advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নয়াচীন দেখেও তিনি বাংলার মানুষের মুক্তির দিশা খুঁজেছেন

ড. আতিউর রহমান
৮ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২০ ০২:৩৫
advertisement

কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে পিকিংয়ে শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করে নয়াচীন। ৩৭টি দেশের প্রতিনিধি এখানে যোগদান করেন। পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানও আমন্ত্রণ পান। তার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আরও যোগদান করেন পূর্ববাংলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আতাউর রহমান খান, ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস এবং উর্দু কবি ইউসুফ হাসান। তারা কমিউনিস্টঘেঁষা বলে মুসলিম লীগের সমর্থকরা প্রচার চালায়। তবে শেখ মুজিব তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন শান্তির জন্য যে কোনো আমন্ত্রণেই তিনি অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে কারাগারে বসে শেখ মুজিবুর রহমান চীন ভ্রমণের কথা লেখেন। ২০২০ সালে একুশে বইমেলায় বইটি ‘আমার দেখা নয়াচীন’ নামে প্রকাশিত হয়। প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। এটি শেখ মুজিবুর রহমানের তৃতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ। এটুকু তথ্য অনেকেই জানেন। বইটি ইতোমধ্যে অনেকেই পাঠ করেছেন। বইমেলার মধ্যেই বইটি প্রচুর পাঠপ্রিয়তা পায়। বঙ্গবন্ধুর অন্য দুটো বই থেকে এ বইটি একটু ব্যতিক্রম। এটি নিছক ভ্রমণকাহিনি নয়। একটি পরিবর্তনবাদী দেশ আবিষ্কারের গল্প। তার সঙ্গে নিজের দেশকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা। ভবিষ্যতে এ রকম একটি দেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন। বইটি বেশ সরস ভঙ্গিতে রচিত হলেও দার্শনিক প্রজ্ঞায় সমুজ্জ্বল। বইটির ভূমিকা শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘এই ভ্রমণকাহিনি যতবার পড়েছি আমার ততবারই মনে হয়েছে যে তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে। তার কারণ হলো তার ভেতরে যে সুুপ্ত বাসনা ছিল বাংলার মানুষের মুক্তির আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জন সেটাই বারবার ফুটে উঠেছে আমার মনে, এ কথাটাও অনুভব করেছি।’

চীন যেতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানদের প্রথমেই পাসপোর্ট জটিলতায় পড়তে হয়। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের পাসপোর্টও তখন করাচি থেকে ইস্যু করা হতো। এ কারণেই সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাসপোর্ট সিস্টেমের সমালোচনা করেছেন। অনেক ভোগান্তির পর শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রতিনিধিদলের অন্যরা পাসপোর্ট হাতে পেলেন প্লেন ছাড়ার ২৪ ঘণ্টা আগে। তাও প্লেন ছাড়তে দেরি হওয়ার কারণে। রেঙ্গুন, হংকং হয়ে তারা চীনে যান। যাত্রাবিরতির কারণে কিছুটা সময় তারা রেঙ্গুন এবং হংকং অবস্থান করেন। একটা বিকাল আর রাত থাকার সুযোগ পেয়ে তিনি দ্রুত রেঙ্গুন শহরের খবর নিতে শুরু করলেন। পরে লিখেছেন, “যতদূর খবর নিয়ে জানলাম, ব্রহ্মদেশের অবস্থা খুবই খারাপ। বিপ্লবীরা বহু স্থান দখল করে আছে, আর মাঝে মাঝেই রেঙ্গুন শহরের পানি বন্ধ করে দেয়। আর একটা ভয়াবহ খবর পেলাম, ‘ব্যান্ডিট’রা দিনদুপুরে ডাকাতি করে। ভয়েতে দিনের বেলায় কেউ জানাশোনা মানুষ না হলে দরজা খোলে না।” (পৃষ্ঠা-২২)

এই যে তার তৎপরতা ও খবর নেওয়ার উৎসাহ এটাই তার গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয়। হংকং দেখে তিনি লিখেছেন, ‘আমি লেখক নই, আমার ভাষা নেই, তাই সৌন্দর্যটা অনুভব করতে পারছি, কিন্তু গোছাইয়া লিখতে পারি না। পাঠকরা আমায় ক্ষমা করবেন।’ (পৃষ্ঠা-২৫)

নিজেকে লেখক হিসেবে দাবি না করার মাধ্যমেই তিনি তার বিনয়ী মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত লোক-গবেষক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ‘বঙ্গবন্ধুর নান্দনিক ভাবনা’ বিষয়ক আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু যদি শুধু লেখকই হতেন তা হলেও জনপ্রিয় লেখক হতেন। তার লেখার হাত পেশাদারি লেখকের মতোই। দুঃখের বিষয় তিনি আরও বেশি লিখলেন না।’

