advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দুঃসময়

আবু আলী
১২ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ০০:১২
advertisement

কোভিড ১৯-এর কারণে বিশ্বের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতির ওপর। এ অবস্থায় দেশের প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দুঃসময় চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি নেই। করোনার কারণে এ খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন, বিপণন, আমদানি-রপ্তানি সচল না থাকায় নতুন করে কেউ বিনিয়োগে আসছে না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বহির্বিশে^রও প্রভাব রয়েছে। ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। চীনেও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসেনি। উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুই ভারত-চীন থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। আবার উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির বাজার লাগবে। যেহেতু ইউরোপ-আমেরিকায় কোভিডের প্রভাব সহজেই যাচ্ছে না, ফলে বিনিয়োগে দুঃসময় পার করতে হচ্ছে। স্বভাবতই কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়বে। এতে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে। যদিও সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে, দিয়েছে করছাড়ও; কিন্তু উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে উন্নতি ঘটবে না। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ধানের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এখন মানুষের বেঁচে থাকার যুদ্ধ চলছে।

তাই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে আগাম উদ্যোগ নিতে হবে।

অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি ফিরিয়ে ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন, অর্থপাচার রোধ, কালো টাকাকে বিপুল হারে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করে সরকারের অর্থের সংস্থান করতে হবে। অন্যদিকে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করতে ঘোষিত প্রণোদনার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। এসব কাজ সমন্বিতভাবে সরকার করতে পারলে শত নেতিবাচক অবস্থার মধ্যেও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষক, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকরা। তারা জানান, করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উন্নত-অনুন্নত সব দেশই তাদের সক্ষমতার পুরোটা ঢেলে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশকেও টিকে থাকতে হলে সে পথই অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বের বিস্ময় আছে। কিন্তু করোনাকালের সংকটে দেশটি কীভাবে তার অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা সচল রাখে, সেটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

দি ইকোনমিস্টের গবেষণামূলক একটি প্রতিবেদনে ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে। তাতে বাংলাদেশ রয়েছে নবম শক্তিশালী অবস্থানে। ১৮ জুন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আগামী অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করেছে ৭.৫ শতাংশ। যদিও সদ্যঘোষিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নিজস্ব বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। যদিও সরকার এরই মধ্যে প্রায় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। তবে এ প্রণোদনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারে সরকারের বিপুল অর্থের প্রয়োজন। রাজস্ব আয় থেকে সরকারের বিপুল অর্থের সংস্থান কঠিন হয়ে উঠছে।

জানা গেছে, দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ১ শতাংশেরও কম। বেসরকারি বিনিয়োগ ২২-২৩ শতাংশ। আর সরকারি বিনিয়োগ ৮ শতাংশের মতো। বিদেশিদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা আপাতত বেঁচে থাকার লাইনে আছে। যেটুকু না করলেই নয়, সেটুকুই করছেন। এ জন্য সরকারকে করোনা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি হবে না।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মুনসুর বলেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানে সুখবর আসবে না। এ জন্য সরকারকে করোনা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিতে হবে।

সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক শেখ মনোয়ার হোসেন বলেন, এখন বেঁচে থাকাই মূল বিষয়। অনেকেই কাজ হারিয়ে নিজ ভূমিতে চলে যাচ্ছেন। এর মধ্যে অনেকের নিজ জমি নেই। এ জন্য হাতের কাছে যেসব পণ্য উৎপাদন করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবেÑ বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য। অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির দিকে নজর দেওয়া উচিত। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় নজর দিতে হবে। সেখানে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ আছে। দেশের জন্য বিনিয়োগ লাগবে। অর্থনীতিতে টাকা ঢোকাতে হবে। দেশে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। সরকারকে এসব ব্যাপারে আরও উদার হতে হবে। জটিলতা কমাতে হবে। মানুষের হাতে টাকা আসার কার্যক্রম সরকারকে নিতে হবে। অর্থনীতি যাতে বসে না যায়, বিনিয়োগ যেন থমকে না যায়। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আমলাতন্ত্র কমাতে হবে। বিনিয়োগকে অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। না হলে মানুষ কাজ পাবে না। সরকারকে তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা দীর্ঘ সময়ে অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে নারীদের আরও বেশি কাজে সম্পৃক্ত করা, তাদের গৃহস্থালী কাজকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আওতায় আনাও সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। চলমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে বেশি বেশি কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করার চাপ আছে সরকারের সামনে। রয়েছে বিভিন্ন খাতকে চাঙ্গা করার চ্যালেঞ্জও। শিল্প ও সেবা খাত চাঙ্গা না থাকলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা আসার আশঙ্কা আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের আঘাত এসেছে। এ জন্য এ খাতের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে আমাদের শ্রমবাজার ধরে রাখতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন তাদের কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেদিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

advertisement