advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বগুড়া-যশোর উপনির্বাচন
করোনা-বন্যা মাথায় নিয়ে ভোটে যাবে না বিএনপি

নজরুল ইসলাম
৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২০ ০৯:১০
advertisement

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গত শনিবারের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ১৪ জুলাই বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বগুড়ায় বন্যা দেখা দেওয়ায় এবং যশোরে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে না পারায় আসন্ন এ উপনির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি।

জানা গেছে, তৃণমূল নেতাদের মতামতের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। এ বিষয়ে আজ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এদিকে ইসির ভাষ্যÑ করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ১৮০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন দুটি করতে হচ্ছে বলে কমিশন এ সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কিন্তু বিএনপির মতে, নির্বাচন কমিশন তো সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যায় না। সে ক্ষেত্রে করোনা সংক্রমণ ও বন্যার মধ্যে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে হয়নি। আসলে সরকার চাইছেÑ এ নির্বাচনসহ নানা কর্মকা- করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত যদি সঠিক হয়, তা হলে সরকারের এসব সিদ্ধান্তে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

যশোর-৬ ও বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে অনীহা দেখা দিয়েছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বগুড়ায় বন্যা দেখা দেওয়ায় দুই আসনের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যশোর ও বগুড়ার নেতারা নিজ নিজ এলাকার প্রকৃত চিত্র এরই মধ্যে দলের হাইকমান্ডকে জানিয়েছেন। এ অবস্থায় গতকাল রবিবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তৃণমূলের মতামাতের সঙ্গে একমত পোষণ করে নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ভার্চুয়াল এ বৈঠকে লন্ডন থেকে যোগ দেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের ভাষ্যÑ করোনা পরিস্থিতির মধ্যে এর নির্বাচনে থাকাটা বিএনপির জন্য ঠিক হবে না। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছেÑ করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা। করোনার কারণে দেশের পুরো ব্যবসাবাণিজ্য স্থবির। এ অবস্থায় দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশ্ন, কোনটা জরুরিÑ জীবন নাকি নির্বাচন? এ ছাড়া বগুড়া-১ আসনে যেখানে উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। অনেক ভোটকেন্দ্র পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে অন্যান্য জেলার মতো যশোরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে করোনাসৃষ্ট পরিস্থিতিতে বগুড়া-১ ও যশোর-৬ উপনির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ (গতকাল) নিজ নিজ বাসা থেকে ভার্চুয়াল উপায়ে স্থায়ী কমিটির নেতারা এ বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে বর্জনের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ সোমবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

এর আগে গতকাল দুপুরে দলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বগুড়ার করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ও বন্যা পরিস্থিতি এবং যশোরের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জানিয়েছি। এখন আমরা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচন কমিশন তো সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যায় না। সে ক্ষেত্রে এ করোনা ও বন্যার মধ্যে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে হয়নি। আসলে সরকার চাইছে এ নির্বাচনসহ নানা কর্মকা- করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে। স্বাস্থ্য বিশেজ্ঞদের মতামত যদি সঠিক হয়, তা হলে সরকারের এসব সিদ্ধান্তে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে আমি মনে করি।

প্রসঙ্গত গত ১৮ জানুয়ারি সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের মৃত্যুতে বগুড়া-১ ও ২১ জানুয়ারি ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুতে যশোর-৬ আসন শূন্য হয়। বগুড়া-১ আসনে একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির ও যশোর-৬ আসনে আবুল হোসেন আজাদকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি।

সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিন এবং দৈব-দুর্বিপাকের কারণে সম্ভব না হলে আরও ৯০ দিনÑ সব মিলিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ২৯ মার্চ এই দুটি উপনির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। করোনা ভাইরাস সংকটের কারণে ভোটের সপ্তাহখানেক আগে স্থগিত করা হয় নির্বাচন। একই কারণে আটকে আছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনও।

গত শনিবার এ উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে বগুড়া ও যশোর বিএনপির নেতার করোনা ও বন্যার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। চলমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে না যাওয়ার মতামত কেন্দ্রীয় নেতাদের জানিয়েছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছেÑ এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু আশা করা মানে বোকার স্বর্গে বাস করা। এমনিতেই এ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি হতাশাজনক। তার মধ্যে বগুড়ায় করোনা পরিস্থিতির পাশাপাশি বন্যা। আর যশোরে ভয়াবহ রকমের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকা-১০ আসনের অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিই বড় প্রমাণ।

জানতে চাইলে বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা জিএম সিরাজ আমাদের সময়কে বলেন, যে কারণে ইসি উপনির্বাচন স্থগিত করেছিল, সেই করোনা পরিস্থিতি কি এখন স্বাভাবিক হয়েছে? এখন তো বিশেষজ্ঞরা বলছেনÑ দেশে এখন করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান করছে। আর বগুড়া এখন হটস্পট। আবার যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বগুড়া-১ আসনে (সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলা) বন্যা দেখা দিয়েছে। সেখানে আউশ ধান, পাট, আখসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতিও হয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্রও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা ঠিক হবে তা দলের হাইকমান্ডকে জানিয়েছি। এখন সিদ্ধান্ত দেবেন তারা।

জানতে চাইলে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর উপনির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আমাদের সময়কে বলেন, আমরা যশোরের করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার চিত্র দলের হাইকমান্ডে তুলে ধরেছি। এখন কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

বগুড়া-১ উপনির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির বলেন, ইসি সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। কিন্তু সংবিধানের জন্য মানুষ, না মানুষের জন্য সংবিধান। আমার আসনে একদিকে করোনার হটস্পট, অন্যদিকে বন্যা। ১৪-১৫ ভোটকেন্দ্র আছে, যা ৪-৫ ফুট পানির নিচে। কতগুলো আছে কেন্দ্রের ভেতরে পানি ঢুকেনি, কিন্তু আশপাশের রাস্তাঘাট পানির স্রোতে ভেঙে গেছে। এ ছাড়া এখানে করোনার যে পরিস্থিতি, ১০ জন মানুষও যদি আক্রান্ত হয়, এর দায়দায়িত্ব কে নেবে? আসলে ভোটাররা যাতে কেন্দ্রে না যায়, লুটপাট করার সুযোগ দিতে এ সময়ে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, আমার আসনের সার্বিক পরিস্থিতি দলের কেন্দ্রকে জানিয়েছি। দল সিদ্ধান্ত দেবে এখন। কেন্দ্রীয় বিএনপি যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নেব।

advertisement