advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অমানবিকতা ও বৈষম্যের ভাইরাস

মোহাম্মদ তানভীর কায়ছার
৮ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২০ ০২:৩৫
advertisement

শব্দটা ‘সামাজিক দূরত্ব’, ভাবের প্রয়োগার্থে বলা যায় বলতে চাওয়া প্রয়োজনীয় শারীরিক দূরত্ব। লক্ষ্য ছিল নিজে সুস্থ থেকে অন্যদের সুস্থ রাখায় ভূমিকা রাখা। কিন্তু বাড়ল যেটা সেটাকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানবিক দূরত্বই বলা যায়। সুলভে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে আমাদের বাণিজ্যিকরা অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মুনাফার পাহাড় গড়তে। এদিকে আপামর জনগণের করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ের চেয়ে অধিক হয়ে উঠল জীবন ধারণের জন্য খাদ্যচিন্তা। প্রয়োজনীয় ওষুধের দোকানে হাহাকার, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের আকাল পড়ল। ডেটল আর স্যাভলনের মতো নিত্যকার জীবাণুনাশকের জায়গা হলো স্রেফ বিজ্ঞাপনে। আর মাস্ক নিয়ে যতসব কা- সে তো আর বলার প্রয়োজন রাখে না।

করোনা যখন ঘরে হানা দিল তখন রমজান। সাম্যের বার্তা নিয়ে আসা রমজানে আমরা হয়ে উঠলাম আরও বেপরোয়া। বরাবরই হই, তবু এবার এক্সপেক্টেশন ছিল অন্তত। এই দুর্যোগে কিছুটা মানবিক হয়ে উঠবে চেইন রক্তচোষারা। প্রবাদে আছে চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি, এবার সঙ্গে যোগ হলো চোরা না শোনে মহামারীর কাহিনি। ফলত পাল্লা দিয়ে দুর্যোগ ঘনীভূত হলো। একদিকে দাম বেশি তার ওপর নানা পণ্যের সংকট। জীবিকাহারা মানুষগুলোর সংগ্রাম বেড়েই চলল। গরিব আরও গরিব আর সহায়হীন আরও অসহয়ায় হতে চলল। এসব ঘটনাও অনেকের বিবেকে টনক নাড়াতে পারেনি। উল্টো প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাজার তদারকি করতে করতে এই মহামারীতে আরও নাজেহাল হয়ে উঠল। শুধু মুনাফাভোগী মজুদদার নয়, তাদের লড়তে হল স্বার্থপর কিছু মানুষের সঙ্গে যাদের অর্থ আছে বলেই অপ্রয়োজনে ঘর ভর্তি করে সংকটে ফেলে দিল পুরো ব্যবস্থাকে। মহামারী, মৃত্যু বা সংকট কেউ এই স্বার্থপর সামর্থ্যমানদের বিবেক একটুও টলাতে পারেনি। কে না জানে পেটুকের পেট পাশের শূন্য প্লেটের থোড়াই কেয়ার করে। কর্মহীন, কপর্দকহীন, খাদ্য আর ওষুধহীন মানুষদের অধিকার সরকারি সয়াহতা নিজেদের উদর ভর্তিতে এক পাও পেছনে হটেনি আজীবনের সুযোগসন্ধানী ঘৃণ্য লুটেরারা। নিস্বঃ মানুষের অন্নে গুদাম ভরেছে তারা। অন্যের ক্ষুধা তাদের উল্লাসের জোগান দিয়েছে। তারা ধনী থেকে আরও ধনী হতে বিবেকের চোখে বেঁধে নিয়েছি কালো রুমাল। শাস্তি দিয়েও দমানো যায়নি এইসব চিরলোভী হায়েনাদের। গরিবের অধিকারে চাবুক মেরে নিজেদের লালসায় শান দিয়েছে এই মহামারীকে পুঁজি করেই।

কী নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি এই ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থা! মানব ধর্ম বা প্রাতিষ্ঠিনিক যত ধর্ম আছে পৃথিবীতে সব ধর্মই বিপদের সময় বিপদগ্রস্তের ওপর জুলুম না করার কথা বলে। সব ধর্মই বিপদে সাহায্যের হাত প্রশস্ত করার আদেশ দেয়, কিন্তু ধর্মপরায়ণ বলে দাবি করা এই জনগোষ্ঠীতে কেউ কেউ সেই শিক্ষার ধারেপাশেও নেই। উল্টো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কখন অন্যের পোড়া ঘরে নিজের আলুখানি পুড়িয়ে নেবে। করোনাকালীন মহামারী সেই নির্মম সত্যটাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

কতখানি পাশবিক হলে বাবার লাশের অপেক্ষায় থাকা কিশোরীকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে হায়েনার দল! দুঃস্বপ্নেও ভাবা যায় পিপিই পরে ওয়ার্ডবয় করোনা রোগী নারীর শ্লীলতাহানি করে! এসব নির্মম সব চিত্র সমাজের মধ্যে ওতপেতে থাকা ভয়ঙ্কর জানোয়ারদের সামনে নিয়ে এসেছে। এই মহাবিপদ তাদের নিবৃত্ত করেনি। আমাদের বিবেককে বাক্সবন্দি করে আমরা সমাজে মুখোশের সংস্কৃতিতে ডুবেছিলাম। আর সেটা সংঘবদ্ধভাবেই হোক বা ব্যক্তিক পর্যায়েই হোক। করোনার নানা অমানবিক ঘটনা চিত্র তা আমাদের সামনে ফের উন্মোচন করল।

