advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধরছি বলেই যেন চোর হয়ে যাচ্ছি

নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ জুলাই ২০২০ ২২:৩২
advertisement

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, কে কোন দলের সেটা বড় কথা নয়। দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িতদের আমরা ধরে যাচ্ছি। তবে এদের ধরে যেন আমরাই চোর হয়ে যাচ্ছি। আমরা ধরার পর আমাদের দোষারোপ করা হয়। তবে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এ অনিয়মগুলো আমরা নিশ্চয়ই মানব না। যে যাই হোক তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, নেব এবং এটা অব্যাহত থাকবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সংসদ নেতা এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদেরের অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র নষ্ট করে দিয়ে গেছে ১৯৭৫-এর পর যারা রাতের অন্ধকারে অস্ত্র হাতে নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তারাই। কারণ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এরা মানুষকে দুর্নীতি শিখিয়েছে, কালো টাকা শিখিয়েছে, ঋণখেলাপি শিখিয়েছে। তারা এ সমাজটাকে কলুষিত করে গেছে। মানুষ আগে যে একটা আদর্শ নিয়ে চলত, নীতি নিয়ে চলত, দীর্ঘদিন এ দেশে এ মিলিটারি ডিকটেটরশিপ এ দেশের মানুষের চরিত্র হরণ করেছে। কারণ তাদের অবৈধ ক্ষমতাটাকে নিষ্কণ্টক করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। তারা বছরের পর বছর এ দুর্নীতির নিয়ম বীজ বপন করেছে। তা মহিরূহ হয়ে গেছে। যতই কাটেন, কোথা থেকে আবার গজিয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, এ চরিত্রহীনতা একেবারে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছিল। সেখানে আপনি যতই চেষ্টা করেন,

এর মূলোৎপাটন যথেষ্ট কঠিন। তার পরও এর মধ্যে যে খবরগুলো পাচ্ছেন এটা কারা করছেন? আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর কে কোন দলের সেটা বড় কথা নয়, এই ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, অনিয়মে জড়িত যাকে যেখানে পাচ্ছি আমরা ধরে যাচ্ছি। ধরছি বলেই যেন আমরা চোর হয়ে যাচ্ছি। আমরা ধরার পর আমাদের দোষারোপ করা হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, এটাই হচ্ছে দুর্ভাগ্য। এর আগে তো দুর্নীতিটাই নীতি ছিল, অনিয়মটাই নিয়ম ছিল। সেভাবেই রাষ্ট্র চলেছে। কিন্তু আমরা আসার পর সেগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। যতটুকু পারি সেগুলো আমরা শুদ্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এ অনিয়মগুলো আমরা নিশ্চয়ই মানব না।

রিজেন্ট হাসপাতাল প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আজকে যে খবর হলো, যে খবর আপনারা পাচ্ছেন, কে করেছে? কে ধরেছে তাদের? আমরা যাকেই পাচ্ছি তাকেই ধরছি। আমরাই ধরি আবার আমাদের দোষারোপ করা হয়।

বিভিন্ন মহলে বাজেটের সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের তো অনেক রাজনৈতিক দল আছে। সমালোচনা অনেকেই করে যাচ্ছেন। এমনকি বহু এনজিও, অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ঠিক বর্তমানে কতজনকে চোখে পড়ে যারা কাজ করছে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে? সেটাই আমার প্রশ্ন। ঘরে বসে সমালোচনা, বাজেটের খুঁত ধরা, কাজের খুঁত ধরা সেগুলো অনেকেই ধরতে পারেন, এটা ঠিক। কিন্তু মাঠে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষকে সেবা করা, এ কাজগুলো কিন্তু আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক যারা, আমরাই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। মাঠে অন্যদের দেখা যায় না। অনেক উন্নত দেশ বাজেট প্রণয়ন করতে পারেনি। কিন্তু আমরা করেছি। এ জন্য অর্থমন্ত্রীসহ এর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত ছিল তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি হয়তো করোনার কারণে সবটুকু আমরা অর্জন করতে পারব কি পারব না এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেকে সেই প্রশ্ন তুলেছেন। বাজেট বক্তৃতায় এটা নিয়ে বিস্তারিত বলতে চাই না। এটা বলব, আমরা আশাবাদী।

