advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চলে গেলেন এন্ড্রু কিশোর
তার প্রতিটি গানই ইতিহাস

কনকচাঁপা
৭ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২০ ২২:৩৩
advertisement

আবহমান বাংলার পলিমাটির কোমল মায়াবী আবহাওয়া এবং প্রকৃতিতে আলহামদুলিল্লাহ অনেক কণ্ঠই ভেসে ভেসে আসে। আকাশ বাতাস কাঁদিয়ে সেসব কণ্ঠস্বরের সুরসুধা বাংলাদেশকে আমোদিত, বিমোহিত, আনন্দিত, আবেগাপ্লুত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত; কিন্তু বাংলাদেশের বিশাল এবং প্রধানতম বিনোদনের জায়গা সিনেমা হল। সেখানে যারা ছবি তৈরি করেন, ছবির জন্য ভালোবেসে টাকা ঢালেন, চিত্রকল্প লেখেন, অভিনয় করেন, গান করেন, হাসেন-কাঁদেন, তারা এবং তাদের জীবন, তাদের উপস্থাপন, তাদের শক্তিÑ সবকিছুই ‘লার্জার দেন লাইফ’ হয়ে থাকে এবং হতে হয়। সেই পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ৩৫ মিলিমিটারের জন্য ফুলস্কেপে পুরো স্ক্রিনে গান ভাসিয়ে দেওয়া ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ নামক শক্তির চেয়েও বেশি শক্তির অধিকারী হতে হয়। ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটু কঠিন হয়ে গেলো কি? আমি দুঃখিত এরচেয়ে সহজ করে আমি বোঝাতে পারছি না।

আমাদের দেশে কণ্ঠশিল্পী আছেন কতজন আর ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’র এযাবৎকালের ইতিহাসে রেগুলোর প্লেব্যাক সিংগার আছেন কজন?

প্লেব্যাক সিংগার আছেন হাতে গোনা কজন; কারণ অন্যান্য গান গাওয়া যায়, কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ৩৫ মিলিমিটারের জন্য গান গাওয়া খুব কঠিন।

হলে স্ক্রিন ভরে পুরো গান ছড়িয়ে গেলে সে গান হলের ভেতর সর্বজনীন হয়ে ওঠে। এই কঠিন কাজ পানির মতো সহজ করে সফলতার সঙ্গে উপস্থাপন করে নিজেকে বাঘের মতো শক্তিশালী হিসেবে যিনি পরিচিত করতে পেরেছেন, তিনি আমাদের কণ্ঠরাজ এন্ড্রু কিশোর।

আমি তার কণ্ঠকে বলি গলিত সোনা। সোনার চলমান ধারা। তার সঙ্গে পরিচয়ের আগেই আমি তার গান শুনি। ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে এএএএ। হেসে-খেলে, তাচ্ছিল্য ভরে কেউ দুঃখ কইতে পারেÑ এ কথা আমি আগে জানতামই না। দয়াল ডাকছে আমি মরে যাবোÑ এ গানতো বাংলাদেশিরা ফিচফিচ করে কেঁদে কেঁদে গায়! এতো দুঃখের অনুভূতি এমন হেসে-খেলে আসল ভাব বজায় রেখে গাইলেন আমাদের কিশোরদা। সেই থেকে শুরু। আমি আব্দুল আলীম থেকে একেবারে কিশোরদাতে স্থানান্তরিত হলাম। সে হয়তো ’৮০/’৮১-এর কথা।

এর পর ’৮৬ সালে জীবনসঙ্গী সুরকার সংগীত পরিচালক মইনুল ইসলাম খান সাহেবের ছবির গানের রেকর্ডে ওনাকে আমি সামনাসামনি দেখলাম; কিন্তু মনে হলো কতদিনের চেনা। হাতে একটা অফিসিয়াল ব্যাগ। সেখান থেকে কাগজ-কলম বের করে গান লিখে নিলেন! গান তোলার সময় কলমের হেড ঠোঁটের সঙ্গে কিপ করার মতো একটা ভঙ্গি করে গান তুলে নিলেন এক মুহূর্তেই। এর পর ইতিহাস! প্রতিটি গানই তার ইতিহাস। অথচ তিনি বলতেনÑ আমি তো আম জনতার শিল্পী। ভদ্রলোকরা আমার গান শোনেন?

