advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বন্যা ও করোনার কবলে দেশ

বিভুরঞ্জন সরকার
৪ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩ জুলাই ২০২০ ২২:৩২
advertisement

সবার মনোযোগ যখন করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতার দিকে, এই অদৃশ্য শত্রুকে মোকাবিলা নিয়ে দুনিয়াজোড়া মানুষ যখন খাবি খাচ্ছে, আমাদের দেশেও আমরা যখন বিপন্ন দশায়, তখন দেশের কয়েকটি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যা। এর মধ্যে একাধিক নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কোথাও স্থিতিশীল, তো কোথাও পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি। ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ, গবাদিপশুর খামার, পুকুরের মাছ তলিয়ে গেছে, ভেসে গেছে। নদীভাঙনে কোনো কোনো জায়গায় ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে। বানভাসি মানুষ শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য, গৃহপালিত গরু-ছাগলের খাদ্য সংকটে ভুগছে। সরকার ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। তবে তা নিশ্চয়ই প্রয়োজনের তুলনায় কম। ত্রাণে প্রাণ বাঁচে না। তবে পানির ছোবল যখন তীব্র হয়, মানুষ যখন পা রাখার মাটি পায় না, তখন সরকারি ত্রাণ সহায়তা মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতে শক্তি জোগায় বৈকি!

এ লেখাটি যখন লিখছি (২ জুন, বিকাল), তখনকার তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন নদীর ১০১টি পয়েন্টের মধ্যে ১৫ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি উঁচুতে প্রবাহিত হচ্ছে বাহাদুরাবাদে যমুনা নদীর পানি, বিপদসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। ফলে জামালপুর, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, বগুড়ার নি¤œাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ৫৯, চিলমারীতে ৭০, ফুলছড়িতে যমুনার পানি ৮৩, সারিয়াকান্দিতে ৬৬, কাজীপুরে ৭০ ও সিরাজগঞ্জে ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া আত্রাইয়ের পানি ২১ সেন্টিমিটার, ধলেশ্বরীর পানি ২০, সুরমার পানি কানাইঘাটে ১৩, কুশিয়ারার পানি সুনামগঞ্জে ১৫ ও পুরাতন সুরমার পানি দিরাইয়ে ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লালমনিরহাটের বন্যায় কমপক্ষে ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও বানভাসি মানুষের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রেও নেওয়া হয়েছে।

পানিবন্দি মানুষের নানামুখী সমস্যা মোকাবিলা করে বাঁচতে হয়। তবে বন্যা সমস্যা বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবছরের। কয়েক বছর পর পর বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হলেও ছোট ও আঞ্চলিক বন্যা হরবছরই হয়। বন্যার সঙ্গে সঙ্গে বসবাস ও একে মোকাবিলার অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষ এবং প্রশাসনের রয়েছে। করোনা ভাইরাসের সঙ্গে বসবাস এবং মোকাবিলার অভিজ্ঞতা নেই। এ শত্রু নতুন এবং এর আক্রমণ পদ্ধতিও অজানা, অনেকটা যেন গেরিলা পদ্ধতিতে মানবদেহে হানা দিচ্ছে, জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বন্যার হামলার ধরনটা সবার জানা। করোনার পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া যায়। কখন-কীভাবে বন্যা হবে, তা আবহাওয়া দপ্তর, বন্যা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে দেওয়া হয়। মূলত উজানে পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণের কারণেই আমাদের দেশে বন্যা হয়।

প্রতিবছরই বন্যায় জানমালের ক্ষতি হয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণের কথা আমরা বহু যুগ থেকেই শুনছি। পাকিজমানায় আমরা কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীকে দুষতাম। তারা বাংলাদেশের মানুষের জানমাল নিয়ে ভাবত না। তাই আমাদের বন্যা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিল না। আমরা স্বাধীন হয়েছি ৫০ বছর হতে চলল। স্বাধীন হয়েও এত বছরে আমরা বন্যা থেকে মুক্তি পেলাম না কেন? আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব হয়তো এর একটি কারণ। বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি হয়তো আর আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যেও নেই। প্রতিবছর বন্যা আসবে, মানুষ পানিতে ভাসবে, জনদুর্ভোগ নিয়ে আমরা হাহুতাশ করব, কিছু গান-কবিতা চর্চা হবে, ত্রাণ তৎপরতা হবে, তার পর স্বাভাবিক নিয়মে পানি কমে যায়, আর বন্যা নিয়ে আমাদের শোকাশ্রুও শুকিয়ে যায়।

আমাদের নদ-নদীর উৎস বাইরে। পানি নিয়ে আমাদের সমস্যা বহুমাত্রিক। শুকনো মৌসুমে পানির ঘাটতি, বর্ষা মৌসুমে প্লাবন এটা এই দুর্গতি থেকে রেহাই পাওয়া আমাদের জন্য সহজ নয়। প্রতিবেশী ভারতের উদার সহযোগিতা ছাড়া আমাদের পানি সমস্যার সমস্যা সম্ভব নয়। বন্যা সমস্যা সমাধানে বাঁধ নির্মাণসহ কিছু কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি। না সেচ সংকট দূর হয়েছে, না বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। কারণ পানির মূল নিয়ন্ত্রণ তো ওপরের দেশের হাতে। আর ‘পানি রাজনীতি’ বর্তমান দুনিয়ায় একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণে আমরা এতদিনে ভাগ্যের হাতে হাতে আত্মসমর্পণ করে ‘ইয়া নফসি, ইয়া নফসি’ করা ছাড়া কার্যকর কিছু করতে পারি না।

অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের দুনিয়াজোড়া সুখ্যাতি আছে। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ মেয়াদি বন্যায় দুই কোটি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করেছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। কিন্তু তেমন আশঙ্কা সত্য হয়নি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনা ভাইরাস আমাদের অর্থনীতি, জীবন-জীবিকাকে কাবু করে ফেলেছে। বানের পানিতে খাবি খাওয়ার আগেই আমাদের নাক ডুবে আছে করোনাত্রাসে। অভ্যস্ত বিপদ এবং অনভ্যস্ত বিপদকে একসঙ্গে মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। আমাদের সম্পদ সীমিত। আছে দুর্নীতি, অপচয়। সমন্বয়হীনতা। এবার বন্যা যদি ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী না-ও হয়, তবু দুর্গতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। ধৈর্যহারা না হয়ে, দোষারোপের রাজনীতি চর্চায় মত্ত না হয়ে সম্মিলিত দায়িত্ব বোধে উজ্জীবিত হতে পারলে হয়তো মহাবিপদের মুখোমুখি আমাদের না-ও হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শক্ত হাতে হাল ধরে আছেন। তার প্রতি অকারণ সন্দেহবশত সৎ ও উদ্যোগী মানুষরা হাত গুটিয়ে নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে দুর্যোগকবলিত সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হবে না।

বিপদে মানুষের পাশে থাকার একটি ঐতিহ্য আমাদের আছে। যদিও বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি চর্চার কারণে আমাদের কল্যাণমুখী ঐতিহ্যগুলো ম্লান হতে বসেছে। তবে মানুষের মন থেকে শুভবোধ, কল্যাণচিন্তা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় না। শুকনো ডালে যেমন নতুন পাতা গজায়, তেমনি মানুষের মনেও সজীবতা ফিরে আসে। বিপদ জয়ে এবং জীবনযুদ্ধে মানুষ সাময়িক পিছু হটলেও পরাজিত হয় না। এই জয়যাত্রায় শুভচিন্তার মানুষদের এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

advertisement