advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনার প্রভাবে বিচার বিভাগ গতিহীন

বিচারাধীন প্রায় ৭ লাখ মামলা ॥ হতাশ বিচারপ্রার্থীরা

কবির হোসেন
৪ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩ জুলাই ২০২০ ২৩:২৪
advertisement

দেশের বিচার বিভাগের সার্বিক কর্মকা-ে করোনা ভাইরাসের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। করোনাকালে রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বিচার বিভাগ বলা চলে একেবারেই গতিহীন। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে আদালত চালু থাকলেও সেখানে শুধু জামিন আবেদনের শুনানি হচ্ছে। এ ছাড়া চেক ডিজঅনার মামলা, দেওয়ানি মামলায় ছোটখাটো আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। উচ্চ আদালতে চলছে জরুরি কিছু বিষয়ের শুনানি। তবে সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণে মামলার মূল যে বিচারকাজ তা প্রায় চার মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। স্থবিরতা মামলার তদন্ত কার্যক্রমেও।

এমনিতেই এ দেশের বিচার বিভাগ মামলার ভারে জর্জরিত। বর্তমানে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বিচারাধীন। একটি মামলার বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক-দুই যুগও পার হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর করোনার মতো মহামারীর হানায় এখন বিচারকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে বিচারপ্রার্থীরা দিশাহারা। সংকটে আইনজীবীরাও।

এ অবস্থা চলতে থাকলে বিচার বিভাগ এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। তাই বিচারকাজ শুরু করার জন্য উপায় বের করাসহ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণ জরুরি বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আইনজীবীদের একটি বড় অংশের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত আদালত চালুরও দাবি উঠেছে।

জানা গেছে, প্রতি বছরই মামলার জট বাড়ছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে

৩৫ লাখ ৭০ হাজার মামলা বিচারাধীন থাকলেও ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ লাখে। সুপ্রিমকোর্টের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মামলা ছিল ৩৬ লাখ ৪০ হাজার। ৩১ ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ ৬০ হাজারে। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ মামলা উচ্চ আদালতে। বাকিগুলো নিম্ন আদালতে। মামলা জটের এ ঊর্ধ্বগতি দেখে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক চলতি বছরের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমাদের এ বছর লক্ষ্য থাকবে ৫ থেকে ৬ লাখ মামলা কমানো। আমরা সেভাবে আদালতের লোকবল বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা/এডিআর) আরও জোরদার করা হবে।’ সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকেও মামলা নিষ্পত্তির নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিচারকাজে পূর্ণ কর্মঘণ্টা ব্যয় করাসহ নানা নির্দেশনা দেওয়া হয় অধস্তন আদালতের প্রতি। কিন্তু এসব নির্দেশনা ও পরিকল্পনা একেবারেই ভেস্তে দিয়েছে করোনা।

বিচার বন্ধ থাকায় অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ফেনীর চাঞ্চল্যকর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার মামলাটিতে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১৬ আসামির ডেথ রেফারেন্স অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির উদ্যোগ নেয় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। গত বছর ২৭ মার্চ ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক ঘটনার বিচার অধস্তন আদালতেও শেষ হয় মাত্র ৭ মাসে। এর পর সেটা গত বছরের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টে আসে আসামিদের মৃত্যুদ- অনুমোদনের জন্য। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ মামলাটির পেপারবুক তৈরি করে বিচারের জন্য গত ২ মার্চ হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠানো হয় মামলাটি। তবে তা সংশ্লিষ্ট আদালতে যাওয়ার পরপরই সুপ্রিমকোর্টে শুরু হয় অবকাশকালীন ছুটি। ২৯ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই হানা দেয় করোনা ভাইরাস।

