই ছিল প্রতি রবিবার আকাশবাণী কলকাতা শোনা। ষাটের দশকে আমরা কলকাতার শিল্পীদের গান শুনতাম। আমাদের দেশে ষাট-সত্তরে যে গানগুলো হয়েছে, সেই গানগুলো কালজয়ী হয়েছে। তখনকার সময় গীতিকার-সুরকারদের মাঝে দারুণ মেলবন্ধন ছিল, বন্ধুত্ব ছিল। হাদী ভাই কখনো আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেননি। আমিও হাদী ভাইকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবিনি। শুধু তা-ই নয়, নবী ভাই (মাহমুদুন্নবী), বশীর ভাই (বশীর আহমেদ) যখন গান গেয়েছেন, তখন হাদী ভাই বলেতেনÑ গানটা খুব ভালো হয়েছে। আবার হাদী ভাইয়ের গানেরও তারা প্রশংসা করতেন।

আজকে আমাদের গান-বাজনার যে অবস্থা, সত্যিকার অর্থে কোনো গার্ডিয়ান নেই। আগে সমর দাশ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল লতিফ, অজিত রায়রা ছিলেন। তারা সবাই আমাদের গার্ডিয়ান ছিলেন। ওই মানুষদের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলাম বলেই আজকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যতটুকু করে খাচ্ছি সবটুকু অবদান তাদের। শুধু শিল্পী হলেই হয় না, আচার-ব্যবহার, ধৈর্যÑ এগুলো তাদের কাছ থেকেই শেখা। যা-ই হোক, কথা বলতে বলতে অনেক কথা বলে ফেললাম। হাদী ভাই ৮০ বছরে পা রাখলেন। হাদী ভাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। তার সুন্দর, সুস্বাস্থ্য জীবন কামনা করছি। আমাদের যেন গানের ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করতে পারেনÑ এটা আমার রিকোয়েস্ট থাকবে ওনার প্রতি।

নতুন গান শুনলেও মনে হয় আমি তার আগের গানই শুনছি

সাবিনা ইয়াসমিন

সৈয়দ আব্দুল হাদী আমাদের মাথার ওপর আছেন বলেই তো আমরা এখনো সাহস পাই অনেক কিছু করতে। একইভাবে এখনো গান করে যাচ্ছেনÑ এটা তার জন্য আল্লাহ তায়ালার আশীর্বাদ। হাদী ভাই এখনো সেই আগের মতোই গান করে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে আমি তার আগের কণ্ঠেই গান শুনছি। এত এত জনপ্রিয় গান আমাদের উপহার দিয়েছেন যে, বলতে গেলে অনেক বড় লিষ্ট হয়ে যাবে। আমিও অনেক গান গেয়েছি তার সঙ্গে, কতগুলো হবে বলতেই পারব না। আগে তো গান গেয়ে চলে আসতাম। রেকর্ডিং খুঁজেই পেতাম না। এখন দেখি ইউটিউবে আমাদের দুজনের অনেক গান আছে। কবে যে গেয়েছি মনেও নেই। হাদী ভাইয়ের সঙ্গে কম করে হলেও হাজারের বেশি গান আছে আমার। আল্লাহ তায়ালা হাদী ভাইকে দরাজ একটা গলা দিয়েছেন। আল্লাহ তো সবাইকে গলা দেন। আল্লাহ কণ্ঠ না দিলে তো কথাই বলতে পারতাম না। এই কণ্ঠটাকে পরিচর্চা করতে হয়। আমরা নিয়ম করেই রেওয়াজ করি। তারপরও রেওয়াজটাই বড়, সংগীতশিল্পীদের জন্য রেওয়াজটা অনেক বেশি জরুরি। রেওয়াজ ছাড়া দীর্ঘদিন গান গাওয়া সম্ভব নয়। যতটুকু পারছি রেওয়াজ করে যাচ্ছি। ক্ল্যাসিকাল শিখেছি। হাদী ভাই তো অবশ্যই শিখেছেন। আমিও শিখেছি ওস্তাদজির কাছে। সেটাকেই কাজে লাগিয়েছি পরবর্তীতে। যা-ই হোক, বড়রা যেমন ছোটদের জন্য দোয়া করেন, ছোটরাও বড়দের জন্য দোয়া করে। হাদী ভাইয়ের জন্য আমার দোয়াÑ আরও বেশি বেশি গান যেন গেয়ে যেতে পারেন। আল্লাহ যেন আরও অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখেন তাকে। তার জন্মদিনে আমার পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

advertisement