advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কৃষিই দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচাতে পারে

ড. মো. শাহজাহান কবীর
৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২ জুলাই ২০২০ ২৩:৫৫
advertisement

করোনা মহামারী-উত্তর সারাবিশে^ নিশ্চিত পরিণতি যেখানে খাদ্যসংকট, ঠিক তখনই বাংলাদেশ সম্পর্কে উল্টো তথ্য দিচ্ছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)Ñ ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় চাল উৎপাদনে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিগত আউশ, আমন ও চলতি বোরোর আশাতীত বাম্পার ফলন হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে এ বছর চালের উৎপাদন হবে মোট ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন। এতদিন চাল উৎপাদনের তিন নম্বর স্থানটি দখলে ছিল ইন্দোনেশিয়ার। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে চীন-ভারত থাকলেও তিন নম্বর স্থানটি দখল করে নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত আমন মৌসুমে রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। আউশ মৌসুমেও চালের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ চলতি বোরো মৌসুমে সাড়ে চার লাখ টন বাড়তে পারে চালের উৎপাদন। তিন মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্মিলিত ফলই বাংলাদেশ শীর্ষ তিনে চলে আসার মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

করোনা প্রাদুর্ভাবকে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বৈশি^ক মহাবিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। করোনা নিয়ে আমাদের মধ্যে মারাত্মক ভীতি থাকলেও করোনা বুঝিয়ে দিয়েছে কোথায় কোথায় গুরুত্ব দিতে হবে। ধান নিয়ে সবার মধ্যে এক ধরনের অনীহা বা আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছেÑ ত্রাণ, সাহায্য, প্রণোদনা যাই বলি না কেন, বাহ্যত চালই প্রধান এবং দেশের প্রধান জীবনরক্ষাকারী ও খাদ্যনিরাপত্তাকারী ফসল। সবারই এখন উপলব্ধি হচ্ছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কৃষিই মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে সরকার দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যখন করোনা মোকাবিলা, খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার এক ধাপ এগিয়ে গেছে, ঠিক তখনই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো আবির্ভূত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এতে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি আক্রান্ত হয়েছে। টাকার অঙ্কে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

সারাদেশে এ বছর বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ কোটি ৪ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে হাওরের শতভাগ এবং সারাদেশে প্রায় ৯০ শতাংশ ধান কর্তন করা হয়েছে। করোনার লকডাউনের কারণে এবারের বোরো ধান ঠিকমতো কাটা ও ঘরে তোলা নিয়ে সর্বমহলে এক ধরনের উৎকণ্ঠা ছিলÑ এটা ঠিক। কিন্তু পরিস্থিতির উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সরকারের পুরো প্রশাসন এসে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এক ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষও ঝাঁপিয়ে পড়েন বছরের সবচেয়ে বড় ফসল বোরো ধান ঘরে তুলতে। ধান কাটার এ কর্মযজ্ঞটি প্রতিদিন সরাসরি মনিটর করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এ কাজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক এমপি। এবার সরকারের যান্ত্রিক সহযোগিতা হাওরসহ সারাদেশের ধান কাটায় যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার দিয়ে মহাধুমধামেই কৃষকরা এখন ঘরে তুলছেন তাদের মাঠের সোনালি ফসল। সময়মতো ধান কাটা, ঘরে তুলতে পারা এবং আশাতীত ফলন ও দাম পেয়ে দারুণ খুশি কৃষকরা এবং খাদ্যনিরাপত্তায় এসেছে স্বস্তি।

২০২০ সালের করোনা মহামারী-পরবর্তী কী ঘটবে, ওই আশঙ্কা মাথায় নিয়ে এখনই জরুরি পদক্ষেপের বিকল্প নেই। করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা আক্রান্ত হওয়া মানে বাঁচা-মরার আরেক সংকটের মুখোমুখি হওয়া। এ কারণে কৃষির ওপর করোনা পরিস্থিতির প্রভাব সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ বা উত্তরণের জন্য করণীয় নির্ধারণ করতে হবে এবং তা করতে হবে এখনই। এসব কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলছেন, এক ইঞ্চি জমি যেন পতিত না থাকে। যে যেভাবেই পারেন, প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার সদ্ব্যবহার করবেন। বাড়ির উঠান, আশপাশে তরিতরকারি, ফল-মূলের গাছ লাগালেও পরিবারের কাজে লাগবে। অনেকে বিক্রি করে কিছু পয়সার মুখ দেখবেন। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী কৃষিমন্ত্রীকেও বিশেষভাবে নজরদারি করতে বলেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশ। তার পরও বসে থাকলে চলবে না। করোনার কারণে অনেক দেশ সংকটে পড়বে। আমাদের থাকলে আমরা যেন তাদের সহযোগিতা করতে পারি।

বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত ও সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বিষয়ে জাতিসংঘের সতর্কবাণীর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই করোনা মহামারীর কারণে মন্দার হাত থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও মজুদ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষি প্রণোদনার। এটিসহ কৃষি প্রণোদনায় মোট বরাদ্দ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সারের জন্য ঘোষণা করেছেন ৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি।