যখন কী করব, কীভাবে এই মহামারীর সঙ্গে লড়ব সেই আতঙ্ক ভর করেছে সর্বত্র ঠিক তখন নকল মাস্ক সরবরাহ আর রেইনকোটকে পিপিই বানিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি ঠেলে দেওয়া হলো চিকিৎসকসহ অন্য সম্মুখযোদ্ধাদের। বাজারে এখন স্যাভলন, স্যানিটাইজার সবকিছুই নকল পাওয়া যাচ্ছে। এই মহামারীকে কেন্দ্র করে মাথাচাড়া দিয়েছে যুগের পর যুগ মানুষের জীবনের বিনিময়ে পুঁজি তৈরি করা কিছু নরপিশাচ। আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছি না। কারণ তাদের আছে অর্থ আর ক্ষমতার এক দৃশ্য বা অদৃশ্য চক্রব্যূহ। করোনার মতো মহামারী তাদের আবার চিনিয়ে দিল। করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই চিকিৎসকসহ চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতরা অনেকেই ভয়াবহ অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের করতালির মাধ্যমে অভিবাদন জানানো হলো, অথচ আমাদের অনেকেই বাড়ি ছাড়ার নোটিশ পেল। নিজেদের উপসর্গ গোপন করে শত শত চিকিৎসাকর্মীকে বিপদে পেললামÑ এটাকে স্রেফ অজ্ঞতা বলতে আমি নারাজ বরং নিজের চাইতে এখানে অন্যের বিপদ আমাদের কাছে যে বড় হয়ে উঠতে পারেনি। মহামারীর এই মহাবিপদও আমাদের অনেকের সম্প্রীতি ও মানবিকবোধ জাগাতে পারিনি। সবচেয়ে অমানবিকতার প্রমাণ মেলে।

একই বিষয় প্রত্যক্ষ করলাম আমাদের পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে। সরকার যেখানে তাদের কথা ভেবে হাজার হাজার কোটি টাক প্রণোদনা ঘোষণা করল, সেখানে বহু বছর ধরে নিজের ঘাম নিসৃত রক্তশ্রমে যাদের ব্যাংক ব্যালেন্স স্বাস্থ্যকর করলেন তারা তাদের দায়িত্ব নিতে চাইলেন না। তাদের জীবনের সঙ্গে ছিনিমিনি খেললেন সে কথা কারও অজানা নয়। কারও কারও বেতন-বোনাস মেলেনি। তাদের আহজারিতে ভারী হয়ে উঠল রাজপথের বাতাস। মাইলের পর মাইল রাস্তা পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বলি হওয়া মানুষগুলোকে এখন প্রমোদ গুনতে হচ্ছে চাকরি হারিয়ে জীবিকার জন্য পথে বসতে। অথচ হতে পারত ভিন্ন চিত্র। এত বছর নিরন্তর দায়িত্ব পালন করা মানুষগুলোকে পরিবারের মতোই ছায়া দিতে পারত তাদের প্রতিষ্ঠান মালিকরা। কেউ কেউ করেনি যে তা নয়। অনেকে এই মানবিকতাটুকু দেখিয়েছেও। বেসরকারি খাতের চাকুরেরা এখানে বৈষম্যের নানা শিকার হয়েছেন তার অনেক নজির আছে। কেউ কেউ এই তিন মাস বেতনের একটি টাকাও পাননি। আবার কেউ বা পেয়েছেন আংশিক। এই মহামারীতে তাদের মানবেতর জীবনযাপনের কারণ হয়ে উঠছেন সেই মানুষগুলোই যাদের জন্য তারা শ্রম দিয়েছেন দিনরাত। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন আবার কারও চাকরি হারানোর ভয় থাকছেই। এর মধ্যেও থেমে নেই অনেক এনজিওর ঋণের টাকা উত্তোলন। অনেককে ভাড়া না দেওয়ার কারণে বাস্তুহারা হতে হচ্ছে। এসব হাজারো লাখো অমানবিকতার গল্প উপহার দিয়েছে এই করোনাকাল। হাসপাতালের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে স্বজন হারিয়েছে বহুজন। অনেক চিকিৎসকের চেম্বারে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা পাননি নন-কোভিড রোগী। এসব নিত্যকার গল্প। প্রসূতি মায়ের কান্নার শব্দ পৌঁছায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে। এমনকি বেড ভাড়াসহ চিকিৎসার খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার খবর বেরিয়েছে রাশি রাশি। আর রাস্তায় মা-বাবাকে ফেলে যাওয়া সন্তানদের দেখার সুযোগ করে দিয়েছে এই করোনাকাল। লাশের দাবিদার স্বজন পাওয়া যায় না। মরতে যাওয়া মানুষটার মুখে একটু জল তুলে দেওয়ার মানুষ মেলে না। মৃতদেহ সম্মানের সঙ্গে বিদায় দেওয়া দূরের কথা, দাফন করতে দেওয়া হয়নি বহু জায়গায়।

ভিন্নচিত্র ও গল্পও আছে। বীরোচিত ভূমিকায় দেখা গেছে অসংখ্য জনকে। নিজেদের জীবন বাজি রেখেও লড়ছে চিকিৎসাসেবায় সরাসরি নিয়জিত অনেকেই। কিন্তু বৈষম্য ও অমানবিকতার যে নানা কদর্য চিত্রগুলো আমাদের চোখের সামনে এসেছে, সেটা অপ্রত্যাশিত। করোনার শিক্ষাগুলো আমাদের মানবিক সমাজ গঠনের প্রয়োজন নিয়ে ভাবিয়ে তুলছে। এই বোধোদয় আমাদের সংস্কারে উদ্বুদ্ধ করুক।

মোহাম্মদ তানভীর কায়ছার : শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement
Evaly
advertisement