advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পটুয়াখালী জেলা রেকর্ড রুম থেকে গায়েব বালামের পৃষ্ঠা

মুজাহিদ প্রিন্স পটুয়াখালী
১০ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ জুলাই ২০২০ ২৩:১৬
advertisement

পটুয়াখালী জেলা রেকর্ড রুম থেকে দিনের পর দিন বালামের পৃষ্ঠা গায়েব হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থের বিনিময়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রেকর্ড রুমের মতো সুরক্ষিত জায়গা থেকে এ বালামের পৃষ্ঠা গায়েব করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় না আনলে নিকট ভবিষ্যতে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তাবায়নাধীন এলাকাগুলোয় হাজার হাজার মামলা সৃষ্টির পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকা-ও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জমিজমার মালিকানাসংক্রান্ত দলিলের প্রমাণপত্র সংরক্ষিত রয়েছে পটুয়াখালী জেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমে। জনসাধারণের চাহিদার ভিত্তিতে এই অফিস থেকেই নির্ধারিত সরকারি ফির বিনিময়ে সরবরাহ করা হয়ে থাকে জমির পর্চার সার্টিফায়েড কপি। জেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের তল্লাশিকারক সুজন খন্দকার জানান, গত ৬ জুন বরগুনার আমতলী উপজেলার জনৈক ব্যক্তি ১৯৫৪ সালের একটি দলিলের নকলের কপির জন্য তার কাছে আসেন। তিনি বিধি মোতাবেক

সরকারি ফি জমা দিয়ে ওই দলিলের বালামের জন্য রেকর্ড রুমে আবেদন করেন। সুজন জানান, দুই দিন পর রেকর্ড রুম থেকে বালাম সরবরাহ করা হলে তিনি দেখতে পান, ১৪ নম্বর বালামের ৫৩ ও ৫৪ নম্বর পৃষ্ঠা দুটি নেই। তাৎক্ষণিক তিনি বিষয়টি রেকর্ড কিপার মো. মহিউদ্দীনকে জানালে তিনি সাবরেজিস্ট্রার এবং জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের প্রধান সহকারী সেলিনা বেগমকে অবহিত করেন। তারা এসে সুজনের আবেদনের কাগজটিসহ উল্লেখিত বালামটি লকারে বদ্ধ করে চলে যান। সুজন আরও জানান, তাদের নির্দেশে আমতলীর আবেদনকারীকে খবর দিয়ে পুনরায় অফিসে আনা হয়। জমি তার দখলে রয়েছে কিনা সেটা জিজ্ঞাসাবাদ করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে তাকে কোন ফয়সালা না দিয়ে বিদায় করা হয়। তার কাছ থেকে যে সরকারি ফি নেওয়া হয়েছে তা-ও ফেরত দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু বরগুনা উপজেলার আমতলী নয়, যেসব স্থানে সরকারের জমি অধিগ্রহণ চলছে সেসব জায়গা, যেমন পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা, পায়রা বন্দর সংলগ্ন ধানখালী, টিয়াখালী, বাতিয়াতলী ও লালুয়া ইউনিয়নের মতো অনেক জায়গার বালামের পৃষ্ঠা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন পটুয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মানস কান্তি দত্ত জানান, সরকার জমি অধিগ্রহণ করলে মালিকানার প্রমাণের জন্য অধিগ্রহণ শাখায় দলিল প্রদর্শন করতে হয়। দলিল প্রদর্শন করতে না পারলে অধিগ্রহণের টাকাও উত্তোলন করতে পারে না ভুক্তভোগীরা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির দালাল লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে বালামের পৃষ্ঠা গায়েব করে। পরে আবার ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলিলের নকল সরবরাহ করে। কোনো কোনো সময় জমির মালিকানাসংক্রান্ত দেওয়ানি মামলায় প্রতিপক্ষ যাতে কোনো দলিল কোর্টে উপস্থাপন করতে না পারে, তার জন্য রেকর্ড রুম থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে গায়েব করা হয় বালামের পৃষ্ঠা। আর বাইরের এই চক্রের হয়ে কাজ করে রেকর্ড রুমের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এমনকি রেকর্ড রুমে চাবিও থাকে বহিরাগতদের কাছে। আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একাধিক নির্ভরযাগ্য সূত্র জানিয়েছে, জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান সহকারী সেলিনা বেগম এ সিন্ডিকেটের প্রধান হয়ে কাজ করেন। তার কথা না শুনলে মূল্য দিতে হয় পিয়ন থেকে শুরু করে জেলা রেজিস্ট্রারকে পর্যন্ত। নিজেকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাইয়ের পুত্রবধূ পরিচয় দিয়ে তিনি এ কাজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি জানান, রেকর্ড রুম সংরক্ষিত এলাকা। সরকারি অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তির বাইরে সেখানে কারও প্রবেশ করার সুযোগ নেই। কিন্তু গত ২৬ জুন বেলা ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত দেখা যায়, মাস্টার রোলে নিয়োগ পাওয়া পিয়ন, ঝাড়–দার, ডেপুটেশনে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি, বহিরাগত মহড়ার বিনাবাধায় রেকর্ড রুমে প্রবেশ করছেন এবং বের হচ্ছে। এ বিষয়ে রেকর্ড কিপার মহিউদ্দীন আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে একাধিক সূত্র জানায়, রেকর্ড রুমের চাবি সিন্ডিকেটের প্রধানের নির্দেশে বর্তমানে গচ্ছিত থাকে রহিরাগত মোহরার জনৈক তৌফিকের কাছে।

এ বিষয়ে মোহরার তৌফিক জানান, অফিসের নির্দেশে তিনি চাবি তার জিম্মায় রেখেছেন। সরকারি অফিসের চাবি, তা-ও আবার রেকর্ড রুমের, তা তিনি রাখাতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তার কোনো দোষ নেই, তাকে জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান সহকারী সেলিনা বেগম এ চাবি রাখতে দিয়েছেন। চাবি তার কাছে থাকার পর বালামের পৃষ্ঠা গায়েবের জন্য কে দায়ীÑ এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি নিরুত্তর থাকেন।

অভিযুক্ত সেলিনা বেগম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের অফিস সহকারী। রেকর্ড রুমে তার কোনো দায়িত্ব নেই। এটা সদর সাবরেজিস্ট্রারের বিষয়। তবে সাংবাদিকদের সামনেই তিনি তৌফিককে তার কথা বলে দেওয়ার জন্য অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন।

রেকর্ড রুমে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সদর সাবরেজিস্ট্রার কার্তিক জোয়ারদার জানান, রেকর্ড রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি প্রায়ই রেকর্ড রুম পরিদর্শন করেন। বালামের পাতা গায়েব হয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, এটা নিয়ে তদন্ত চলছে। দোষী যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রেকর্ড রুমের চাবি বহিরাগতের কাছে কীভাবে পৌঁছলÑ এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননিনি তিনি।

সার্বিক বিষয় নিয়ে জেলা সাব রেজিস্ট্রার মহসিন আলম জানান, তার অফিসে কোনো সিন্ডিকেট নেই। এখন পর্যন্ত তিনি অধস্তনদের কাছ থেকে বালামের পৃষ্ঠা গায়েবের লিখিত অভিযোগ পাননি। যদি রেকর্ড রুমে এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রেকর্ড রুম খুবই সেনসিটিভ এলাকা। সেখানে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। যদি কোনো বালামের পৃষ্ঠা পাওয়া না যায়, তা হলে দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

advertisement
Evaly
advertisement