বঙ্গবন্ধু যে বড় মাপের লেখক ছিলেন তার পরিচয় আমরা পাই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বই তিনটি পড়ে। এমন ঝরঝরে ভাষায় তথ্যবহুল তিনটি উপহার দিয়েছেন বলেই এক বহুমাত্রিক বঙ্গবন্ধুর সন্ধান পাই আমরা। চীনে যখন তিনি প্রথম যান তখন তার বয়স ৩২। একজন তরুণ নেতা নতুন দেশে গেছেন, সেই দেশ সম্পর্কে কিছু খোঁজখবর নেবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কতদূর বিস্তৃত হতে পারে সেই অন্বেষণ? একজন পেশাদারি লেখকের মতোই তিনি নতুন দেশটিতে পা রেখেই তার সম্পর্কে গবেষণা শুরু করলেন। নয়াচীনের শিক্ষাপদ্ধতি, চিকিৎসাব্যবস্থা, শ্রমিকদের অবস্থা, নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা, কৃষি, শিল্প সবকিছু সম্পর্কেই তিনি খবরাখবর নিতে শুরু করলেন। সাধারণ মানুষের মনের অবস্থা জানার তার নিরন্তর প্রচেষ্টা দেখে সত্যি অবাক হতে হয়।

নয়াচীনের হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় দেখার অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন, “আমি হাসপাতাল দেখতে গেলাম। স্বাস্থ্যসেবা, খাবার এর মধ্যেই যথেষ্ট উন্নতি করেছে। আমাদের বলল, রোগ অনেক কমে গিয়েছে। আমরা রোগ হওয়ার পরে চিকিৎসার চেয়ে রোগ যাতে না হয় তার দিকেই নজর বেশি দিয়েছি। প্রত্যেক বছরই রোগীর হিসাব নিই। তাতে দেখা যায় আস্তে আস্তে রোগ কমে আসছে। পেটে খাবার পড়েছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকেÑ রোগ হবে কেন? হাসপাতালটা আধুনিক ধরনের এবং যথেষ্ট উন্নতমানের যন্ত্রপাতি আছে।

সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশের মতো কেরানি পয়দা করার শিক্ষাব্যবস্থা আর নেই। কৃষি শিক্ষা, শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনিক্যাল শিক্ষা দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সেখানে আমার সঙ্গে আলাপ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মি. হালিমের। তার একটা চীনা নামও আছে, সেটা আমার মনে নেই। ভদ্রলোক ইংরেজি জানেন। তার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা আলাপ হলো। তিনি আমাকে বললেন, বাধ্যতামূলক ফ্রি শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করেছি। প্রত্যেক ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিতে হয়। সরকার তাদের যাবতীয় খরচ বহন করে। কৃষকদের জন্য কৃষি স্কুল করা হয়েছে। আমাকে একটা কৃষি স্কুল দেখানো হয়েছিল। সেখানে যুব কৃষকদের কিছুদিনের জন্য শিক্ষা দিয়ে খামার জমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শ্রমিকদের জন্য স্কুল করা হয়েছে। প্রত্যেক শিল্পকেন্দ্রের কাছে স্কুল আছে। বড়দের শিক্ষা দেওয়া হয় কাজের ফাঁকে, আর তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য আলাদা বন্দোবস্ত আছে। সব দিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, মাত্র চার বছরে তারা শতকরা ৩০ জন লোককে লেখাপড়া শিখিয়ে ফেলেছে। গর্ব করে আমাকে আবার বলল, ১০ বছর পর যদি চীনে আসেন দেখবেন একটা অশিক্ষিত লোকও নেই।” (পৃষ্ঠা ৫৯-৬০)

নয়াচীনের মানুষ কতখানি সৎ তা দেখার জন্য একদিন তিনি এক রিকশাওয়ালাকে ১০ টাকা পরিমাণ ভাড়া তুলে দিলেন। রিকশাওয়ালা ইংরেজি জানেন না, শেখ মুজিবুর রহমানও চীনা ভাষা জানেন না। রিকশাওয়ালা কত নেয় তাই তার দেখার ইচ্ছা। রিকশাওয়ালা তার হাত থেকে ঠিক আট আনা পয়সা গুনে নিয়ে চলে গেল।