গত বছরের অক্টোবরে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারা হয় বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ওই হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ছাত্রলীগের ২৫ নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করে আদালতে দেওয়া হয় চার্জশিট। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এপ্রিলে মামলার বিচার শুরু হওয়ার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু করোনার কারণে আলোচিত এ মামলার বিচার কার্যক্রম বন্ধ আছে। সিলেটের চাঞ্চল্যকর শিশু রাজন ও খুলনার রাকিব হত্যা এবং ক্যাসিনোকা-ে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে দায়ের মামলার বিচারও থেমে আছে। হত্যা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, ধর্ষণসহ এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার কবে শুরু ও শেষ হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না।

দেওয়ানি মামলায়ও বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘ হচ্ছে। এমনিতেই দেওয়ানি মামলার বিচারে বেশি সময় লাগে। শ্রমিকদের পাওনা সংক্রান্ত শ্রম আদালতও এখন বন্ধ রয়েছে। বিচারের মতো গতিহীন হয়ে পড়েছে মামলার তদন্ত কার্যক্রমও। এভাবে বিচার বিভাগের প্রতিটি ক্ষেত্রে করোনায় যে ক্ষতি হচ্ছে তা পুষিয়ে ওঠা বেশ কঠিন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিচার বন্ধ থাকা ও মামলা জট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এখন একটু অপেক্ষা করতে হবে। আগে তো জীবন রক্ষা। এমন পরিস্থিতি কেটে যাবে। বছরের পর বছর তো আর এ রকম পরিস্থিতি থাকবে না। আর এ রকম পরিস্থিতি থাকলে সে ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যেভাবে চলে সেভাবে চলতে হবে। মামলার জট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী মামলার পরিসংখ্যান ঠিকই আছে। জনসংখ্যা অনুপাতে মামলা হচ্ছে, তাই মামলা বাড়ছে। মামলা না হওয়ার অর্থ হলো গণতন্ত্র না থাকা। মামলা যেভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে এভাবেই হবে। অপরাধ করলেই তো সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফাঁসি দেওয়া যাবে না। ভালোভাবে বিচারের জন্য সময় লাগবেই।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি বিশেষ স্তম্ভ। বিচার বিভাগে যদি বিচার না থাকে তা হলে মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা সেদিকেই এগোচ্ছি। তিনি বলেন, বুঝতে পারছি না রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গ সংসদ, নির্বাহী বিভাগের সব প্রশাসনিক কর্মকা- চলছে। সেখানে বিচার বিভাগের হঠাৎ কী হলো যে শুধু ভার্চুয়াল আদালত দিয়েই চালাতে হবে। আমি মনে করি সব সময় প্রশাসন বিচার বিভাগের বিপক্ষে কাজ করে। তারা চায় না বিচার বিভাগ ভালোভাবে কাজ করুক। হয়তোবা প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগকে পঙ্গু করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। এর ফলে আমরা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি। আর এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সহজ হবে না।

করোনা সংক্রমণ এড়াতে গত মার্চ থেকে নিয়মিত আদালত বন্ধ রয়েছে। তবে এরই মধ্যে ভার্চুয়াল আদালত চালুর জন্য আদালতে তথ্য-প্রযুক্তি অধ্যাদেশ-২০২০ জারি করে সরকার। সে অনুযায়ী ১১ মে থেকে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ অনুযায়ী হাইকোর্টের প্রণীত প্র্যাকটিস ডাইরেকশন অনুসারে ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করা হয়। যেখানে শুধু জামিন শুনানির জন্য বিচারকদের নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। তখন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনা আইন একটি যুগান্তকারী আইন। সাক্ষ্য আইন সংশোধন হওয়ার পর এই অধ্যাদেশে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মামলার বিচার শুরু করা যাবে। তখন আমাদের নিম্ন আদালত এবং বিচারিক আদালত তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যম ব্যবহার করে ট্রায়াল, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক শুনতে পারবে এবং রায় প্রদান করতে পারবে।’ কিন্তু সাক্ষ্য আইন সংশোধন না হওয়ায় মামলার বিচার এখনো বন্ধ রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিচারের এ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে দেড়শ বছরের পুরনো সাক্ষ্য আইন যুগোপযোগী করার কাজ চলমান রয়েছে।

advertisement
Evaly
advertisement