advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আবার পাটকেল পাটকলে

গওহার নঈম ওয়ারা
৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২ জুলাই ২০২০ ২৩:৫৫
advertisement

পাটমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, করোনার কারণে কোলাকুলি-হ্যান্ডশেক বন্ধ থাকলেও পাটকলের জন্য ছাড় আছে, সেখানে সোনালি হ্যান্ডশেক বা গলা ধাক্কা চলবে। সব পাটকল লক করে দেওয়া হবে। মন্ত্রীর এসব কথা শুনে সাংবাদিকরা গিয়েছিলেন পাটকল কোম্পানির (বিজেএমসি) চেয়ারম্যানের কাছে। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত তাকে জানানো হয়নি। সিদ্ধান্ত জানলে বিজেএমসি ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। বিজেএমসি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী সংস্থা মাত্র। এক নাছোড় সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, ‘তা হলে সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার যে কথা উঠেছে সেটা কি ভুয়া খবর? এমন প্রশ্নের উত্তরে বিজেএমসির চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘ভুয়া হবে কেন? হয়তো ভেতরে ভেতরে সে রকম আলোচনাই চলছে, আমি এখনো জানি না।’

শ্রমিকরা এখন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তারা একাট্টা হয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলনে নেমেছেন। শ্রম প্রতিমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে তারা মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকি দেখা করলেও কাজ হয়নি।

ভেতরে ভেতরে কথা যে অনেক দূর গড়িয়েছে, তা শ্রম প্রতিমন্ত্রীর কথার ভাঁজে বেশ পরিষ্কার, তিনি খুব স্পষ্ট করে টাকার হিসাব জানিয়ে দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, ‘এখন গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের যে কথা বলা হয়েছে, তাতে একজন শ্রমিক ১২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা পাবে। আর সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ টাকাও পাবে। একসঙ্গেই তা দেওয়া হবে। সুতরাং এখন আর তখন বড় বিষয় নয়, শ্রমিকরা যাতে না ঠকেন, সেটাই হচ্ছে বড় কথা।’ মন্ত্রীর কথার কি এটাই মানেÑ ‘মানে মানে নগদে যা পাচ্ছ তা নিয়ে রাস্তা মেপো আমরা তোমাদের রাখব না?’

মন্ত্রী ভেবেছিলেন লাখ টাকার হিসাব একসঙ্গে পেমেন্ট এসবের মুলা-গাজর দেখালে শিকে ছিঁড়বে। হয়তো ছিঁড়বে, হয়তো ভাঙবে শ্রমিকদের ঐক্য আর না হলে লাঠি তো আছেই। হয় মুলা, নয় লাঠি আমাদের শ্রম গভর্ন্যান্স এই নীতির বাইরে আসতে পারল না। নানা শ্রমিক আর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের অভিজ্ঞ নেতা বর্তমান শ্রমমন্ত্রী নিশ্চয় বিশ্বাস করেন শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শ্রমিকদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করাটাই গণতান্ত্রিক শ্রম ব্যবস্থাপনার প্রধান শর্ত। মুখের কথায়, আর কাজের কথায় পার্থক্য থাকলে চলবে কীভাবে?

গোড়ায় গলদ : গোল্ডেন ঘাড় ধাক্কা বা হ্যান্ডশেকের খবরাখবর দেখার সময় একজন পাঠকের একটা সংক্ষিপ্ত মন্তব্য নজরে এলো। তিনি লিখেছেনÑ ‘গোড়ায় গলদ’ ব্যস আর কিছু না। কোনো কোনো ভুল আছে যা হাজার কাফফারা দিলেও আর পার পাওয়া যায় না। যেমন ছোটকালে হাত ভাঙলে হাতুড়ে চিকিৎসা নিয়ে পরে হাসপাতালে গেলে নার্স-চিকিৎসকদের বিশেষ কিছু করার থাকে না। তারা ভাঙা জোড়া লাগাতে পারলেও হাতটা বাঁকাই থেকে যায়। রাস্তাঘাটে, গ্রামে-পরিবারে এসবের অসংখ্য জীবন্ত উদাহরণ আমাদের আশপাশে আছে। বাঁকা হাতে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এ দেশে শিল্প ব্যবস্থাপনার গোড়াতেই অনেক গলদ সিদ্ধান্তের কাফফারা আমাদের দিয়েই যেতে হবে।