তিনি বলেন, ঝড়ঝঞ্ঝা, দুর্যোগ, রোগ-শোক এগুলো থাকবেই। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকতে পারে না। জীবন তো চলমান। জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর সেদিকে লক্ষ রেখেই যদি কখনো বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হয়, তখন যেন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি তা মাথায় রেখেই এ বাজেটটি দিয়েছি। যদি ভালো হয়, তা হলে তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। আর যদি সারাবিশ্বে স্থবিরতা চলে, আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। তবে চলমান থাকবে আমাদের অর্থনীতি। সেই লক্ষ্যেই আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিনিসের দাম যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে সেই ব্যবস্থা নিয়ে যাচ্ছি। যেভাবে হোক দেশের অর্থনীতি যেন গতিশীল থাকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

পাটকলগুলো বন্ধ করা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষার জন্য যেহেতু সিনথেটিক থেকে সবাই এখন মুক্তি চায় সেখানে পাট হচ্ছে একটা বিকল্প। সেখানে আমাদের একটা বিশাল সম্ভাবনা বিশ্বব্যাপী রয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে সময়োপযোগী করতে হবে, আধুনিক করতে হবে, নতুন করতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, পাটকলের শ্রমিকদের আমরা মোবাইলের মাধ্যমে বেতন দিয়ে দিলাম। ২৫ হাজার শ্রমিকের সঙ্গে আরও আছে অনিয়মিত শ্রমিক। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বছরের পর বছর বেতন দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এভাবে একটি শিল্প চলতে পারে না। এ কারখানাগুলো সব থেকে পুরনো। সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে তৈরি। এ শিল্পগুলো দিয়ে আসলে লাভ করা সম্ভব নয়। পাটের একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। সে জন্য আমরা চাচ্ছি এটাকে নতুনভাবে তৈরি করতে।

তিনি বলেন, পাট আমাদের অর্থকরী ফসল। আবার কৃষিপণ্য। আমরা পাটের জন্ম রহস্য আবিষ্কার করেছি। গবেষণা করে বিভিন্ন পাটজাত পণ্য আবিষ্কার করছি। পরিবেশগত কারণে সবাই সিনথেটিক পণ্য থেকে মুক্তি চায়। সেখানে পাট হচ্ছে বিকল্প। ফলে বিশ্বব্যাপী এ খাতে আমাদের বিশাল সম্ভাবনা রয়ে গেছে। কিন্তু এ জন্য আমাদের কারখানাগুলোকে সময়োপযোগী করতে হবে। আধুনিক করতে হবে। নতুন করতে হবে। সে জন্য আমরা পাটের শ্রমিকদের মজুরির টাকাসহ সব পাওনা একবারে শোধ করে দেব। এ জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। তবে সব ক্যাশ টাকা দেব না। ক্যাশ টাকা দিলে মেয়ের জামাই, ভাতিজা-আত্মীয়স্বজন সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে। ভাগ চাইবে। এ জন্য আমরা অর্ধেকটা সঞ্চয়পত্র করে দেব। যাতে তারা এখন মাসে যে বেতন পাচ্ছেন তার থেকে বেশি পাবে। আর আমরা এ কারখানাগুলো নতুনভাবে করব। এখানে শ্রমিকদের মধ্যে আগ্রহীদের আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। আধুনিক প্রযুক্তি অনুযায়ী তাদের তৈরি করব। পাটকল চালু হলে তারা নতুনভাবে চাকরি পারে। পাট ও পাটজাত পণ্যের বিশ্ববাজার ধরতে এ পদক্ষেপ নিচ্ছি।

