advertisement
advertisement

টিকা তৈরির দৌড়ে শেষ পর্যায়ে ৩ কোম্পানি

লক্ষ্য এ বছরই বাজারে আনা

সুমন মজুমদার
৮ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২০ ০৯:৪৩
advertisement

বিশে^ করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এরই মধ্যে ১ কোটি ১৭ লাখ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ছুঁই-ছুঁই করছে সাড়ে ৫ লাখের কোঠা। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে বিশে^র প্রায় প্রতিটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে একটি ঘোষণার। সেটি হলো- করোনার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা তৈরি। এখনো এই ঘোষণা না এলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বড় ২৩টির বেশি ওষুধ কোম্পানির বিজ্ঞানীরা এখন নিবিড় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। টিকা তৈরির এই দৌড়ে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশও।

যদিও অধিকাংশ কোম্পানিই এখনো এই টিকা পরীক্ষার প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে আছে। শুধু এই দৌড়ে অনেকখানি এগিয়ে গেছে ৪ কোম্পানি। চলতি জুলাইয়ের শেষ দিকেই করোনার টিকা পরীক্ষার তৃতীয় বা শেষ ধাপ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে তারা। কোম্পানিগুলো হলো- চীনের সিনোভ্যাক বায়োটেক ও চায়না ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রুপ (সিনোফার্ম), যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সহায়তায় ব্রিটিশ-সুইডিস যৌথ উদ্যোগের কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং মার্কিন কোম্পানি মর্ডানা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স, লাইভ মিন্ট, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, গত সোমবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিজেদের উদ্ভাবিত করোনার টিকার শেষ ধাপের পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা দিয়েছে চীনের সিনোভ্যাক। বিবৃতিতে কোম্পানিটি জানায়, ব্রাজিলে মানুষের ওপর টিকাটির পরীক্ষা চালাতে গত সপ্তাহে দেশটির সরকারের অনুমোদন পেয়েছে তারা। ব্রাজিলীয় ওষুধ প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউটো বুটানটানের সঙ্গে মিলে তারা এই পরীক্ষা চালাবে। ইতোমধ্যে এর জন্য ব্রাজিলের বিভিন্ন কোভিড-১৯ বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কাজের জন্য প্রায় ৯ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যারা চলতি মাসেই কাজ শুরু করবেন।

আনাদোলু এজেন্সি জানায়, চীনের রাষ্ট্রীয় ওষুধ প্রতিষ্ঠান সিনোফার্মও ঘোষণা দিয়েছেÑ করোনার টিকা তৈরিতে তারা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে। আগস্টেই তারা উদ্ভাবিত করোনার টিকা পরীক্ষার তৃতীয় বা শেষ ধাপ শুরু করবে। এরই মধ্যে করোনার উৎপত্তিস্থল দেশটির হুবেইপ্রদেশের উহান শহরে এই টিকা উৎপাদনে বিশাল গবেষণাগার তৈরি করা হয়েছে। সেইসঙ্গে রাজধানী বেইজিংয়েও প্রতিষ্ঠানটির গবেষণাগারে চলছে নিবিড় গবেষণা। তাদের লক্ষ্য চলতি বছরের মধ্যেই অন্তত ১০ কোটি টিকা বাজারে আনা।

অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সহায়তায় বিখ্যাত ওষুধ প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকাও তাদের তৈরি করোনার টিকা পরীক্ষার শেষ ধাপে আছে। তৃতীয় পর্যায়ের এই ট্রায়ালে ৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের ওপর এই টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে করোনার বিরুদ্ধে তাদের টিকা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হচ্ছে বলে দাবি করেছেন অক্সফোর্ডের গবেষক দলের প্রধান ড. সারা গিলবার্ট।