বাংলাদেশে খাদ্যসংকট যাতে না হয়, এ জন্য যা যা করা দরকারÑ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কেননা তিনি বিশ^াস করেন, কৃষিই একমাত্র আসন্ন সংকট থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে। তিনি সম্প্রতি এক সভায় বলেছেনÑ খাদ্যই একমাত্র সমাধান, কৃষিই একমাত্র বাঁচাতে পারে। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় আমাদের বর্তমান সরকার কৃষিকে ঘিরে নানা পরিকল্পনা ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষিকে রক্ষায় কৃষকদের বাঁচাতে তাদের দুর্যোগের এ সময়ে দিয়েছেন আর্থিক সহায়তা ও উপকরণ প্রণোদনা, কৃষি মন্ত্রণালয়কে দিয়েছেন সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা। তার প্রত্যাশাÑ খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে আমাদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে।

আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় কৃষিবান্ধব পদক্ষেপের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে চালের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বর্তমান সরকারের গত ১১ বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ধান উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানটি দখলে নিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে বিশ্বে অন্যতম ধান উৎপাদনকারী হিসেবে পরিচিত যেসব দেশ (যেমনÑ ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড), সেসব দেশের অধিকাংশেরই ধান উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমলেও একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশ। ধান উৎপাদনে বিশ্বের বড় দুই দেশ ভারতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ শতাংশ ও চীনের শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির হারে সবাইকে ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশ। উৎপাদন প্রবৃদ্ধির এই হার ছিল ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

উৎপাদন প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে চলতি খরিপ-১ মৌসুমে উফশী আউশ উৎপাদন বাড়াতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে প্রণোদনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে মোট ৪০ কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকার বীজ, ডিএপি-এমওপি সার, পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় প্রদান করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ এক বিঘা জমির জন্য একজন কৃষক মোট ৮৭৫ টাকার প্রণোদনা পেয়েছেন। এ প্রণোদনা কার্যক্রম শেষ হতে না হতেই করোনা ভাইরাসের থাবায় বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতিতে পরিবর্তন শুরু হয়। এ জন্য আউশের উৎপাদন আরেকটু বাড়িয়ে নিতে কৃষককে দ্বিতীয় ধাপে আরও সহায়তা দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় আউশের জন্য কৃষকদের মধ্যে বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। আউশ ছাড়াও মৌসুমের অন্যান্য শস্য, বিশেষ করে পাট, তিল ও গ্রীষ্মকালীন সবজি আবাদে প্রণোদনা সুবিধা পাবেন কৃষক। এর পাশাপাশি বিএডিসির আওতাভুক্ত এলাকায় সেচ খরচ ৫০ শতাংশ হ্রাসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিএমডিএ, তিস্তা, মেঘনা-ধনগোদা, জিকে সেচ প্রকল্পসহ প্রাতিষ্ঠানিক সেচ প্রকল্প এলাকাগুলোয় সেচ খরচ ফ্রি করা হচ্ছে। এভাবে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

সময়মতো যাতে আউশ রোপণ নিশ্চিত করা যায়, এ জন্য সব পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। আসন্ন আউশ মৌসুমে আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখান থেকে মোট উৎপাদন হবে ৩৭ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন। আউশের গুরুত্ব সম্পর্কে কৃষিমন্ত্রী মিডিয়ায় বলেছেন, আউশের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য ধরে রাখতে আউশ আবাদ বাড়ানো হবে। উচ্চফলনশীল জাতের আউশ ধান আবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি করা হবে। করোনা পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা আরও জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে আউশ উৎপাদন।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের হিসাবে কোনো মৌসুমে ধানের দাম ১ শতাংশ হারে বাড়লে পরবর্তী মৌসুমে ২ শতাংশ হারে আবাদ বাড়ে। তাই সামনের আউশ ও আমন আবাদ এলাকা বৃদ্ধিতে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, কৃষি বিভাগের ১৪টি অঞ্চল ও জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকদের পাঠানো তথ্য অনুসারে সারাদেশে বর্তমানে ৭০০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে। এবার ধানের যা দাম আছে, এতে কৃষক বেশ সন্তুষ্ট। তা ছাড়া সামনের আউশ এবং তার পর আবার আমন থেকে সংগ্রহতব্য ধান ও চালে এই মজুদে বাড়তি নিরাপত্তা যোগ করবে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আপাতত কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই।

আপাতত খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে করোনা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিকল্পিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই। করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় উন্নত দেশ থেকে ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। ফলে দেশীয় সীমিত সম্পদের ব্যবহার করে কীভাবে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জিত হয়, সেদিকে দৃষ্টি রেখে এগিয়ে যেতে হবে। বিশাল জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখার কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রমই হতে পারে ভবিষ্যতে দুর্ভিক্ষের মতো দুর্যোগ মোকাবিলার অন্যতম উপায়। এ জন্য চাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও এর যথাযথ বাস্তবায়ন।

ড. মো. শাহজাহান কবীর : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

advertisement