advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘রঙ্গিন’ মানুষের দম ফুরাল

তারেক আনন্দ
৭ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৭ জুলাই ২০২০ ০৮:২৫
সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোর। পুরোনো ছবি
advertisement

দীর্ঘ ১০ মাস ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে চিরতরে চলে গেলেন প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর। নিজ শহর রাজশাহীর মহিষবাথান এলাকায় বোনের বাড়িতে শেষ হলো তার জীবনের গল্প। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অসুস্থ অবস্থায় গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৮ সেপ্টেম্বর তার শরীরে নন-হজকিন লিম্ফোমা নামক ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক লিম সুন থাইয়ের অধীনে তার চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসারত অবস্থায়ই দেশে ফিরতে চেয়েছেন। বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশে গিয়ে মরতে চাই, এখানে নয়।’ ১১ জুন বিকালে সিঙ্গাপুর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে দেশে ফেরেন। ফিরে যান রাজশাহীতে। যেখান থেকে শুরু, সেখানেই নিলেন শেষনিঃশ্বাস। তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।

জনপ্রিয় এই কণ্ঠশিল্পীর মৃত্যুতে সংগীতাঙ্গন, চলচ্চিত্রাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, এন্ড্রু কিশোর তার গানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এন্ড্রু কিশোরের বোনজামাই ডা. প্যাট্টিক বিপুল বিশ্বাস জানিয়েছেন, বর্তমানে শিল্পীর মরদেহ রাজশাহীর একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আগামীকাল (আজ) সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে তার মায়ের পাশে সমাহিত করা হবে। মৃত্যুর আগে এন্ড্রু কিশোর নিজেই বলে গেছেনÑ তাকে যেন মায়ের পাশেই সমাহিত করা হয়। সেই ইচ্ছায়ই মায়ের পাশে তাকে সমাহিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে কখন, এটা এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঠিক হয়নি।

এন্ড্রু কিশোর ১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন রাজশাহীতে। স্ত্রী ইতি কিশোর ছাড়াও শিল্পীর ছেলে জে এন্ড্রু সপ্তক এবং মেয়ে মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। তারা দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন। টিকিট মিললেই ফিরবেন বাংলাদেশে। ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’Ñ কিছু দিন আগে হুইলচেয়ারে চেপে মঞ্চে উঠে এই গানটি শুনিয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর। গাইবার সময় তিনি নিজে কেঁদেছিলেন, কাঁদিয়েছেন শ্রোতাদের। বাংলাদেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্রজগতের কালজয়ী অনেক গান তার কণ্ঠে সমৃদ্ধ হয়েছে। সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ, প্রেম-বিরহÑ সব অনুভূতির গানই তিনি গেয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এন্ড্রু কিশোর প্রাথমিকভাবে আবদুল আজিজ বাচ্চুর অধীনে সংগীতের পাঠ শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর কিশোর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোক, দেশাত্মবোধকসহ প্রায় সব ধারার গানে রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত হন। চলচ্চিত্রে এন্ড্রু কিশোর গান গাওয়া শুরু করেন ১৯৭৭ সালে। ছবির নাম ‘মেইল ট্রেন’। পরিচালক শিবলী সাদিক। এই ছবিতে তিনি গেয়েছিলেন ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানটি। চলচ্চিত্রে এটাই ছিল তার প্রথম গান। সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। তার রেকর্ডকৃত দ্বিতীয় গান বাদল রহমান পরিচালিত ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ চলচ্চিত্রের ‘ধুম ধাড়াক্কা’। তবে এ জে মিন্টু পরিচালিত ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রতিজ্ঞা’ চলচ্চিত্রের ‘এক চোর যায় চলে’ গাওয়া গান প্রথম জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ গানটি দিয়ে তিনি আলোড়ন তোলেন। মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা গানটির সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। দীর্ঘদিন পুরোদস্তুর পেশাদার কণ্ঠশিল্পী হিসেবে দুই বাংলায় গান গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর।

গেল বছরের সেপ্টম্বর মাসে অসুস্থ হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এন্ড্রু কিশোর প্লেব্যাক ও স্টেজ শো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। আলম খানের সুর-সংগীতে গেয়েছেন প্রয়াত সব্যসাচী লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা শেষ তিনটি গান। এন্ড্রু কিশোর দেশের প্রখ্যাত সুরকারদের মধ্যে বেশি গান করেছেন আলম খান, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গে। এ ছাড়া গান করেছেন শেখ সাদী খান, ইমন সাহা, আলী আকরাম শুভসহ অনেকের সঙ্গে। ভারতের প্রখ্যাত সুরকার আর ডি বর্মনের সুরেও গান গেয়েছেন। দেশের গ-ি পেরিয়ে কলকাতাতেও প্লেব্যাকে বেশ কয়েকটি গান করেছেন। মাঝে কিছুদিন ব্যবসাও করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে এন্ড্রু কিশোর আহমাদ ইউসুফ, আনোয়ার হোসেন বুলু, ডলি জহুর প্রমুখের সঙ্গে টিভি নাটক, বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য প্রযোজনার জন্য ‘প্রবাহ’ নামে একটি বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান শুরু করেন।

এন্ড্রু কিশোরের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছেÑ ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘হায় রে মানুষ রঙ্গিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’, ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’, ‘তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’, ‘তুমি আমার কত চেনা’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়’, ‘এইখানে দুইজনে নির্জনে’সহ অনেক গান। জীবনের বেশির ভাগ সময় মূলত চলচ্চিত্রে গান করেই কাটিয়েছেন। চলচ্চিত্রের গান নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, অডিওর বাজারে খুব একটা অ্যালবাম করেননি। চলচ্চিত্রের বাইরে এসে প্রথম দিকে তিনি ইত্যাদিতে গান করেন ‘পদ্মপাতার পানি নয়’, যা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার ইত্যাদিতে এসেছেন।

advertisement
Evaly
advertisement