advertisement
advertisement

রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত

শ্রমিকদের পাওনা ৫০ শতাংশ নগদে, ৫০ শতাংশ সঞ্চয়পত্রে

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২ জুলাই ২০২০ ২২:৪৪
advertisement

শ্রমিকদের শতভাগ পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব উপস্থিত ছিলেন। বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, আজ যখন প্রধানমন্ত্রী এই সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

মুখ্য সচিব জানান, এ পর্যন্ত এই পাটকলগুলোর পুঞ্জীভূত ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা জানিয়ে আহমদ কায়কাউস বলেন, এখানে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে না। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করে তাদের অবসরে পাঠানো হচ্ছে। ২০১৫ সালের সর্বশেষ মজুরি কাঠামো অনুযায়ী প্রায় ২৫ হাজার পাটকল শ্রমিক অবসরকালীন সুবিধাসহ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাবেন জানিয়ে আহমদ কায়কাউস বলেন, সে জন্য আগামী তিন দিনের মধ্যে শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

মুখ্য সচিব আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন ও রিমডেলিংয়ের জন্য উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের আরও দক্ষ করতে প্রশিক্ষণ দেবে সরকার। পরে এ কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের পাওনা সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। এ জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

মুখ্য সচিব আরও বলেন, পাটকল শ্রমিকরা এত দিন ঠিকমতো তাদের পাওনা

পেতেন না। এখন তাদের সব পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। পাওনার ৫০ শতাংশ টাকা নগদ দেওয়া হবে। বাকি ৫০ শতাংশ পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, মূলত শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য ৫০ শতাংশ পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এতে শ্রমিকরা এখন যে অবস্থায় আছেন তার চেয়ে বেশি ভালো থাকবেন।

ধারাবাহিকভাবে লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী কর্মচারীর চাকরি গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসায়নের সিদ্ধান্ত গত রবিবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া সেদিন বলেছিলেন, শ্রমিকদের অবসায়নের পর আগামী ছয় মাসের মধ্যে পিপিপির (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব) আওতায় আধুনিকায়ন করে এসব পাটকলকে উৎপাদনমুখী করা হবে। তখন এসব শ্রমিক সেখানে চাকরি করার সুযোগ পাবেন। ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে ৮ হাজার ৯৫৪ জন পাটকল শ্রমিক অবসরে গেছেন। তাদের সব পাওনাও একসঙ্গে বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে সেদিন জানিয়েছিলেন পাটমন্ত্রী।

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এর বিরোধিতায় মিছিল-সমাবেশের মতো কর্মসূচি চালিয়ে আসছে কয়েক দিন ধরে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাম জোট পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল ও পাটকল আধুনিকায়নের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, আশির দশকের পর থেকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে দেশে একের পর এক পাটকল বন্ধ করা হচ্ছে। তারা বলছেন, বিশ্বে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তাই ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের যন্ত্রাংশ আধুনিকায়ন করলে শ্রমিক ছাঁটাই নয়, বরং নতুন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

২০-দলীয় জোট শরিক লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-এলডিপির একাংশ রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল ও লুট করে নিজেদের পকেটে ভরে বিদেশে পাচারের যে আয়োজন, তা পাটকলের শ্রমিকরা মানবে না উল্লেখ করে পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে কথিত গোল্ডেন হ্যান্ডশ্যাক প্রক্রিয়ায় শ্রমিক বিদায়ের ঘোষণা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পাটকল বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণার প্রতিবাদে গণমাধ্যমে পাঠানো যৌথ বিবৃতিতে দলটির সভাপতি আবদুল করিম আব্বাসী ও মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম এ দাবি জানান।

জানা গেছে, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে থাকা ২৬টি পাটকলের মধ্যে মনোয়ার জুট মিল ছাড়া সবগুলোয়ই উৎপাদন চলছে। এসব কারখানায় ২৪ হাজার ৮৬৬ জন স্থায়ী শ্রমিকের বাইরে তালিকাভুক্ত ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক আছেন প্রায় ২৬ হাজার। বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো লাভ দেখাতে পারলেও বিজেএমসির আওতাধীন মিলগুলো বছরের পর বছর লোকসান করে যাচ্ছে, যার পেছনে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া এর আগে জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো গত ৪৪ বছরের মধ্যে মাত্র ৪ বছর লাভ করেছে। ৪৮ বছরে এই খাতে সরকারকে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। প্রতিবছর শ্রমিকের মজুরিসহ খরচ মেটাতে সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

advertisement