নয়াচীনের আরেকটা জিনিস তার ভালো লেগেছিল। সেখানে কোনো বিদেশি জিনিস নেই। ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এ তিনি লিখেছেন, “পিকিং, তিয়ানজিং, নানকিং, ক্যান্টন, হ্যাংচো শহরে ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও একটা বিদেশি জিনিস দেখিনি। কাপড়, জুতা, সাইকেল, ঘড়ি, কলম, ¯েœা, পাউডার, পুতুল, যা কিছু মানুষের প্রয়োজন কিছুই বিদেশ থেকে আনা হয় না এবং দেখলামও না। [... ] দেশে বসে শুনতাম, চীন দেশ রাশিয়ার হুকুমে চলে। তবে রাশিয়ার কোনো ‘ব্যবহারী দ্রব্য’ ইংরেজিতে ‘কনজুমার গুডস’ এ দেশে পাওয়া যায় না। কোনো জাপানি পুতুল নেই। আমেরিকার ¯েœা, পাউডার, ব্লেড, দাঁতের মাজন কিছুই নেই। ভারতের কাপড়, ইংরেজের ব্লেড, কলম, সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি, কিছুই এ দেশে নেই। ” (পৃষ্ঠা-৫১) রসিকতা করে লিখেছেন, ‘ভাবলাম বেরসিক দেশ। আমার দেশে সব পাওয়া যায়। আমেরিকা, ইংরেজ, জাপানি সব পাওয়া যায়।’ (পৃষ্ঠা-৫১)

সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছেন তিনি নয়াচীনের কৃষিব্যবস্থা দেখে। “নয়াচীনে একখ- জমি দেখলাম না, যা অনাবাদি অবস্থায় পড়ে আছে। রেললাইনের পাশে যে গর্তগুলো পড়ে থাকে সেগুলোতেও ফসল করা হয়েছে। যদি কোনো জমি ইচ্ছাকৃতভাবে পড়ে থাকে তা হলে সরকার কঠোর শাস্তি দেয়। জমি যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে তা পুরুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; স্বামী জমি যা পাবে, স্ত্রীও সমপরিমাণ জমি পাবে এবং দুজনকেই পরিশ্রম করতে হবে। কারণ দুজনই জমির মালিক। স্বামী কাজ করবে আর স্ত্রী বসে খাবে এ প্রথা চীনের থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। আমি ট্রেন থেকে পুরুষ ও মেয়েলোক অনেককেই হাল-চাষ করতে দেখেছি। মেয়েদের অধিকার সম্বন্ধে পরে আলোচনা করব। জমির ট্যাক্স হিসেবে চাষিরা সরকারকে টাকা দিতেও পারে এবং ফসলের এক অংশও দিতে পারে। ট্যাক্স যে খুব কম তা নয়। আমার মনে হলো একটু বেশি।...

চাষিদের মধ্যে জমি বণ্টন হওয়ায় যথেষ্ট লোক কাজ পেয়েছে। বেকারের সংখ্যাও দিন দিন কম হয়ে যেতে লাগল। চীন বহু বড় দেশ, পুরো দেশটায় চাষাবাদ হতে পারে। সরকার জনগণের সাহায্য নিয়ে হাজামাজা নদী, খাল কাটতে শুরু করেছে। প্রতিবছর বন্যায় লাখ একর জমির ফসল আগে নষ্ট হয়ে যেত; আজ আর সাধারণ বর্ষায় ফসল নষ্ট হতে পারে না।” (৮৯-৯১)

চীনের ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জেলায় জেলায় কো-অপারেটিভ করতে চেয়েছিলেন। পরিত্যক্ত জমিগুলোতে আবাদ করতে চেয়েছিলেন। গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছিলেন। কৃষিতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। আজ সারা পৃথিবী মহামারীতে আক্রান্ত। বাংলাদেশও ভয়ানক ক্রান্তিকাল পার করছে। জীবন ও জীবিকার বিপর্যয় থেকে দেখা দিচ্ছে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নকে সামনে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, একখ- জমিও যেন খালি পড়ে না থাকে। কৃষকদের তিনি উৎসাহ দিয়েছেন অধিক ফসল ফলানোর জন্য। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যদি আমরা বুকে ধারণ করি তা হলে বাংলার একটি মানুষও না খেয়ে মরবে না। মনে হয় নয়াচীন থেকে বঙ্গবন্ধু অনেক ভাবনাই ধারণ করেছিলেন। সেসব ভাবনা প্রয়োগেরও চেষ্টা করেছিলেন। আমাদেরই দুর্ভাগ্য তার সরকারের সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। সাধারণ মানুষের কল্যাণ চিন্তায় নিবেদিত এই মহান নেতার কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই।

ড. আতিউর রহমান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement
Evaly
advertisement