advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রিজেন্ট চেয়ারম্যান সাহেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ

দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করতে যাচ্ছে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০ ০২:৫৯
advertisement

রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে সাহেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও জানতে চাওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত চিঠি ব্যাংকগুলোয় পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সাহেদের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্তের স্বার্থে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। গতকাল পুলিশের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশন বিভাগকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাকে ধরতে সাড়াশি অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাবের একাধিক চৌকস দল। ইতোমধ্যে তার নানা অপকর্মের সহযোগী রিজেন্ট হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম শিবলীকে গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে র‌্যাব।
এদিকে সাহেদ করিমের অনিয়ম এবং দুর্নীতির অনুসন্ধান খুব শিগগিরই শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব দিলোয়ার বখত। গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অন্যদিকে সাহেদ নিজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও প্রতারণা করতেন বলে অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে জানিয়েছেন তার স্বামীর নানা অপকর্মের কথা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। খুব শিগগির সেগুলো জানিয়ে দেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোয়
বিএফআইইউর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহেদ/সাহেদ/মো. শাহেদ করিম এবং তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ব্যাংকের কোনো হিসাব থাকলে তা আগামী ৩০ দিন অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) থাকবে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের আইনের ক্ষমতাবলে এ নির্দেশ দেওয়া হলো। পাশাপাশি তার নামে এবং সংশ্লিষ্টদের নামে কোনো অ্যাকাউন্ট থাকলে অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য বিএফআইইউকে জানাতে হবে। অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ থাকায় এসব অ্যাকাউন্ট থেকে আপাতত কোনো লেনদেন করা যাবে না।
প্রতারণার শেষ নেই সাহেদ করিমের। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার মতো একে একে ফাঁস হচ্ছে তার সব অপকর্মের তথ্য। নির্যাতনের কিছু স্থিরচিত্রও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এক ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের বলেন, তার কাছে পাওনা টাকার জন্য গিয়েছিলাম। টাকা চাওয়া মাত্রই তার লোকজন আমার দুই হাত চেপে ধরে রুমের দরজা বন্ধ করে মারধর শুরু করে। পাওনাদারকে নারী দিয়ে হেনস্তা করাও ছিল সাহেদের অন্যতম কাজ। ভুক্তভোগীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গিয়ে অভিযোগও করতে পারতেন না। সাহেদের এমন সব প্রতারণা আর অপকর্মের বিষয়ে তদন্তে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে খুঁজে বের করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব।
দেশ ছেড়ে যেন কোনোভাবেই পালাতে না পারে সে বিষয়েও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তার অন্যতম সহযোগী ও রিজেন্ট হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে গতকাল সকালে রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। একইসঙ্গে আরও তথ্য-উপাত্ত বের করতে সাহেদের ভায়রা ভাই মোহাম্মদ আলী বশিরকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি নাটক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘টেলিহোম’-এর প্রধান।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, তারেক শিবলীকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি সাহেদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতেন। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে বনানী থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয় মোহাম্মদ আলী বশিরকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, সাহেদের অবৈধ টাকা দিয়ে নাটক প্রযোজনা করতেন। সাহেদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে র‌্যাব হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাহেদের ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিত থাকার ছবি দেখা গেছে। তিনি কীভাবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেতেন তারও তদন্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। বিএনপির নেতাদের সঙ্গেও সাহেদের পুরনো কিছু ছবি ফেসবুকে এখন শেয়ার করছেন অনেকে। জানা গেছে, সাহেদের প্রতারণার বিষয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে আগেই সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম আমাদের সময়কে বলেন, সাহেদকে গ্রেপ্তারে মাঠে রয়েছে আমাদের একাধিক দল। তার সব কিছু নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি জানান, সাহেদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত চিঠিতে সাহেদের বিরুদ্ধে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তিনি যেন দেশের বাইরে যেতে না পারেন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ইমিগ্রেশন বিভাগকে বলা হয়েছে।
প্রতারণার সব কৌশলই রপ্ত করেছেন সাহেদ। ছাড় দেননি নিজের পরিবারকেও। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে তার স্ত্রীর মুখে উঠে আসে তার নানা অপকর্মের চিত্র। সাহেদের বিচারও দাবি করেছেন স্ত্রী সাদিয়া। তার বাড়ির মালিকের দাবি, বাসা ভাড়ার টাকা চাইতে গেলেও দেওয়া হতো হুমকি।
সাহেদ পরিবারসহ প্রায় ২ বছর ধরে থাকতেন ওল্ড ডিওএইচএসের ৯ নম্বর বাসায়। ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে বাসাটি ভাড়া নিলেও অল্প কয়েকদিনেই বেরিয়ে আসে তার আসল রূপ। তার স্ত্রী সাদিয়া জানান, সাহেদের প্রতারণার শুরু হয় ২০০৮ সাল থেকে। পরিবারের লোকদের সঙ্গেও প্রতারণা করত সে। এটা তার নেশায় পরিণত হয়েছে। এই প্রতারকের বিচারও চেয়েছেন তিনি। স্ত্রী বলেন, কয়েকবার আমি তার কাছ থেকে চলেও গেছি। আমার পরিবারের কয়েকজনের সঙ্গেও তার টাকা-পয়সা নিয়ে গ-গোল ছিল। ওনার জন্য আমার পরিবারের অন্যরাও সমস্যায় আছে।
আশপাশের হাসপাতালগুলো থেকে রোগী বাগিয়ে নিত সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল। টঙ্গী আহসান উল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে কোনো রোগী এলেই তা পাঠিয়ে দেওয়া হতো উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে। রিজেন্টের দালালরা সব সময় সক্রিয় থাকত। উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে তারা সাধারণ রোগীদের ভাগিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করে মোটা অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নিত। অপরদিকে ভর্তি রোগীরা হাসপাতালের লাখ লাখ টাকা বিল দিতে না পারলে দালালদের হাতে নির্যাতনেরও শিকার হতেন। সব মহলকে ম্যানেজ করেই ব্যবসা করতেন সাহেদ।
সাহেদের দুর্নীতি তদন্তের বিষয়ে দুদক সচিব দিলোয়ার বখত বলেন, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিকের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুদক খুব শিগগিরই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেবে। বর্তমান এ সংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই-বাছাই চলছে। এ সময় মাস্ক দুর্নীতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, অনুসন্ধানের স্বার্থে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কারও নাম জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এলে তাদেরও তলব করা হবে। এ বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান টিম কাজ করছে।
করোনা ভাইরাস পরীক্ষা না করে রিপোর্ট প্রদানসহ রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ৬ জুলাই র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) একটি দল রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখায় অভিযান চালায়। অভিযানে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পর হাসপাতালের উত্তরা শাখা সিলগালা করে দেয় র‌্যাব। একই দিন রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখায়ও অভিযান চালানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখারই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা জারি করে। হাসপাতালে জালিয়াতির অভিযোগে গত মঙ্গলবার রাতে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদসহ ১৭ জনকে আসামি করে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করে র‌্যাব। সাতক্ষীরার ছেলে সাহেদ স্কুলের শেষ দিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় ঢাকায় চলে আসেন। তার মা সাফিয়া করিম এক সময় মহিলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। ২০০৯ সালে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সাহেদ দুই বছরের মাথায় ধানমন্ডিতে এমএলএম ব্যবসা শুরু করে বহু লোকের টাকা মেরে দেন বলে অভিযোগ আছে। পরে তিনি প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে প্রতিষ্ঠা করেন রিজেন্ট গ্রুপ। হাসপাতালে ছাড়াও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসন, হোটেল ব্যবসা রয়েছে এ গ্রুপের।

advertisement