কত গান যে গাইলাম তার সঙ্গে! পৃথিবীর সব কিছুই যেন তার নখদর্পণে; কিন্তু কোনো কিছুতেই তার কিছু আসে যায় না। জীবনে কোনো সমস্যাই তার কাছে সমস্যা নয়, এক মুহূর্তেই সমাধানও দিয়ে দেবেন চোখ বুঁজে! খুব আমুদে মানুষ; কিন্তু ভিষণ প্রফেশনাল কিশোরদা। এই শক্তিশালী মানুষটিকে আমি কাঁদতেও দেখেছি জনসমক্ষে। রাজশাহীতে তার ওস্তাদজির অসুস্থতায় আমরা কজন যখন বিনাপারিশ্রমিকে গাইতে গেছি, তখন তিনি মঞ্চে কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন! সে কান্না মঞ্চের পেছনেও শেষ হয় না। নীরবে নীরবে অনেক দান-ধ্যান করেন কিশোরদা; কিন্তু কাউকে টের পেতে দেন না!

আমাকে কিশোরদা অসম্ভব স্নেহ করেন, যার কোনো তুলনা হয় না। আমার রান্না তার খুব পছন্দ আর খেতে তিনি খুব ভালোবাসেন। আমার স্বামী তার বয়সে কিছু ছোট; কিন্তু এমন স্নেহভরা কণ্ঠে তিনি ‘ও মইনুল’ বলে ডাক দেন যে, আমার বুকটা ভরে ওঠে অসম্ভব ভালোলাগায়।

কিশোরদার সঙ্গে ছবিতে যেমন হাজার হাজার গান গেয়েছি তেমন শতশত মঞ্চেও গেয়েছি একসঙ্গে। খুবই মজার বিষয়Ñ কিশোরদা ভাবেন উনি মঞ্চের শিল্পী নন। একটু অস্বস্তিও তার টের পেয়েছি; কিন্তু ঘটনা হলোÑ তার সুন্দর মার্জিত ড্রেসআপে তিনি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘আমার সারা দেহ খেও গো মাটি ওওওওওও’ বলে টান দিতেন, তখন মনে হতো লম্বা একটা লোক অসম্ভব জাদুশক্তি-বলে একটানে লম্বা একটা তালগাছকে টেনে মট করে গোড়া উপড়ে ধরায় নামিয়ে আনলেন! এটা লিখতে গিয়েও আমার গায়ের রোম দাঁড়িয়ে গেল।

আমি আর কিশোরদা যখন একই বুথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্লেব্যাক করতাম, তখন আমাদের ভিষণ হেলদি একটা প্রতিযোগিতা চলতÑ কে কতটা ভালো গাইতে পারি। ফার্স্ট হওয়ার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও একজন আরেকজনকে খাতা দেখানোর মতো কা- করতাম। আমি হয়তো জিজ্ঞেস করলামÑ কিশোরদা এই জায়গাটা কেমনে কী? উনি হেসে দিয়ে বলতেনÑ তুমিই দেখাও। যেন আমি তার খাতা দেখে নিচ্ছি। অনেক সময় দেখা গেল গলা বসা। ঢকঢক গরম পানি চলছে, আমি তার জন্য চিন্তা করছি; কিন্তু গাইতে গিয়ে সেই গলিত সোনার প্রবাহ। আহা! আমাদের একজনই কিশোরদা, আমরা তার সুস্থতার আশায় পথ চেয়ে বসেছিলাম। আমাদের ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। আমি আবার কবে তাকে রান্না করে খাওয়াব!

advertisement
Evaly
advertisement