advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বন্ধের ঝুঁকিতে আকাশপথ

করোনা সনদ ইস্যু # ৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি কাতার এয়ারওয়েজে ইতালি যেতে পারবেন না

আরিফুজ্জামান মামুন
১০ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০ ১৪:০০
advertisement

বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে দুই মাস বন্ধ থাকার পর গত ১৬ জুন বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হয়। শর্ত হিসেবে সবার করোনামুক্তির সার্টিফিকেট আবশ্যিক করা হয়। কিন্তু করোনা নেগেটিভের সনদ নিয়ে বেশকিছু দেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে সেসব দেশে বাংলাদেশের সঙ্গে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

বিমানযাত্রার সময় সবাই করোনামুক্তির সার্টিফিকেট দেখিয়ে উড্ডয়নের সুযোগ পেয়েছিলেন। ফলে যেসব দেশের বিমানপথ বাংলাদেশের জন্য খুলেছিল, সেগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ শ্রমিকদের বিদেশ গমন কঠিন হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কীভাবে করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়েও সে দেশে গিয়ে পজিটিভ হচ্ছেন সেটি খতিয়ে দেখা উচিত। নইলে অন্য দেশের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মাবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশগুলোর সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ইতালির সঙ্গে বিমান চলাচল শুরু হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহে হাজারখানেক বাংলাদেশি বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ইতালি ফিরে গেছে। কিন্তু বুধবার কাতার এয়ারওয়েজে ইতালি যাওয়া ১৬৮ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীকে দেশটিতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ফেরত যাত্রীদের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করে ইতালি। এর পর এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশের সব ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্লাইট বাতিল করলেও কাতার থেকে যাওয়া ফ্লাইট চালু রেখেছে ইতালি। তাই দোহা থেকে যাওয়া ওই ফ্লাইটটির বাংলাদেশি যাত্রীদের ইতালি প্রবেশে কোনো বাধা থাকার কথা ছিল না। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে ইতালির জাতীয় দৈনিক ইল মেসসাজ্জেরোর জানায়, কোনো বাংলাদেশি ইতালিতে প্রবেশ করতে পারবেন না। এমনকি তাদের বিমান থেকেও নামতে দেওয়া হবে না। এর পর তাদের দোহাগামী ফিরতি ফ্লাইটে তুলে দিয়েছে দেশটির ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট। যদিও মানবিক কারণে তাদের গ্রহণ করতে বাংলাদেশ দূতাবাস রোম এবং মিলানের বাংলাদেশ কনস্যুলেট তাৎক্ষণিক নোট ভারবাল পাঠিয়ে জোর অনুরোধ করেছিল। কিন্তু ইতালি সরকার তার নীতি বা সিদ্ধান্তের প্রশ্নে একচুলও নমনীয় হয়নি। এদিকে কাতার এয়ারওয়েজের বাংলাদেশ অফিস গতকাল এক বিজ্ঞপিতে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি কাতার এয়ারওয়েজে ইতালি যেতে পারবে না বলে জানিয়েছে।

ইতালি প্রতিনিধি ইসমাঈল হোসেন স্বপন জানান, ইতালির মিলানে নামা ৪০ যাত্রীর ৩৯ জনকে দোহাগামী ফিরতি ফ্লাইটে ফেরত পাঠানো হয়। একজন নারীযাত্রী অপেক্ষমাণ অবস্থায় বিমানবন্দরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সুস্থ হওয়ার পর তাকেও ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাতার এয়ারওয়েজের অপর ফ্লাইটে ইতালির রোমে যাওয়া ১২৫ বাংলাদেশিকে বিমান থেকে নামতে দেওয়া হয়নি। তাদেরও ফেরত পাঠানো হয়।

