advertisement
advertisement

ময়ূরের ভুলে মর্নিং বার্ডের ৩৪ যাত্রীর প্রাণহানি

ইউসুফ সোহেল
৮ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০২০ ০৩:২৩
advertisement

রাজধানীর শ্যামবাজারসংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের এমভি ময়ূর ২-এর ভুল চালানোর কারণে ধাক্কা লেগে এমএল মর্নিং বার্ড লঞ্চ ডুবে মারা যায় ৩৪ লঞ্চ যাত্রী। ময়ূর-২ লঞ্চের চালকদের অসতর্কতা ও অবহেলার কারণেই ঘটেছে এ দুর্ঘটনা। গত ২৯ জুন সকালে এ দুর্ঘটনার জন্য ময়ূর-২ লঞ্চের চালকদের দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে দুই তদন্ত কমিটি। গত সোমবার দিবাগত রাতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুগ্মসচিব রফিকুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে লঞ্চ দুর্ঘটনা এড়াতে ২০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

এই লঞ্চডুবির ঘটনা তদন্তে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর পৃথক তিনটি কমিটি গঠন করে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে গঠিত কমিটিও সোমবার বিকালে প্রতিবেদন জমা দেয়। আর নৌপরিবহন অধিদপ্তরের গঠিত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে

আগামী সপ্তাহে।

জানা গেছে, জমা দেওয়া দুটি তদন্ত প্রতিবেদনেই ঘটনার সময় রঙ সাইড দিয়ে চলা ময়ূর-২ লঞ্চের অনিয়ন্ত্রিত গতিকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ দুর্ঘটনার জন্য ময়ূর-২ লঞ্চের যে চারজন চালককে দায়ী করা হয়েছে, তারা হলেনÑ প্রথম মাস্টার মো. আবুল বাশার মোল্লা (২য় শ্রেণির মাস্টার), দ্বিতীয় মাস্টার জাকির হোসেন (৩য় শ্রেণির মাস্টার), প্রথম ড্রাইভার শিপন হাওলাদার (২য় শ্রেণির ড্রাইভার) ও দ্বিতীয় ড্রাইভার মো. শাকিল সিপাই (৩য় শ্রেণির মাস্টার)।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মর্মান্তিক এই লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। যদিও লঞ্চ মর্নিং বার্ড দুর্ঘটনার জন্য কারা দায়ী বা কী কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে তার তথ্য দেননি তিনি।

মন্ত্রী বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ মর্নিং বার্ড দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মারা যাওয়ার বিষয়টি হত্যাকা- হিসেবে প্রমাণিত হলে এ সংক্রান্ত অবহেলাজনিত মামলাটি ‘হত্যা মামলা’ (ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারা) হিসেবে বিবেচিত হবে। লঞ্চডুবির ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা করেছে। মামলার প্রতিবেদন ১৭ আগস্ট প্রকাশ হবে। তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লিখিত দুর্ঘটনার কারণগুলো প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

