advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনার সঙ্গে বসবাস

খান মাহবুব
৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২০ ০০:৪৩
advertisement

এই প্রথম বাঙালি আয়েশ করতে করতে হাঁপিয়ে গেল। এ রকম চিন্তাতীত আয়েশ শতবর্ষেও বাঙালির জীবনে আসেনি। জীবননাশী মরণব্যাধি করোনা এই দুর্যোগময় আয়েশ দিয়েছে বাঙালিকে। শুধু বাঙালি কেন, গোটা মানবকুল অদৃশ্য সংক্রমণ ভাইরাস কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নাকাল দশায় পতিত। চীনের উহান প্রদেশ অকুস্থল ছিল গত বছর ডিসেম্বরে, তার পর বিশ্বের উত্তর-দক্ষিণ দুই মেরুকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দাবিয়ে চলছে করোনা। মানুষকে প্রতিদিন অবজ্ঞা করে চালাচ্ছে কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রকোপ। কোভিড-১৯ ভাইরাস প্রতিদিন বিশ্বের সর্বত্র মানুষের প্রাণনাশ করছে। মানুষ শুধু দেখছে। করোনার সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই। কিন্তু নিয়ম, খাদ্যাভ্যাস, জীবনপ্রণালি দ্বারা করোনাকে প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। কোনো প্রতিষেধক নেই। সহসা কোনো লাগসই ওষুধ বা ভ্যাকসিনের সংবাদ পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। লকডাউন, কোরেন্টিন, সামাজিক কিংবা শারীরিক দূরত্ব নিয়ন্ত্রণ করে করোনাকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখলেও করোনা থেকে মুক্তির উপায় নেই।

করোনার দীর্ঘকালীন তা-বে বিশ্বব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে মানুষ বাধ্য। প্রথমদিকে করোনাকে নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন থাকলেও বর্তমানে বিশ্বকুল করোনাকে সঙ্গে নিয়ে অন্তত আরও এক-দুই বছর চলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুরাশার খবর হচ্ছে, করোনার সঙ্গে বসবাসের পরিসর আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বের প্রতিটি দেশের করোনা প্রতিরোধে নিজস্ব আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় জুতসই ব্যবস্থা গ্রহণ করাটা আশু করণীয়। শিক্ষণীয় হচ্ছে, যেসব দেশ শুরুতেই করোনার সুদূরপ্রসারী ভয়াবহতা উপলব্ধি করে জাতীয় পর্যায়ে শক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করেছে তারা করোনায় জীবনহানির মাত্রা কম রাখতে পেরেছে। এ তালিকায় দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকার নাম প্রণিধানযোগ্য। আর যারা একটু ঢিলেতালে ব্যবস্থা নিয়েছে, করোনা তাদের একহাত দেখিয়ে দিয়েছে। এ তালিকায় খোদ আমেরিকা-ইউরোপের ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, ব্রাজিল রয়েছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় কালচার হচ্ছে সবকিছুতে রাষ্ট্রযন্ত্র একটু পরে সরব হয়। করোনার ক্ষেত্রেও ইতালিফেরত প্রবাসী ভাইয়েরা করোনার জীবাণু দেশে প্রবেশ করানোর পর সরকার সরব হয়েছে। যদি মার্চের শুরুতে ইতালি এবং অন্যান্য দেশ থেকে ফেরত প্রবাসী ভাইদের হোম কোরেন্টিন নিশ্চিত করা যেত, তা হলে হয়তো বাংলাদেশের করোনাচিত্র অন্যরকম হতে পারত। বাংলাদেশে করোনার যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত অবস্থা তার চেয়ে বেশ খারাপ। মূলত যথার্থ পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় রোগ শনাক্ত হচ্ছে কম। ইদানীং উপসর্গ ছাড়াও করোনা ছড়াচ্ছে। যার ফলে শনাক্ত হওয়া ছাড়াও অনেকের মধ্যে করোনার জীবাণু থাকতে পারে বলে ধারণা। দেশের কোনো জেলাই করোনামুক্ত নয়। এমন অবস্থায় আমাদের করণীয় মূল প্রতিপাদ্য।