গত ৬ জুন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবি এই দুটি রুটে বিমানের ফ্লাইট চালু হওয়ার কথা ছিল। এ জন্য টিকিট বিক্রির কার্যক্রমও শুরু করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। কিন্তু আরব আমিরাত সিভিল এভিয়েশনের সিদ্ধান্তের কারণে এই দুটি রুটে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি কোভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়েও চার বাংলাদেশির শরীরে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চার্টার্ড ফ্লাইটে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাপান। সম্প্রতি বিমানের চার্টার্ড ফ্লাইটে জাপান যান অনেক বাংলাদেশি। কোভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন তারা। কিন্তু জাপান যাওয়ার পর চার বাংলাদেশির কোভিড-১৯ পজিটিভ হন। এ চার বাংলাদেশির হেলথ সার্টিফিকেটে বলা ছিল, তারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নন এবং তাদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা নেই।

অন্যদিকে করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সব দেশের সঙ্গে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও তা চালু ছিল চীনের সঙ্গে। কিন্তু ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংঝু শহরগামী একটি ফ্লাইটে ১৭ জন করোনা রোগী পাওয়ার পর চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের বাংলাদেশ-গুয়াংঝু রুটে বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বেইজিং। চার সপ্তাহে চীনের এই বিমান সংস্থা বাংলাদেশ-গুয়াংঝু রুটে বিমান চলাচল করতে পারবে না। এদিকে ঢাকা-গুয়াংঝু রুটে চলাচলকারী ইউএস বাংলার (বিএস৩২৫) গত ২৮ জুনের ফ্লাইটে ৫ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় এক সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চায়না সিভিল এভিয়েশন থেকে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশনকে চিঠি দিয়ে এ কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও জানানো হয়েছে, ইউএস বাংলার গত ৫ জুলাইয়ের ফ্লাইটের যাত্রীদের করোনা পরীক্ষার ফল প্রক্রিয়াধীন। ফলে ৫ জনের অধিক যাত্রীর দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হলে ৪ সপ্তাহের জন্য ফ্লাইট বন্ধের কথা বলা হয়েছে।

এর আগে ১৩ মে দক্ষিণ কোরিয়ায় দুজন বাংলাদেশি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন। ওইদিন চার্টার্ড ফ্লাইটে বাংলাদেশে আটকে পড়া ইপিএসকর্মী ও শিক্ষার্থীরা কোরিয়ার ইনচন বিমানবন্দরে পৌঁছেন। সেই বিমানের যাত্রীদের করোনা পরীক্ষায় দুজন বাংলাদেশির করোনা পজিটিভ আসে। বিষয়টি নিশ্চিত করে দূতাবাস একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের মধ্যে পাঁচজন কোভিড-১৯ পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন কোরিয়ান এবং দুজন বাংলাদেশি। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে তাইওয়ানে ফেরা এক দম্পতির করোনা শনাক্ত হয়। এর আগে বাংলাদেশে করোনার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তারা পরীক্ষা করিয়েছিলেন। সে সময় তাদের ফল নেগেটিভ আসে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন আমাদের সময়কে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। সম্প্রতি জাপান, চীনে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশিরা সে দেশে করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ ধরা পড়েছে। গণমাধ্যমে খবর এসেছে, আমাদের দেশে একদল অসাধু ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে করোনা নেগেটিভ-পজিটিভ সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। এভাবে চললে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, কোনো যাত্রীর করোনা সার্টিফিকেট সত্য না মিথ্যা তা পরীক্ষা করা সিভিল এভিয়েশনের কাজ না। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ। দেশের একটি অসাধু চক্রের কারণে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। এভাবে চললে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বলব।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, করোনার মোকাবিলায় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থ্রা যে শৈথিল্য তার প্রমাণ হচ্ছে এটি। করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে বিদেশে গিয়ে পজিটিভ হচ্ছে। এটি দেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণœ করছে। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষা অনুমতি দেওয়া হচ্ছে দেখার কেউ নেই। আমাদের এয়ারপোর্টেও কোনো ব্যবস্থা নেই। এটির সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের ওপর পড়বে। আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে কেউ উৎসাহী হবে না। মোট কথা দেশের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশায় ফুটে উঠেছে।

advertisement