এই লঞ্চডুবির ঘটনায় যে ২০ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করেছে নৌ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি, সেগুলো হলোÑ সদরঘাট থেকে ভাটিতে ৭-৮ কিমি এবং উজানে ৩-৪ কিমি অংশে অলস বার্দিং উঠিয়ে দিতে হবে। এ অংশে পন্টুন ছাড়া নোঙর করা নৌযান রাখা যাবে না। এ অংশ হতে পর্যায়ক্রমে শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দিতে হবে। সদরঘাট টার্মিনালের আশপাশে কোনো খেয়াঘাট রাখা যাবে না। ওয়াইজঘাটের উজানে খেয়াঘাট স্থানান্তর করা যেতে পারে। লঞ্চের সামনে ও পেছনে, মাস্টার ব্রিজ, ইঞ্জিন রুম, ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। মাস্টারের দেখার সুবিধার জন্য ব্যাক ক্যামেরা ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া লঞ্চে পর্যায়ক্রমে ওয়াকিটকি সিস্টেম চালু করতে হবে। লঞ্চ-জাহাজঘাট ত্যাগ করার আগেই ঘাটে ডিক্লারেশন দাখিল বাধ্যতামূলক করতে হবে। লঞ্চে কতজন যাত্রী বহন করা হচ্ছে, ডেক সাইডে এবং ইঞ্জিনে কারা কারা কর্মরত আছেন তা ডিক্লারেশনে উল্লেখ থাকতে হবে। ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ করতে হবে। প্রত্যেক লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট ও বয়া রাখতে হবে। সব নদীপথে বিভিন্ন নৌযানের স্পিড লিমিট নির্ধারণ করে দিতে হবে। সদরঘাটে স্পিড কন্ট্রোল করার জন্য টাওয়ার স্থাপন ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। লঞ্চে মেকানিক্যাল সিটিংয়ের পরিবর্তে ইলেক্ট্রো হাইড্রোলিক সিটিং প্রবর্তন করার উদ্যোগ নিতে হবে। যাত্রীবাহী লঞ্চে মেইন ইঞ্জিনস লোকাল কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিবর্তে ব্রিজ কন্ট্রোল সিস্টেম পর্যায়ক্রমে চালুর কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সানকেন ডেক লঞ্চ পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে দিতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে এগুলোর চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে যথাযথ সনদধারী মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়া নৌযান পরিচালনা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে ডিসপেনসেশন সনদ গ্রহণের প্রথা বাতিল করতে হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক লোকদের ওঠানামার সুবিধার্থে গ্যাংওয়ে/ব্রিজ স্থাপন করতে হবে। সদরঘাটে পন্টুনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সার্ভের মধ্যবর্তী সময়ে নৌযানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অন্যান্য বিষয় পরিদর্শন করার নিমিত্ত পরিদর্শকদের পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরদার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে। উৎসবসহ সব সময়ের জন্য প্রত্যেক লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি বন্ধ করতে হবে। টিকিট প্রদর্শন ছাড়া কোনো যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বন্ধ করার জন্য কেবিন সংখ্যা ও ডেকযাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে এসব টিকিট অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নৌ আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নৌকর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার জন্য বিআইডব্লিউটিএকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। নৌযানের ফিটনেস ও নৌকর্মীদের যোগ্যতা সনদ ইস্যুতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। সার্ভে সনদ প্রদানকারী সংস্থা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভেয়ারের সংখ্যা ও লজিস্টিক সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। ডেক অ্যান্ড ইঞ্জিন পারসোনাল ট্রেনিং সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার নিবন্ধিত জাহাজ ছাড়াও আরও নিবন্ধনহীন অসংখ্য জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে গড়ে কমপক্ষে দুজন মাস্টার ও দুজন ইঞ্জিনচালক নিয়োগ করতে হলে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। দেশে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়ে রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাহাজে নিয়োগ করতে পারলে দুর্ঘটনা কিছুটা লাঘব হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানকে আরও দৃশ্যমান করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি করতে হবে। নৌদুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে দায়ী মাস্টার, ইঞ্জিন ড্রাইভারদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নিতে হবে। নৌদুর্ঘটনা ও নৌযানসংক্রান্ত অপরাধের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও আসামি গ্রেপ্তারের জন্য সদরঘাটে কর্মরত নৌপুলিশের জনবলের সংখ্যা ৯ জন থেকে বৃদ্ধি করে কমপক্ষে ২৫ জন করতে হবে। নৌযান ও নৌকর্মীদের চলাচল জানার জন্য এবং অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য নৌযান ও নৌকর্মীদের ডাটাবেজ তৈরি ও ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ লজিস্টিক সুবিধা প্রদান করতে হবে। সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। নৌদুর্ঘটনা গবেষণার বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে ২০টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। সুপারিশগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। যেগুলো সম্ভব দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। যেগুলো বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ সেগুলো সময় নিয়েই বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজনে এ নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলের পরামর্শও গ্রহণ করা হবে।

ময়ূর ২-এর সুপারভাইজার তিন দিনের রিমান্ডে

আদালত প্রতিবেদক জানান, বুড়িগঙ্গায় অর্ধশতাধিক যাত্রী লঞ্চডুবির ঘটনায় করা মামলায় এমভি ময়ূর ২-এর সুপারভাইজার আব্দুস সালামের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মিশকাত শুকরানা এ রিমান্ডের আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌপুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল আলম আসামিকে আদালতে হাজির করে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আদালত এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

advertisement
Evaly
advertisement