advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

৩২ মামলার আসামি রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ

৫ হাজার ৭৩৬টি করোনা সনদ দেওয়া হয়েছে পরীক্ষা ছাড়া ॥ ১৭ জনের বিরুদ্ধে র‌্যাবের মামলা সিলগালা হাসপাতাল

হাবিব রহমান
৮ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২০ ০২:০৯
advertisement

১০ হাজার রোগীর করোনা টেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে রিজেস্ট হাসপাতাল। মাত্র ৪ হাজার ২৬৪টি নমুনা সরকারিভাবে টেস্ট করে রিপোর্ট দেয়। বাকি ৫ হাজার ৭৩৬টি পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট প্রদান করা হয়। এ ক্ষেত্রে ভয়াবহ প্রতারণার কৌশল গ্রহণ করে রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কারও জ্বর থাকলে তাকে পজিটিভ আর জ্বর না থাকলে নেগেটিভ রিপোর্ট প্রদান করা হয়েছে। অভিযানের পর সব জানাজানি হলে রিজেন্ট থেকে পরীক্ষা করানো অনেকেই র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, তাদের রিপোর্ট ঠিক নাকি ভুল সেটি জানার জন্য। এ ছাড়া হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটারের ভেতর চলত রান্নাবান্নার কাজ। ফ্রিজভর্তি ছিল মাছ। র‌্যাবের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন সব ভয়ঙ্কর অপরাধের তথ্য। রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদের নামে বিভিন্ন থানায় ৩২টি মামলা রয়েছে।

গতকাল রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার নামে প্রতারণাসহ নানা অভিযোগে সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেছে র‌্যাব। পলাতক সাহেদকে ধরতে এরই মধ্যে র‌্যাবের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। সাহেদ যাতে কোনো অবস্থায় দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সে জন্য নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম তার সাহেদ করিম। বর্তমানে ব্যবহার করতেন

মো. সাহেদ নাম। সাতক্ষীরা জেলার এক নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান প্রতারণাসহ নানা অপরাধ কর্মকা-ের মাধ্যমে এখন শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। নিজেকে কখনো সেনা কর্মকর্তা মেজর সাহেদ, কখনো প্রশাসানের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করতেন।

র‌্যাব জানায়, রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তি অনুযায়ী, বিানমূল্যে করোনা টেস্ট ও চিকিৎসা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১০ হাজার টেস্টের বিপরীতে রিজেন্ট প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া ভর্তি রোগীপ্রতি এক লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ বিল করেছে। আবার শুধু জুন মাসে সরকারের কাছে চিকিৎসা বিল বাবদ পাঠানো হয় এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার হিসাব। সব পক্ষর কাছ থেকেই বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রিজেন্ট। অথচ গত চার মাস হাসপাতালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করলেও কর্মীদের লোকসান দেখিয়ে বেতন দেননি সাহেদ। সাহেদের অবৈধ টাকার খোঁজেও নেমেছে সংশ্লিষ্টরা।

র‌্যাবের অভিযানের খবর টের পেয়ে ধূর্ত সাহেদ তাৎক্ষণিকভাবে তিনজন কর্মীকে প্যাডে পূর্ববর্তী তারিখ বসিয়ে বরখাস্ত করেন। তাদের হাজিরা খাতায় উপস্থিতি ফ্লুয়েড দিয়ে মুছে দেন। কিন্তু র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বরখাস্ত হওয়া কর্মীদের গিয়ে হাসপাতালে দেখতে পায়। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাদের প্রতিদিন অফিস করার দৃশ্য ধড়া পড়ে।

২০১১ সালে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডে এমএলএম কোম্পানি বিডিএসের ব্যবসার নামে সাধারণ মানুষের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন সাহেদ। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তিনি নিজেকে মেজর ইফতেখার করিম পরিচয় দিতেন।

সূত্র জানায়, সাহেদ নিজেকে সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চের পরিচালক পরিচয় দিতেন। তিনি বললেন, এটি পরিচালিত হয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় থেকে। এসব বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের পর্যন্ত হুমকি দিতে পিছু হটতেন না সাহেদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাহেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পেতেন অনেক রাঘববোয়াল। এ ছাড়া তার মামালার তদন্ত ধামাচাপা দিয়ে অন্তত তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। এর আগেও ডেঙ্গু কা-ে রিজেন্ট হাসপাতাল ভয়াবহ অনিয়ম করে। সেটির তদন্ত করতে গেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তাকে আটকে রাখেন সাহেদ। অস্ত্রের মুখে তাদের ফিরে যেতে বাধ্য করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেননি তিনি। কিন্তু তার দাপটে বিষয়টির সুরাহা করতে পারেনি ব্যাংকগুলো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম আমাদের সময়কে বলেন, ‘ইতোমধ্যে এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি আমরা। এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে কেউ পার পাবে না।’

এদিকে গতকাল বিকালে রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। তিনি বলেন, রিজেন্ট হাসপাতালটি করোনা টেস্টের স্যাম্পল সংগ্রহ করত; কিন্তু কোনো টেস্ট করত না। মনগড়া রিপোর্ট দিত। এ ছাড়াও হাসপাতালের আইসিইউ অত্যন্ত নিম্নমানের এবং তাদের হাসপাতাল ল্যাবের ফ্রিজে মাছভর্তি। হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমরা এটি সিলগালা করেছি।

অপরদিকে এসব অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রিজেন্ট হাসপাতালের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার রাজধানীর উত্তরার কোভিড ডেডিকেটেড রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযান পরিচালনাকালে উঠে আসে রিজেন্ট হাসপাতালের অনিয়মের ভয়াবহ সব তথ্য। এ সময় হাসপাতাল থেকে ৮ জনকে আটক করে নিয়ে যায় র‌্যাব।

advertisement
Evaly
advertisement