advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সাক্ষাৎকার জাফর রাজা চৌধুরী
‘গীতিকার সুরকার কণ্ঠশিল্পীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তাই স্ট্যান্ডার্ড নীতিমালা তৈরি করছি’

তারেক আনন্দ
৪ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুলাই ২০২০ ০৯:০১
advertisement

গত কয়েক দিন ধরে সংগীতাঙ্গন উত্তাল। গানের মানুষরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন। কথা উঠেছে সংগীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। এ প্রসঙ্গেই কথা হয় রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটস জাফর রাজা চৌধুরীর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-কপিরাইট বিষয়ে সংগীতাঙ্গনের বেশিরভাগ মানুষ ধোঁয়াশার মধ্যে আছেন। বিশাল এ সেক্টরে গান প্রকাশের আইন আছে, তেমন প্রয়োগ হচ্ছে না কেন?

প্রথমে গীতিকার গীত লিখেন। তার পর সুরকার যখন সুর ও সংগীতায়োজন করেন তখন এটা সংগীতে রূপান্তর হয়। এর পর কণ্ঠশিল্পী কণ্ঠ দেন। গানটিকে মার্কেটিং করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। গীতিকার গান লিখলেন, সুরকার সুর করলেন, কণ্ঠশিল্পী গেয়েও দিলেন। এখানেই তারা মনে করেন তাদের কাজ শেষ। এখন গান প্রকাশ হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আসাতে অনেকেই কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করতে আগ্রহী হচ্ছেন। আমি খেয়াল করেছি যারা মিউজিক পাবলিশার তারাই বেশি সচেতন। তারাই আসছেন কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করতে। কেউ রয়্যালটি নিয়ে ভাবছেন না। গান প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিচ্ছেন এককালীন অর্থের বিনিময়ে। আমার মনে হয় কপিরাইট করাটা গীতিকার, সুরকার, সংগীতশিল্পীদের মাঝে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করে। অসচেতনতা বা উদসীনতাÑ এ দুটোর কারণেই তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আইন থাকা সত্ত্বেও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো কপিরাইট আইন মেনে কি গান প্রকাশ করছে?

না, একদমই না।

এটার কারণ কী?

কারণটা হচ্ছে গীতিকার সুরকার কণ্ঠশিল্পীÑ তারা রয়্যালটি নিয়ে মাথা ঘামান না। গান যখন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিচ্ছেন তখন চুক্তিতে কী লেখা থাকে সেটা পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করে না।

কপিরাইট আইন মেনেই তো গান প্রকাশ করা উচিত। তাদের এ চুক্তিটা কতটা কার্যকর?

আইন তো আছে। আইনটা মানি কিনা, বাস্তবায়ন করি কিনা এটাই বড় কথা। উত্তর হচ্ছেÑ আমরা আইনটা যে প্রয়োগ করব, যার প্রপার্টি তাকে ক্লেইম করতে হবে। গানের মালিক হলো যার কাছে কপিরাইট সার্টিফিকেট আছে তার। যেমন শাকিব খানের ফিল্মের ব্যাপারে যদি বলি- কণ্ঠশিল্পী দিলরুবা খান ও সুরকার আশরাফ উদাস ‘পাগল মন’ গানের কপিরাইট করে নিয়েছেন। গানের মালিক তারা। ‘অনুপম’ ছবি কিনে নিয়েছে। এ গানটা ছবির গানও না। তার আগেই গানটি প্রকাশ হয়েছে। তোজাম্মেল হক বকুলকে শুধু ছবিতে গানটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন। এখানে অনুপমের গান বিক্রি করার রাইট নেই। ‘অনুপম’ থেকে আমাদের কাছে কপিরাইটের জন্য আবেদন করেছিল আমরা দিইনি। এ রকম অনেক কেস আসছে আমাদের কাছে। আর চুক্তির ব্যাপারে যদি বলি, মেধাস্বত্ব কখনো কিনে নেওয়া যায় না। সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে ব্যবহারের অনুমতি নিতে পারেন। গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন তাই স্ট্যান্ডার্ড নীতিমালা তৈরি করছি। আমি এটার জন্য কাজ করছি।