করোনা নিয়ে আমাদের দেশে এতদিন ভালো-মন্দ যাই হয়েছে, এখন যেহেতু বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এ কথা মান্য করা হচ্ছে, আরও কিছুকাল করোনার সঙ্গে বসবাস করতে হবে। তাই জাতীয়ভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

করোনায় জীবনের যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি জীবনের গতি বহমান রাখতে এখন অর্থনৈতিক কর্মকা-ও পরিচালনা অনিবার্য। ইতোমধ্যে সরকার করোনার অর্থনৈতিক ধকল কাটাতে বিভিন্ন মাত্রায় ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব প্যাকেজের আর্থিক আকার ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সরকারি প্রণোদনায় ১ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ সরাসরি সুবিধা পাবে। ইতোমধ্যে সরকারের অর্থ ও খাদ্যসহায়তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পেয়েছে প্রায় ছয় কোটি মানুষ।

জীবন ও জীবিকার পাশাপাশি যুদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। তবে সবকিছু ভেস্তে যাবে যদি এই বৈশ্বিক দুর্যোগেও সরকার চালচোর, ডালচোর, তেলচোরদের নিবৃত্ত করতে না পারে।

সরকার ২০২০-২১ বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ বাড়াচ্ছে প্রায় গত বছরের বাজেট থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। উল্লেখ্য, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৪৭ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া নগদ ঋণ খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে বরাদ্দ ২ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। কৃষিতে বরাদ্দ পূর্বতন বছর থেকে ৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। মোদ্দা কথা, সরকার করোনার মন্দা কাটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক শিরদাঁড়া সোজা করতে চিন্তার দিক থেকে সংকল্পবদ্ধ। সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়ন। কারণ সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতে সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী এখন বড়ই প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমাদের মজ্জাগত কিছু অভ্যস্ততা। আমরা কিছু অভ্যাসকে বহন করে জীবনকে যাপন করি। এখন করোনা থেকে সুরক্ষায় বেশ কিছু নির্দেশনা মানতে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর বিষয় হচ্ছে সামাজিক কিংবা শারীরিক দূরত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতি বর্গকিলোমিটারে পাঁচ-ছয় হাজার মানুষের বাস বাংলাদেশে। এখানে সামাজিক দূরত্ব কীভাবে রক্ষা সম্ভব। নিম্নমধ্যম আয়ের এই দেশের মানুষ দু-তিন মাস ঘরে বসে থাকলে কে খাদ্য ও আবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করবে। করোনার কারণে এ বছর মার্চ-এপ্রিলে ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে একজন সদস্য চাকরি হারিয়েছেন। দেশের সাত কোটি মানুষ নোভেল করোনা ভাইরাসে আর্থিক ও শারীরিক ঝুঁকিতে থাকলেও এদের খাদ্য ও অতিপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসে ১০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা প্রয়োজনÑ এই টাকার সংস্থান অর্থনীতির চাকা সচল না থাকলে কে সংস্থান করবে। ৬৬ দিন পর গত ৩১ মে অফিস-আদালত খুলেছে। সরকার কর্মস্থলে ১৩ দফা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলেছে। এখন যদি অর্থনীতি গতি না পায়, তবে শুধু করোনা নয়, আর্থিক বিপর্যয়েও মানুষ মরবে। এখন জাতীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন আগামী এক-দুই বছরের জন্য। এজন্য দেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ইতিবাচকভাবেই প্রয়োজন। এই পরিকল্পনায় হারা বা জেতাটা শুধু সরকারের একক কোনো বিষয় নয়, এটা পুরো জাতির।

করোনা বিশ্বব্যবস্থাকে নিজের মতো করে শাসন করছে। করোনা যেন প্রকৃতিকে গুছিয়ে নিচ্ছে নিজের মতো করে। বিশ্ববাসীও মানছে প্রকৃতির শাসন। এজন্য পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছেÑ প্রকৃতির জন্য সময় প্রয়োজন। মানব নিয়ন্ত্রিত দুনিয়ায় বায়ুম-লের ফুটো থেকে নদীর দূষণ সবই ছিল চলমান করোনার কারণে কার্যত বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে লকডাউনের ফলে নদীতে নাব্য এসেছে, সমুদ্র উপকূলে ডলফিন দেখা দিচ্ছে। দূষণকালে বায়ুম-লের ফুটোর মেরামত হয়েছে। প্রকৃতি কানে ধরিয়ে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, এতদিন প্রকৃতির ওপর যে অত্যাচার হয়েছে তা মানবে না তাই ঝড়, সাইক্লোন, ভূমিকম্প, এইডস ও করোনা দিয়ে মানবকুলকে নাস্তানাবুদ করেছে।

