advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনাকালীন বিপর্যয়ে বাংলাদেশের কৃষিতে করণীয়

ড. মো. ছায়ফুল্লাহ
৪ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩ জুলাই ২০২০ ২২:৩২
advertisement

চীনের উহান থেকে করোনা মহামারী আজ সারাবিশ্বে আঘাত হেনেছে এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ইতোমধ্যেই হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বিশ্বে আর্থিক মন্দা ২০০৯ সালের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে মন্দার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ০.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল, কিন্তু এবারের করোনা বিপর্যয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি ১.৬০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বে আর্থিক মন্দা মারাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা এক সতর্ক বার্তায় বলেছে, করোনা মহামারী দীর্ঘস্থায়ী হলে পৃথিবীর অনেক দেশই খাদ্য উৎপাদনে চরম সংকটে পড়বে এবং বিশ্বের অন্তত ৩৬টি দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশেও গত ৮ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। করোনা মহামারী বাংলাদেশের ঊর্ধ্বমুখী অর্থনীতিকে ইতোমধ্যেই ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। দেশের প্রবাসী আয়, গার্মেন্টস পোশাক রপ্তানিসহ অন্যান্য খাতের আয় ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। দেশের এ পরিস্থিতিতে কৃষি খাতই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার বিশ্বস্ত হাতিয়ার। তাই এ মুহূর্ত থেকে আগামী তিন বছরের জন্য কৃষির চলমান অগ্রগতির ধারাকে অব্যাহত রেখে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাকের সুযোগ্য নেতৃত্ব জাতির এই ক্লান্তিলগ্নে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রশাসনের লোকজনসহ সরাসরি কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি ইঞ্চি জমি কৃষি উৎপাদনের আওতায় এনে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। তাই এ লক্ষ্য অর্জনে করোনা দুর্যোগ মোকাবিলা করে দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিক্ষেত্রে করণীয় নিয়ে আলোকপাত করা হলো :

১। ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নিয়ে এ বছরের আউশ ও আমন মৌসুমের প্রতি নজর দিতে হবে। স্থানীয় জাতের পরিবর্তে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাতের ধান আধুনিক কলাকৌশল অবলম্বন করে চাষ করার জন্য প্রয়োজনীয় বীজ সহজলভ্য করে পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করতে হবে। খরিপ-১ মৌসুমের অন্য ফসল যেমনÑ পাট, ডাল ও অন্যান্য ফসলের চাষের লক্ষ্যমাত্রা যাতে অর্জিত হয় সে বিষয়ে কৃষি গবেষণা, বিএডিসি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ কর্মধারা জোরদার করা।

২। আউশ ও আমন মৌসুম থেকে শুরু করে রবি মৌসুম পর্যন্ত ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও অন্যান্য উপকরণ বাজারে যাতে পর্যাপ্ত থাকে তার জন্য উৎপাদন ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে হবে।

৩। আগামী বোরো চাষের জমির পরিমাণ বাড়ানোর ব্যবস্থা করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক। সেই সঙ্গে হাওর অঞ্চলে আগামী বোরো মৌসুমে ব্রি-ধান২৮ বা আরও আগাম জাতের ধান চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা, যাতে হাওরে বোরো ধান আগাম বন্যার ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে।

৪। আগামী রবি মৌসুমে বিভিন্ন ফসল যেমনÑ গম, ভুট্টা, আলু, শাকসবজি, মসলা, ডাল, তেল ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। রবি মৌসুমে ভুট্টা চাষের আওতায় জমির পরিমাণ বাড়ানোর দিকে বিশেষ লক্ষ্য রেখে পরিকল্পনা করা দরকার।

৫। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গুণগত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করা। শুধু মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করেই ফসলের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

৬। ফসল উৎপাদনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ধান চাষে সরাসরি ইউরিয়া সার ব্যবহার না করে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে, এতে ২৫-৩০ ভাগ ইউরিয়া সারের সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি গড়ে ২০-২৫ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পাবে।

৭। ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহার করতে হবে। সঠিক সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলের ১০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি কমানো সম্ভব।

