advertisement
advertisement

অ্যালুমিনিয়াম ঢালাই কারখানায় গলে পিডিবির তার

হামিদ উল্লাহ চট্টগ্রাম
১০ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০ ১৩:০৯
চট্টগ্রামের একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা
advertisement

শহর থেকে দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটারের মতো। পটিয়ার মনসারটেক নামক স্থানে চারটি অবৈধ গ্যাসের চুলা দিয়ে রাতভর গলানো হয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অ্যালুমিনিয়ামের তার। এরপর পাশের একটি ঘরে ওই পাতগুলো রাখা হয়। পরে সময়-সুযোগ বোঝে সেগুলো রাতের বেলা ট্রাকে করে আনা হয় শহরে। পাতগুলো গলিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র, রান্নার হান্ডি ও ডেকসি বানানো হয়।

এসএস অ্যালুমিনিয়াম মোল্ডিং অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ নামের ওই ঢালাই কারখানায় বছরের পর বছর এ কাজ চলতে থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। করোনাকালে তিন মাস প্রশাসনের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকার সঙ্গে এখানকার তার গলানোর কাজও বন্ধ ছিল। কারণ সে সময় শহর থেকে তার নেওয়া এবং ঢালাই কারখানা থেকে অ্যালুমিনিয়ামের পাত শহরে আনার বাহন ট্রাক চলাচল বন্ধ ছিল। পিডিবির বিভিন্ন কার্যালয় খোলার পর এখানে তার গলানোও শুরু হয়েছে।

জানা যায়, প্রশাসনের ঠিক কোন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখভাল করবেন তা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকায় নির্ভয়ে এই ব্যবসা বছরের পর বছর ধরে চলছে। ইতিপূর্বে নগরীর হাজিপাড়াসহ একাধিক স্থানে এ ধরনের গোপন ঢালাই কারখানা ছিল। কিন্তু পিবিডির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসব কারখানায় অভিযান চালিয়ে পিডিবির তার উদ্ধার ও সেসব অবৈধ কারখানা সিলগালা করে দেওয়ার পর সেগুলো আর চলেনি। তাই শহর থেকে কিছু দূরে গ্রামের ভেতরে একটি কারখানা স্থাপন করা হয়।

পিডিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, অতীতে এ ধরনের ঢালাই কারখানার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। শহরের বাইরে তারা এখন এসব স্থাপন করছে। আমরা কারখানাটি যাচাই-বাছাই করে দেখছি কী ধরনের তার তারা গলায়। পিডিবির তার অবৈধভাবে গলানোর প্রমাণ পেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব আমরা।

সরেজমিন মনসারটেকের ওই ঢালাই কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, চুল্লি জ্বলার কারণে আশপাশের গাছের ডাল ও পাতা পুড়ে গেছে। ঢালাই কারখানার আশপাশে মাটির ঘাসও বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে মরে গেছে। মনসারটেকের কাছে তিনটি সড়ক। একটি কালুরঘাট ও একটি আনোয়ারা চলে গেছে। দুটি সড়ককে আরেকটি সড়ক দ্বারা সংযুক্ত করা হয়েছে, যেটিতে সচরাচর যানবাহন চলাচল করে না। পিডিবির তার গলানোর এসএস অ্যালুমিনিয়াম মোল্ডিং অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ নামের কারখানাটি এই সড়কের পাশেই স্থাপন করা হয়েছে। চারদিক দিয়ে নিশ্চিদ্রভাবে ঘেরা দেওয়া হয়েছে, যাতে বাইরের কেউ কোনোভাবেই ভেতরে যেতে না পারে। তার ওপর অন্তত চারজন লোক সারাক্ষণ মূল ফটকের ভেতরে বাইরে পাহারায় থাকেন। টিনের ঘেরার মাঝে কয়েকটি ছোট ছোট ছিদ্র। তা দিয়ে সারাক্ষণ বাইরে চোখ রাখা হয়। অনুসরণ করা হয় কারা আসা-যাওয়া করছে তাদের।

আবাসিক এলাকা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এই কারখানাটি। প্রবেশ পথের বাইরে অ্যালুমিনিয়ামের বস্তু সদৃশ কিছু ট্যাবলেটের ঢাল রাখা হয়। সেখানে দায়িত্বরত কারখানার অন্যতম মালিক বকুল বলেন, এগুলো গলিয়ে পাত বানানো হয়।

কীভাবে গলানো হয় জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিলেন না। ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে কোনোভাবেই যেতে দিলেন না তিনিÑ বলেন, আরও দুজন মালিক আছেন। তারা এলেই কেবল ভেতরে যাওয়া সম্ভব।

তারেক হোসেন শাহরুখ নামে অপর মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি শহরে আছি। কারখানায় আমরা পিডিবির নিলামে পাওয়া তার ঢালাই করি। কাগজপত্র আছে। আপনি চাইলেই এসব দেখানো যাবে।

গত তিন দিন ধরে এসব কাগজ দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি তা দেখাতে পারেননি। গতকাল মঙ্গলবার বলেন, মুরাদপুর শহীদ অ্যালুমিনিয়াম আছে। সেটির মালিক হলেন একরামুল হক। মূলত তিনি যেসব তার দেন সেগুলোই গলানো হয়।

গতকাল বিকালে নগরীর মীর্জাপুল এলাকায় অবস্থিত শহীদ অ্যালুমিনিয়াম মেটাল ওয়ার্কস কার্যালয়ে গেলে একরামুল হক বলেন, আমি ওই কারখানায় কোনো তার সরবরাহ করি না। ঢাকা থেকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল পেপার আনি। সেগুলো শাহরুখের কারখানায় গলানো হয়। কাগজপত্র পরখ করে গাজীপুর থেকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল পেপার কেনার রশিদ দেখা যায়।

একরামুল হক এ ব্যাপারে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সব ব্যবসায় কিছু অন্ধকার দিক থাকে। আপনি আমার পেছনে লাগলে আমি তা গোপন করতে পারব না।

advertisement