বাংলাদেশে বন্যা নিয়মিত ঘটনা হয়ে গেছে মন্তব্য করে সংসদ নেতা বলেন, করোনা তো আছেই। এরই মধ্যে ঘূর্ণিঝড় গেল। এখন এলো বন্যা। ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলে কয়েকটি জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এ বন্যার পানি নেমে এলে দক্ষিণাঞ্চল প্লাবিত হবে। ইতোমধ্যে মধ্য অঞ্চলে বন্যা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। কাজেই আমার জানা আছে কখন কোন এলাকায় বন্যা হয়। এ জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোনো দুর্যোগ আসার পর যাতে ত্রাণের অপেক্ষা করতে না হয় তার জন্য আগাম ব্যবস্থা রেখে দিয়েছি। আমরা জেলায় জেলায় বরাদ্দ দিয়ে রেখেছি। দেশের প্রকৃত অবস্থা জেনেই ব্যবস্থা নেই মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে। মানুষের কষ্ট যাতে কমাতে পারি সেদিকে লক্ষ রেখে পদক্ষেপগুলো নিয়ে থাকি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনা এমন একটি আতঙ্ক, নাম শুনলেই মৃত্যু ভয় চলে আসে। এ ভয়কে জয় করতে হবে। মৃত্যু তো অবধারিত। তবে আমাদের দেশে করোনায় মৃত্যুর হার কম, সুস্থতার হার অনেক বেশি। করোনার ভয়ে আতঙ্কিত হব কেন? ভয়কে জয় করতে হবে। মরার আগে মরব কেন? নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। দুর্ভাগ্য, করোনা ভাইরাস সবকিছু স্থবির করে দিয়েছে। এটা অত্যন্ত কষ্টকর ও দুঃখজনক। তবে আমরা চেষ্টা করেছি যতদূর সম্ভব মানুষকে রক্ষা করা এবং মৃত্যুহার কমানোর। সেদিকে লক্ষ রেখে আমরা পরিকল্পনা করেছি। পদক্ষেপ নিয়েছি। তার সুফল মানুষ পাচ্ছে। দেশের মানুষ আরও সচেতন হলে, স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ মেনে চললে করোনা মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেত।

করোনার বিস্তার সম্পর্কে সংসদ নেতা বলেন, প্রত্যেকটি জায়গায় আঘাত করার করোনার নিজস্ব একটা পদ্ধতি আছে। প্রথমে হয়তো একজন, তার পর দুজন। তার পর দেখা গেল ১০ জন। এভাবে কিন্তু বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে কথাটি বলা হয়েছিল, সেটায় দেখা গেছে যে মে মাসের পর থেকে আস্তে আস্তে এটা বাড়বে। জুন-জুলাই মাস পর্যন্ত বাড়তে থাকবে। তার পর এক সময় এটা হয়তো কমতে থাকবে।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাহস না হারাতে সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমাদের এখন অনেকেই করোনা রোগে আক্রান্ত। আমি যতদূর পারি, সবার সঙ্গে ফোনে একটু কথা বলি। কথা বলি এজন্য যে মনে করি যে সাহস দিই। তারা কেমন আছেন খোঁজ নিই, খবর নিই। চিকিৎসাটা ঠিক মতো পাচ্ছে কি না। এটুকু চাই যারা করোনা রোগে আক্রান্ত তারা আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে আসুক। আমাদের সুস্থ হয়ে উঠার হার অনেক বেশি। যাদের অন্যান্য শারীরিক অসুবিধা আছে বা বয়স, তারা হয়তো মৃত্যুবরণ করছেন। তবে কারও মৃত্যুই কাম্য নয়। আমরা চাই না যে এ রোগে কেউ মারা যাক।

শেখ হাসিনা বলেন, করোনাকে জয় করার জন্য সবার মনে সাহস রাখতে হবে, আর স্বাস্থ্যবিধি সবাইকে মেনে চলতে হবে। সেটুকুই আমি দেশবাসীকে আহ্বান জানাব।

কবিতার চরণ উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনা বলেন, জন্মিলে মরিতে হবে... অমর কে কোথা কবে? এটা তো কবিই বলে গেছেন। কিন্তু তাই বলে আমি মরার আগে মরব না। মরণকে জয় করতে হবে। কাজেই করোনার ভয়ে আতঙ্কিত হব কেন? নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যা যা করণীয়, সেটা করতে হবে। মনে সাহস রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করি যে এ দুঃসময়টা আর থাকবে না। এখান থেকে সারাবিশ্ব মুক্তি পাবে, আমরাও মুক্তি পাব। তবে আমি আবারও বলব আমার দেশের জনগণকে এবং আমাদের যারা সংসদ সদস্যরা আছেন, স্বাস্থ্যবিধিটা যাতে সবাই একটু মেনে চলেন। তা হলে এ করোনা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

advertisement
Evaly
advertisement