advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সাহারা খাতুন : সাদামাটায় উজ্জ্বল এক নেতা

অজয় দাশগুপ্ত
১১ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০ ০৯:০২
advertisement

এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছে। মহাখালী, গুলশান এবং বনানী এলাকায় তেমন একটা বিক্ষোভ কখনই হতো না। তবে নিয়মিত আওয়ামী লীগের একটি ছোট মিছিল আমতলী হয়ে মহাখালী রেলগেট পার হওয়ার চেষ্টা করত। সব সময় এর নেতৃত্ব দিতেন তামাটে বরণ আর একহারা গড়নের এক নারী। সাদা শাড়ির ওপর কালো কোট বলে দিত সাহারা খাতুন একজন আইনজীবী। কিন্তু পুলিশের লাঠি ছিল ভ্রƒক্ষেপহীন এবং সাহারা ছিলেন তার অবধারিত শিকার।

জলখাবার রেস্টুরেন্টে চা খেতে খেতে রায়ট ডিভিশনের এক অফিসারকে বলেছিলাম, ‘এই মহিলাকে এত পিটিয়ে আপনারা কী সুখ পান?’ তার জবাব ছিল- ‘মহিলাকে পেটাব কেন, ছেলেগুলোকে মারতে গেলেই উনি লাঠির সামনে এসে দাঁড়ান। আমরা যাই সব কন্ট্রোল করতে, ফুল তুলতে নয়। ব্যস তার কপাল ফাটে, ঠোঁট কাটে, হাত ভাঙে।’ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তখন আজকের মতো ধনী ছিল না। কিন্তু দলে সাহারা খাতুনের মতো নেতারা ছিলেন।

এখনকার আওয়ামী লীগ আর তখনের আওয়ামী লীগে আকাশ-জমিন ফারাক। রাজপথের আওয়ামী লীগ মানুষের জনগণের দল। তখন এত মুজিব কোট ছিল না। এত লীগারও নয়। সে কঠিন সময়ে একজন সাধারণ আইনজীবী হিসেবে সাহারা খাতুনের কথা আপনি ভুলতে পারেন কিন্তু সময় ভুলবে না। আমরা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে ট্রেন, বাস বা যে কোনো পথে ঢাকায় ঢুকলেই দেখতাম বড় বড় দেয়াল লিখন। তাতে লেখা ‘অ্যাড. সাহারা খাতুনকে নৌকায় ভোট দিন। কতবার যে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু হার মানেননি। যার ফলে তিনবার জয় আর জয়ী হয়ে হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সে পদ কখনো কারও জন্য সুখের কিছু হয় না। তার বেলায়ও হয়নি। তার সময়ে ঘটে গিয়েছিল দেশের ইতিহাসে এক ন্যক্কারজনক হত্যাকা-। দেশ কাঁপানো মনভাঙা সেই হত্যাকা-ে উজাড় হয়ে গিয়েছিল আমাদের সাহসী বিডিআর বাহিনীর অফিসারের দল। সে দুর্ঘটনায় হতবিহ্বল সাহারা খাতুনকে দেখেছিলাম মিডিয়ার সামনে অসঙ্কোচ কিন্তু অসহায়। তার বিডিআর সদর দপ্তরে ছুটে যাওয়া প্রশংসিত হয়েছিল দেশজুড়ে। কিন্তু ঘটনার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা আর চটজলদি অ্যাকশনের অভাব নিন্দিতও করেছিল তাকে। এর পর ঘটে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকা-। সে কলঙ্কিত ঘটনার বিচার দ্রুত হবে বলে ঘোষণা দিলেও তা না হওয়ায় তাকে পড়তে হয়েছিল সমালোচনার মুখে।

তার অব্যবহিত পরপর তিনি এসেছিলেন সিডনি। সে সময় তার সঙ্গে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়া ও আড্ডার সুযোগ হয়েছিল আমার। একসঙ্গে ডিনার করতে করতে তার সারল্য আর সহজ কথা বলায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। তিনি যেভাবে সত্য বলছিলেন আর রাখঢাক না রেখেই ঘরের কথা বলছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল আওয়ামী লীগের মতো বিশাল ও জটিল নেতাদের দলে তিনি কতদিন এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে থাকতে পারবেন। বেশিদিন লাগেনি। কিছুদিন পর তাকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী করে বদলি করা হয়। এরপর আর মন্ত্রী না থাকলেও বরাবরের মতো ছিলেন দলের পুরোভাগে। এখনকার মৌসুমি নেতাদের দেখে তাকে বোঝা যাবে না। তিনি শেখ হাসিনার হয়ে যেমন আইনি লড়াই করেছেন, তেমনি দলের বহু কর্মীর মামলাও করে দিয়েছেন বিনা পারিশ্রমিকে।

তবে আমার মতে, তার বড় অর্জন সরলতা আর সহজ জীবনের মধ্য দিয়ে লাইমলাইটে থাকা। তিনি এমন কোনো কথা বলতেন না যা চটকদার। চমকে দেওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিত্বও ছিলেন না তিনি। কেবল নিষ্ঠা আর ত্যাগ দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় দলের শীর্ষপদে থাকা কঠিন কাজ। আজকের আওয়ামী লীগে ভোটে হারার জন্য দাঁড়ায় না কেউ। আর হার বলে কিছু নেইও। নেই কোনো প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সব একতরফা। তাদের সময় রাজনীতি ছিল। মানুষ ভোট দিতে যেত। তাই তিনি হারলেও সম্মান নিয়ে রাজনীতি করতেন আর জিতলে তা ছিল গৌরবের জয়।

সাহারা খাতুনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে যুগের আরেকটি প্রদীপ নিভে গেল, যে যুগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানুষের রাজনীতি হিসেবে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে। সাহারা খাতুনের মৃত্যু আমাদের রাজনীতির জন্য যতটা ততটাই সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রকে জানিয়ে দিল, আমরা অভিভাবক শ্রেণির সাদামাটা মানুষদের আর কোনোদিন পাব না। বিদায় আপা।

 

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক

advertisement
Evaly
advertisement