ক্যাসেট কিংবা সিডির গান প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইউটিউব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করছেন। এ প্রসঙ্গে একটু বলবেন।

ক্যাসেট/সিডির জন্য যদি চুক্তি করা হয়, তাহলে আমাদের আইন পরিস্কার অন্য কোনো মাধ্যমে গান প্রকাশ করতে পারবেন না। এজন্য গীতিকার সুরকার কণ্ঠশিল্পীর কাছ থেকে নতুন করে চুক্তি করতে হবে।

গত কয়েক দিন ধরে সংগীতাঙ্গন উত্তাল। কণ্ঠশিল্পীরা টিভিতে, স্টেজে সংগীত পরিবেশন করে আসছেন। এ আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গীতিকার, সুরকার। এখান থেকে কি গীতিকার, সুরকার ভাগ পেতে পারেন?

অবশ্যই পাবেন। ধরুন শিল্পী স্টেজে ১০টি গান পরিবেশন করেছেন। এখানে ১০ জন গীতিকার, সুরকার গানটি তৈরি করেছেন। এখন বিশ জনের কাছে তো ওই শিল্পী যেতে পারবেন না। সুতরাং প্রথমে শিল্পীর দায়িত্ব হবে একটি তালিকা করা। তিনি উল্লেখ করবেন আমি এই অনুষ্ঠানে অমুক অমুক সুরকার, গীতিকারের ১০টি গান পরিবেশন করব। এ ছাড়া শ্রোতাদের অনুরোধেও দুই-একটি গান পরিবেশন করতে পারি। গান পরিবেশনের পর গীতিকার, সুরকারের নামসহ কপিরাইট অফিসে তালিকা জমা দিতে হবে। শিল্পী যেহেতু ফিজিক্যালি গান পরিবেশন করেছেন তার জন্য ৮০%। গীতিকার সুরকার পাবেন ১০%। আপাতত আইনে আছে ১০ ভাগ। আমি মনে করি এটা আরও বেশি হওয়া উচিত। ২০ ভাগ করার চেষ্টা করব।

এবার আসি কাভারের ক্ষেত্রে। এ প্রজন্মের বেশিরভাগ শিল্পীই দেদার কাভার গান পরিবেশন করছেন। একটি গান জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্টেজ কিংবা টিভি লাইভে গেয়ে চলে আসছেন। মৌলিক গানের প্রতি তারা মনোযোগী নন। বলতে পারেন, কাভার গান করেই বেঁচে আছেন। কাভার গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে আইনে কি আছে?

গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পীর অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই কাভার গান পরিবেশন করতে পারবেন না, গাওয়ার সুযোগ নেই। যেসব গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী জীবিত আছেন তাদের গান তো গাওয়াই যাবে না। কপিরাইট ফেয়ার বলতে একটা কথা আছে। শুধু গাইতে পারবেন দেশের স্বার্থে বা সামাজিক দুর্যোগে- যেমন এখন ‘কোভিড-১৯’ মহামারী আকার ধারণ করছে। ফান্ড কালেকশনের জন্যই শুধু কাভার গান পরিবেশনের অনুমতি আছে। আপনি গাইতে পারবেন লালন সাঁইজি, হাছন রাজা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ শিল্পীর গান। কারণ তাদের গান এখন জাতীয় সম্পদ।

জনপ্রিয় কবিতা বা গান থেকে দুটি লাইন নিয়ে নতুন করে গান তৈরি হচ্ছে। এটা করার সুযোগ আছে?