মার্কিন বায়োটেক প্রতিষ্ঠান মর্ডানাও জানিয়েছে, তারা করোনার টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চলতি মাসে শুরু করবে। পরীক্ষার অংশ হিসেবে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করা হবে। শেষ ধাপের পরীক্ষায় টিকাটির প্রতি ডোজের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। পরীক্ষায় উতরে গেলে এই মাত্রার ডোজের হিসাবে বছরে ৫০ কোটি টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কোম্পানি নোভাভ্যাক্সকে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১০ কোটি ডোজ করোনার টিকা উৎপাদনে পরীক্ষা ও বিপণনে ১.৬ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে মার্কিন সরকার।

এদিকে ভারতের শীর্ষ চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) এ বছরের ১৫ অগাস্টের মধ্যে করোনা ভাইরাসের টিকা বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। আইসিএমআরের সঙ্গে মিলে এই টিকা তৈরি করছে হায়দরাবাদভিত্তিক বায়ো থেরাপিউটিকস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ভারত বায়োটেক’, যারা গত সপ্তাহে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন পেয়েছে। দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছেÑ এরইমধ্যে সাড়ে তিনশর বেশি মানুষের ওপর ‘কোভ্যাক্সিন’ নামে এই সম্ভাব্য টিকার পরীক্ষা হয়েছে; কিন্তু পরীক্ষার আরও দুটি ধাপ পেরিয়ে কীভাবে ভারত এত তাড়াতাড়ি টিকা বাজারে আনবে তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিবিসি জানায়, কোনো একটি টিকার পরীক্ষার প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ সাধারণত এর নিরাপত্তার মাত্রা পরীক্ষা করে। তৃতীয় ধাপে পরীক্ষা করা হয় টিকার কার্যকারিতা। এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ শেষ করতে কয়েক মাস, এমনকি অনেক সময় কয়েক বছরও লেগে যায়; কিন্তু ভারত কীভাবে এসব ধাপ এত তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করবে তা বোধগম্য নয়। মহারাষ্ট্র রাজ্যের করোনা টাস্কফোর্সের সদস্য ড. শশাঙ্ক জোশি বলেন, ‘এত অল্প সময়ে একটি টিকা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। টিকা তৈরি করতে সাধারণত দুই বছর সময় লাগে। আপনি যদি ফাস্ট ট্র্যাক পদ্ধতিতেও তৈরি করতে চান, তবু ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগবে। এর আগে টিকা তৈরি করা অসম্ভব।’

বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে করোনার সম্ভাব্য টিকা তৈরির ঘোষণা দিয়েছে শীর্ষ ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠার গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এনসিবিআই ভাইরাস ডাটাবেজে ৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী করোনার ৫৭৪৩টি সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স জমা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে জমা হয়েছে ৭৬টি। এসব সিকোয়েন্স বায়োইনফরম্যাটিক্স টুলের মাধ্যমে পরীক্ষা করে গ্লোব বায়োটেক তাদের টিকার টার্গেট নিশ্চিত করে। টার্গেটের সম্পূর্ণ কোডিং সিকোয়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের এনসিবিআই ভাইরাস ডাটাবেজে জমা দেওয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে এনসিবিআই তার স্বীকৃতি দিয়ে প্রকাশও করেছে। গ্লোব কর্তৃপক্ষ আশা করছে, তাদের টিকা যৌক্তিকভাবে এই ভৌগোলিক অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হবে। কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার না হলে আগামী ডিসেম্বরে টিকাটি বাজারে আনতে পারবে তারা। প্রথম ধাপে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টিকা উৎপাদন করবে দেশীয় এ প্রতিষ্ঠানটি।

করোনার টিকা উদ্ভাবন নিয়ে গত সোমবার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান বিজ্ঞানী সৌমায়া স্বামীনাথন। তিনি জানান, আগামী বছরের শুরুতেই করোনার বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরাপদ একটি টিকা দেখার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। এই টিকা সব দেশের মধ্যে কীভাবে সুষ্ঠু উপায়ে বিতরণ করা যায়, তার পদ্ধতি নিয়ে ডব্লিউএইচও আলোচনা করছে।

advertisement
Evaly
advertisement