৮। দেশে প্রায় ১.৫২ কোটি কৃষি পরিবার ও ১.৩৫ কোটি কৃষিবহির্ভূত পরিবার রয়েছে, কৃষি পরিবারের বসতবাড়িতে এবং কৃষিবহির্ভূত পরিবারের বাসার আঙিনায় ও বাড়ির ছাদে সবজি, ফল, মসলা ও ঔষধি ফসলের চাষাবাদ করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

৯। বাংলাদেশে প্রায় ৪.০ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য পতিত জমি রয়েছে, এ জমিকে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে চাষাবাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

১০। সারাদেশেই কৃষি শ্রমিকের বিরাট সমস্যা রয়েছে এবং কৃষি শ্রমিকের অধিক মূল্যের জন্য ফসলের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে, অনেক সময় শ্রমিক সংকটের কারণে সঠিক সময়ে ফসল সংগ্রহ করা যায় না ফলে পাকা ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই কৃষিকাজে যন্ত্রপাতি ব্যবহার অত্যাবশ্যক। ধান কাটার জন্য কম্বাইন হারবেস্টর ও রিপার, চাষের জন্য পাওয়ার টিলার, বীজ বপন যন্ত্র, নিড়ানি যন্ত্র, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ইত্যাদি সহজলভ্য করে পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করতে হবে। আশার কথা, কৃষি মন্ত্রণালয় সারাদেশের জন্য ৫০ শতাংশ এবং হাওর এলাকার জন্য ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যক্রম শুরু করেছে।

১১। কৃষিপণ্য ও উপকরণের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থা সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকা- জোরদার করতে হবে। কৃষক যেন তার উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য পায়, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি উপজেলায় সমবায় মার্কেট এবং বড় বড় শহরে কেন্দ্রীয় কৃষি সমবায় মার্কেট ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

১২। জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের আওতাধীন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল জাত ও উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবনে বিশেষ গুরত্ব দিতে হবে।

১৩। সামগ্রিক কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে করোনাযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দিয়ে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সামগ্রী ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।

১৪। কৃষি উৎপাদন টেকসই করার লক্ষ্যে এবং কৃষকদের কৃষি উৎপাদন ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য শস্যবীমার প্রবর্তন একান্ত প্রয়োজন।

১৫। প্রকৃত কৃষকদের জন্য ডিজিটাল আইডি কার্ড প্রদান করতে হবে। কৃষকদের আর্থিক সব ধরনের প্রণোদনা স্ব স্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রসঙ্গত, সরকার কৃষকদের জন্য সার, ডিজেল ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রদানের জন্য প্রতিবছর ৯০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। কোভিট-১৯ এর বিপর্যয় কাটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৫০০০ কোটি টাকার স্বল্প সুদে ঋণ প্রণোদনা প্রদান সহজলভ্য করে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে।

১৬। জাতীয় কৃষি তথ্যভা-ার তৈরি জরুরি। ফসলের সব ধরনের তথ্য যেমনÑ কোন ফসল কী পরিমাণে উৎপাদন হয়, দেশের চাহিদা, কোন দেশ থেকে কোন ফসল কী পরিমাণে আমদানি করতে হয়, কী পরিমাণে নষ্ট হয়, উৎপাদন সমস্যা ও করণীয়, কোন মাসে কোন ফসল ব্যবহার হয়, উৎপাদন খরচ, বাজার চাহিদা ও বাজার দাম ইত্যাদি তথ্য ডিজিটাল তথ্যভা-ারে থাকবে। সমৃদ্ধ তথ্যভা-ারের মাধ্যমে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা করে যে কোনো উ™ূ¢ত পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই অভিজ্ঞতাহীন অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে এক চরম যুদ্ধে নিপতিত। এ যুদ্ধে হারের পরিণতিই হবে দুর্ভিক্ষ এবং মানুষের মৃত্যু। উৎপাদনের নব-নব কৌশল ব্যবহার করতে হবে। অভিযোজনের নতুন অভিজ্ঞতায় আমাদের অভ্যস্ত হতে হবে এবং বিজয়ী হতে হবে

ড. মো. ছায়ফুল্লাহ : কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানী, বিএআরসি

advertisement