advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধির ১০০ বছর

মো. জহির উদ্দিন
১ জুলাই ২০২০ ১৩:১০ | আপডেট: ১ জুলাই ২০২০ ১৩:১২
advertisement

‘শিক্ষাই আলো’ স্লোগান নিয়ে পূর্ববঙ্গ তথা বাঙালিকে আলোর পথ দেখানোর জন্য ১৯২১ সালের আজকের এইদিনে (১ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মোচন করা হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং ১৯১৩ সালে নাথান কমিশনের ইতিবাচক প্রতিবেদন এই উদ্যোগকে তরান্বিত করে। ফলে, ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসেই উদ্যোগটি অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে স্যাডলার কমিশনের ইতিবাচক প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভা পাস করে দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩), ১৯২০।

দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতিগত পরাধীনতার করাল গ্রাস থেকে এই অঞ্চলের মানুষদের মুক্ত করার বীজ নিহিত আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে আলোকিত করে, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বমহিমায় দুর্দান্ত প্রতাপে ১০০ বছর অতিক্রম করতে চলেছে।

আমাদের এক শিক্ষক ক্লাসে প্রায়ই বলতেন যে, প্রত্যেক রাষ্ট্রের উপাদান চারটি কিন্তু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উপাদান পাঁচটি। এই পঞ্চম উপাদান হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই  ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সব মুক্তিকামী আন্দোলন হয়েছে। ৫২-এ ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর সাধীনতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ সত্তার উদ্ধব, দৃঢ় এবং মজবুত হয় ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা আদায়ের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে এক গভীর সম্পর্ক; কারণ রাষ্ট্রভাষা বাংলা আদায়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেছে সাহসিকতার সঙ্গে। পরবর্তীতে ৫২-এ ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ লাভ করে।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসুর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় মেধাবী শিক্ষক এবং ছাত্ররা ছিল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর ভয়ের অন্যতম কারণ। অকুতোভয় মেধাবী শিক্ষক এবং ছাত্রদের রুখতে পাকিস্তানী হায়েনারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর অপারেশন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ২৫ মার্চ রাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৭১ সালের ভয়াল মার্চের দিনগুলোতে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ এর কার্যক্রম পরিচালিত হতো তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরূল হক) থেকে। হানাদার বাহিনীর  প্রধান টার্গেট ইকবাল হলে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে নিদ্রারত ছাত্রদের ওপর এবং লাশের স্তূপ বানিয়ে উল্লাসে মেতে উঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের প্রতিবেদনে, অধ্যাপক কে এ মুনিম লিখেছিলেন যে, শুধু সার্জেন্ট জহুরূল হক হলেই প্রায় ২০০ এর অধিক ছাত্র নিহত হয়।

আর্চার কে ব্লাড তার গ্রন্থ  ‘দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ এ লিখেন যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হলে থেকে বের হতে চাইলে তাদের ওপর মেশিনগান দিয়ে গুলি করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে শহীদদের তাজা রক্ত এবং স্বাধীনতার ঘ্রাণ। স্বাধীনতা পরবর্তী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দলনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

বঙ্গদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে যতটুকু অর্জন, তার বেশিরভাগ অর্জিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই। এই বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, জনপ্রিয় সাহিত্যিক, জাঁদরেল রাজনীতিবিদ, বিশ্বমানের অর্থনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক এবং কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের প্রতিটিস্থানে ছড়িয়ে দিয়েছে উন্নয়নের বীজ। ১৯২১ সালের তুলনায় গত ১০০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি বেড়েছে, বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে বিভাগ, অনুষদ। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাক লাগানো সাফল্য অর্জন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশের শিক্ষাক্ষেত্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জাতির প্রত্যাশা অনেক বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। জন্মলগ্নের ১০০ বছর পর, ২০২০ সালে এসেও নিজের ঐতিহ্য বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে স্বমহিমায় এবং দেশের উন্নয়নের জন্য সব ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। ১০০ বছর পূর্তিতে একটাই প্রত্যাশা অদূর ভবিষ্যতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সগৌরব সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। (তথ্যের বিভিন্ন উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞতা)

লেখক : মো. জহির উদ্দিন। সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষক এবং টিম লিডার, ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশন, ঢাকা। ই-মেইল : [email protected]

advertisement
Evaly
advertisement