করোনা আমাদের শেখাচ্ছে পরিমিত ঘুম, ব্যায়াম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, করোনার মতো সংক্রমণ ব্যাধিতে সুনির্দিষ্ট ওষুধ না থাকলেও আমাদের সনাতনী ব্যবস্থার টোটকা চিকিৎসা কিছুটা হলেও ফল দিচ্ছে। এ ছাড়া জ্বর-ঠা-ার ওষুধ, প্লাজমা থেরাপিও ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। করোনা জানান দিচ্ছে, খাদ্যাভ্যাস সুষমকরণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ, জন্মনিয়ন্ত্রণ, রাসায়নিক দ্রব্য পরিহার, মাত্রাতিরিক্ত শিল্প উন্নয়ন রোধ ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণের।

করোনাকাল আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদল করে দিচ্ছে। এখন শিক্ষা হচ্ছে, জীবনকে প্রথম বাঁচাতে হবে এবং সঙ্গে জীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। করোনার সঙ্গে বসবাসে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের। আমাদের বিশ্বাস, অভ্যাস ও লোকাচারে পরিবর্তন অনিবার্য। করোনার ক্রান্তিকাল পরিক্রমণে আমাদের বেশকিছু সর্বজনীন উদ্যোগ জরুরি।

১. জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে আমাদের শারীরিক নিরাপত্তার দিকে অধিক নজর।

২. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি।

৩. স্বাস্থ্য খাতকে নির্ভার করা এবং স্বাস্থ্য খাতে গাইডলাইন তৈরি করে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। করোনার ক্রান্তিকালীন এক-দুই বছরের জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ।

৪. কৃষি খাতের ওপর অধিক জোর। কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ ও পণ্যের মূল্য নিশ্চিত করা।

৫. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানায় কর্মঘণ্টা কমিয়ে শিফট ব্যবস্থা কিংবা কর্মদিবস কমাতে হবে। পাঠদানের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। নাগরিকদের অধিক হারে স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা।

৬. করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমাদের বৈদেশিক শ্রমবাজার দখল করতে হবে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তিন কোটি লোকের কর্মসংস্থান করতে হবে।

৭. ঘরে বসে অফিসের কাজ, প্রয়োজনে ঘরে বসে বিদ্যালয়ের পাঠের ব্যবস্থা নিশ্চিত।

৮. বেকারত্বের জন্য স্কিম চালুর ব্যবস্থা। নয়া কর্মসংস্থান, পরিবেশবান্ধব শিল্প প্ল্যান্ট স্থাপন ও শেয়াবাজারে নতুন প্রডাক্ট আনতে হবে।

করোনার ক্রান্তিকাল অতিক্রমে আমরা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করি না কেন, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের মনোবল ও জাতীয় ঐক্য। করোনা থেকে উত্তরণে আমাদের ভেতর যে অসততা, কূপম-ূকতা ও হিংসা-বিদ্বেষ কাজ করে তার কবর রচনা করাও জরুরি। করোনার ক্রান্তিকাল একদিন প্রকৃতির নিয়মেই কেটে যাবে, কিন্তু আমাদের সেদিন নতুন প্রেক্ষাপটে সব কুপ্রবৃত্তিগুলো পরিহার করে জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে সততার শপথ নিয়ে বুক টান করে দাঁড়াতে হবে।

আজ প্রকৃতি নিয়ন্ত্রকের আসনে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে যেন আমাদের। তাই প্রকৃতির নিধন থেকে বাঁচতে হলে আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে আন্তরিকতা, সাম্য, ভরসা ও জাতীয় শিষ্টাচার দিয়ে।

খান মাহবুব : প্রাবন্ধিক ও খ-কালীন শিক্ষক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

advertisement
Evaly
advertisement