শ্রমমন্ত্রীর নিশ্চয় মনে আছে স্টার জুট মিলের কথা। ’৭১-এর ডিসেম্বর কি ’৭২-এর জানুয়ারি হবে। জুট মিলের প্রধান নির্বাহী ছিলেন এক ইংরেজ ভদ্রলোক, তাকে সেই শীতের মধ্যে অর্ধ উলঙ্গ করে শ্রমিক নেতারা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলেন। নেতাদের দাবি ছিল যুদ্ধের নয় মাসের বেতন এখনই পরিশোধ করতে হবে। এর আগে নতুন সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছিল যুদ্ধের নয় মাস কাজ না করলেও শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্টের কথা মনে রেখে সরকার তাদের এই কয় মাসের বেতন দিয়ে দেবে। কীভাবে দেবে, কে দেবে, কবে দেবেÑ এসব কিছুই ছিল না সে ঘোষণায়। নেতারা তাদের ক্ষমতা দেখানোর যেন একটা অছিলা পেল। পৌষের শীতে সেই ইংরেজ ভদ্রলোকের নিউমোনিয়া হওয়ার জোগাড়। তার স্ত্রী নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে জেলা প্রশাসকের শরণাপন্ন হন। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের বিশেষ ম্যান্ডেট নিয়ে আসা সেই জেলা প্রশাসককে সেদিন নির্দোষ ইংরেজ ম্যানেজারকে মুক্ত করতে জীবনের চরম ঝুঁঁকি নিতে হয়েছিল। যেসব অপরিণামদর্শী নেতা সাধারণ শ্রমিকদের খেপিয়ে এসব হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা এমপি-হুইপ-মন্ত্রী হয়েছেন। পাটকল-চটকল চটকিয়ে তারা বড় হয়েছেন, বর পেয়েছেন। শ্রমিকরা পেয়েছেন লে-অফ, ছাঁটাই, ঘাড় ধাক্কা সোনালি হ্যান্ডশেকের আহ্বান। এটা মাত্র একটা উদাহরণ, এ রকম ভূরি ভূরি ঘটনা আছে।

আমরা ঘোড়ার আগে গাড়ি বেঁধে দিয়েছিলাম জাতীয়করণের সময়। ভাবিনি এটা যুগোস্লাভিয়া নয়। পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারে বসে তখন সিদ্ধান্ত সাজাচ্ছিলেন প্রফেসর রেহমান সোবহান। শিল্প সচিব মহিউদ্দিন তাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন ঢালাও জাতীয়করণ এই মুহূর্তে হিতে বিপরীত হবে। শিল্প সচিবসহ যুদ্ধ থেকে ফেরা কয়েকজন দেশপ্রেমিক তরুণ অফিসার তার সঙ্গে দেখা করে একটা বিকল্প প্রস্তাব রেখেছিলেন।

সেই প্রস্তাবে ছিলÑ ১. বাংলদেশি মালিক যারা দেশে আছে তাদের মিল-কলকারখানা জাতীয়করণের আওতামুক্ত রাখা।

২. পরিত্যক্ত ছোটখাটো কারখানা-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করা হোক।

৩. শুধুমাত্র বড় কলকারখানা আর প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হোক।

প্রস্তাবে জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক দলের নেতা-পাতি নেতাদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে পরীক্ষিত সিভিল সার্ভেন্ট আর কলকারখানাগুলোয় কর্মরত সিনিয়র অফিসারদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

বলা বাহুল্য, এর একটাও কানে তোলেননি পরিকল্পনা কমিশনের রেহমান সোবহানরা, বরং মুজিবনগর ফেরত অফিসারদের আমলাতন্ত্রপ্রীতি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