কোনো অবস্থাতেই একটু কথা বা সুরও নেওয়া যাবে না। এটা হলো এক মণ দুধের মধ্যে ১ ফোঁটা চোনা মেশানোর মতো। কপিরাইট আইনে করা যাবে না।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সংগীতানুষ্ঠানের গান তাদের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করছেন। এটা কি তারা করতে পারেন?

এটা পুরোপুরি অনৈতিক। কোনোভাবেই করতে পারেন না। তাদের করার রাইট নেই। আইনত অপরাধ। সাংঘাতিক অন্যায়।

বেসরকারি টিভি, রেডিও বছরের পর বছর গান পরিবেশন করে আসছেন কোনো প্রকার রয়্যালটি ছাড়া। এ বিষয়ে কী বলবেন?

এটার একটা উপায় আছে। ধরুন বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে ৪৯টি পদে চাকরি করছেন অনেকে। এখানে টাইপিস্ট আছেন, একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আছেন। কেউ রেজিস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করছেন। এই ক্ষুদ্র সাংগঠনিক সক্ষমতা দিয়ে এ ধরনের বড় কোনো ভেঞ্চারে যাওয়ার সুযোগ নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন (সিএমও) বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। পাশের দেশ ভারতেও আছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা এনজিও টাইপের। তাদের কাজ হলো রেডিও, টেলিভিশন, ফাইভ স্টার হোটেল থেকে শুরু করে শপিং মল পর্যন্তÑ যেখানেই গান বাজবে সেখানে গিয়েই তারা বিল ধরিয়ে দেবে। আপনি আমি তো জানব না কোথায় গান বাজানো হচ্ছে। ক্রিয়েটরেরও জানার কথা নয়, হিসাব রাখারও উপায় নেই। সে কারণে সিএমও প্রতিষ্ঠান দরকার। তারা হঠাৎ হঠাৎ অভিযান চালাবে। ধরুন বড় কোনো মার্কেটে একটা গান এক সপ্তাহে এত বার প্লে করা হয়েছে। সপ্তাহে এতবার প্লে করার জন্য আপনার কাছে এই টাকা দাবি করলাম। দেশের ট্যাক্স ইন্সপেক্টরের কাছে আমরা যেমন ধরা, ওরাও সিএমও প্রতিষ্ঠানের কাছে ধরা। তারা পেমেন্ট করতে বাধ্য।

আমাদের দেশে কি এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে বা আইন আছে?

আইন আছে, প্রয়োগ হচ্ছে না।

আপনারা উদ্যোগ নিচ্ছেন না কেন?

২০১৪ সালে সাবিনা ইয়াসমিনকে প্রেসিডেন্ট ও আলাউদ্দিন আলীকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করে দেশের প্রায় তিন-সাড়ে তিনশ শিল্পী সিএমও ডেভেলপ করেছেন। এটার নাম হচ্ছে বাংলাদেশ লিরিসিস্ট কম্পোজার পারফরমার সোসাইটি (বিএলসিপিএস)। এর প্রধান নির্বাহী ছিলেন সুজিত মোস্তফা। তারা এটা করেছিলেন। এর পর কোনো কারণে আর এগোতে পারেননি।

এ ব্যাপারে আপনারা কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন?

সম্প্রতি বিএলসিপিএস একটা উদ্যোগ নিয়েছে। আমার সঙ্গেও কথা হয়েছে। ব্যারিস্টার ওলোরা আফরিনের সঙ্গে তারা এগ্রিমেন্টে যাচ্ছেন। ওলোরা আফরিনই অফিশিয়ালভাবে তাদের পক্ষ থেকে এই কাজটা শুরু করবেন। কারণ তারা তো আর্টিস্ট। তাদের পক্ষে আসলে এ ধরনের আইনকানুনের বিষয় নিয়ে পরিপূর্ণভাবে কাজ করা সম্ভব না। এ কারণে সিএমওটাকে কার্যকর করার জন্য তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাদের পক্ষ থেকে আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি সহায়তা দেওয়া হবে।

advertisement