শেষ পর্যন্ত যে উদ্দেশ্য নিয়ে পাটকলগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। হওয়ার কথাও ছিল না। অদক্ষতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় ডুবে যায় সব স্বপ্ন।

রাষ্ট্রীয়করণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিরাষ্ট্রীয়করণের পদক্ষেপ ১৯৮২ সালে এরশাদশাহী ক্ষমতায় আসার পর পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন সাবেক আমলা এসএম শফিউল আজমকে। তিনি বিরাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যাদের হাতে মিলগুলো দেওয়া হয়, তারা সেগুলো চালাননি। অনেকে কারখানা বিক্রি করে বিদেশে চলে গেছেন। বিএনপির আমলেও কিছু কারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলাফল একই। শেষ পর্যন্ত এই পদক্ষেপটিও আক্ষেপে পরিণত হয়।

ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিল আওয়ামী সরকার, আওয়ামী লীগ তার ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে পাট খাতকে লাভজনক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া খুলনার খালিশপুর জুট মিলস, দৌলতপুর জুট মিলস, সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী জুট মিলস ও ফোরাম কার্পেটস ফ্যাক্টরি ফিরিয়ে নিয়ে চালুও করে। বিজেএমসির দেনা পরিশোধ করে নতুন ধারায় এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল তারা।

এই অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানিতে আয় বেড়েছে ২১ শতাংশ। এর মধ্যে পাটকলগুলোর উৎপাদিত মূল পণ্য পাটসুতা ৩৩ শতাংশ এবং চট ও বস্তা রপ্তানি ৬ শতাংশ বেড়েছে। যদিও রপ্তানির ৮০ শতাংশই অসরকারি পাটকলের দখলে। তবুও বলতে হবে পাটের বাজার আছে। আমাদের কল আছে, লোকবল আছে; কিন্তু কেন পেরে উঠছে না অসরকারিদের সঙ্গে।

এরপর কী হবে : পাটকলগুলোয় বর্তমানে স্থায়ী শ্রমিক ২৪ হাজার ৮৬৬ জন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত বদলি ও দৈনিকভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। এদের বিদায় করে দিয়ে কলগুলো নাকি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদনমুখী করা হবে। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী সে রকমই বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ খাতকে এভাবেই এগিয়ে নিতে হবে।

উচিত ছিল সে মহাপরিকল্পনার খসড়া রূপরেখা তৈরি করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। সবকিছু মাথার মধ্যে রাখলে সন্দেহ আর অবিশ্বাস দানা বাঁধবে।

পাটচাষিদের কী হবে : পাটকল বন্ধ মানে পাট কেনা বন্ধ। কৃষকের পাট এখন লক লক করছে, মাস দেড়েক পর পাট কাটা পড়বে। কোথায় যাবেন সে পাট নিয়ে। করোনা আক্রান্ত পৃথিবীকে আবার লাইনে আনার জন্য যখন কৃষিকে সবাই গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন পাট চাষিদের পেটে কেন লাথি দেব আমরা। আমরা জানি, প্রায় ৮০ লাখ থেকে এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাট ও এ-জাতীয় আঁশ ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক শূন্য লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়, যা থেকে প্রায় ৮০ লাখ বেল পাট আঁশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বছরে উৎপাদিত পাট আঁশের প্রায় ৫১ শতাংশ পাটকলগুলোয় ব্যবহৃত হয়, প্রায় ৪৪ শতাংশ কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি হয় এবং মাত্র ৫ শতাংশ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। যদি এবার সবটাই বা ৮০ শতাংশ পাট রপ্তানি করতে হয়, তা হলে সেটার কোনো ব্যবস্থা বিহিত হয়েছে কি? কোন দেশ কী দামে কবে কখন পাট কিনবে, সেসব পরে দেখার বিষয় নয়, বরং গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের চাইতেও জরুরি।

গওহার নঈম ওয়ারা : লেখক গবেষক

advertisement