advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

টানা বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে দফায় দফায় বন্যা

আমাদের সময় ডেস্ক
১২ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ০০:১২
advertisement

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে আরও বেড়ে গেছে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি। এর ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে কয়েক দিনের বন্যার ধকল কাটিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষগুলো ফের পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নোভেল করোনা ভাইরাসের এ মহামারীর মধ্যে দফায় দফায় বন্যা, অতিবৃষ্টি ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। সেই সঙ্গে পানিতে ডুবে যাচ্ছে ফসলি জমিও। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদী পাড়ের মানুষদের। অনেক এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ। এ যেনÑ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

কুড়িগ্রামে চার দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢলে ২য় দফায় আবারও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শুক্রবার মধ্যরাতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার। যা বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপরে। তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি প্রবাহ বিকাল থেকে বেড়েছে। ব্যারাজ রক্ষার্থে সব জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীতে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। ফলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা করছে পাউবো। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে যমুনা পাড়ে বসবাসরত ৫টি উপজেলার মানুষ।

এদিকে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ জেলার ১১ উপজেলায় আবারও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে দুই দফা বন্যার কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দি লাখো মানুষ। গতকাল শনিবার বেলা তিনটায় সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বিপদসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সড়ক দিয়ে পানি উপচে পড়ায় সুনামগঞ্জ-ছাতক, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ,

সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর সড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া জামালপুরে আবারও বেড়েছে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি। গাইবান্ধার সুুন্দরগঞ্জে দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিয়েছে। নিরুপায় হয়ে চরাঞ্চলের মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে উঁচু স্থানে। ওপর থেকে বৃষ্টির পানি, চারদিকে থইথই পানিÑ সব মিলিয়ে খুবই নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়েছেন তারা। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা আরও জানানÑ

কুড়িগ্রাম আবহাওয়া অধিদপ্তরের ইনচার্জ সুবল চন্দ্র সরকার জানান, গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪২ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এসডি মাহমুদ হাসান জানান, গত বুধবার রাত থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত দিন-রাত থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির ফলে জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, যমুনার পানি বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে। এই নদের পানি বিপদসীমার ১৩৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী দুই এক দিনের মধ্যে যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। তাই জামালপুরে দ্বিতীয় দফায় বন্যা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে পানি বাড়ার কারণে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা-বড়খাতার তালেব মোড়ের বাইপাস সড়কটি ওপর দিয়ে পানি চলাচল করছে। যে কোনো মুহূর্তে বাইপাস সড়কটি ভেঙে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন তীরবর্তী মানুষরা।

স্থানীয়রা জানান, এ নিয়ে চতুর্থবার তিস্তার পানি বৃদ্ধি হয়ে ফের নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে। ফলে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, তুষভা-ারের আমিনগঞ্জ, কাকিনা, পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, পলাশী, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকু- ইউনিয়নের তিস্তা পাড়ের নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিয়েছে। প্রথম দফার বন্যা শেষ না হতেই দ্বিতীয় দফা বন্যার আগমনে তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে থেমে-থেমে বৃষ্টির সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে চরাঞ্চলের বসতবাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এতে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে বন্যার্তরা।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ৭২ ঘণ্টা আরও পানি বাড়তে পারে। এদিকে শুক্রবার রাতে টানা বৃষ্টিতে সিরাজগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কাঁটাখালীর ওপর বাহিরগোলা নামক বাজারে নির্মিত সেতুর সাইড ধসে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে পুরো বাজার এলাকা হুমকিতে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান জানান, কয়েকদিন ধরে সুনামগঞ্জে ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। একই সঙ্গে উজান থেকে ব্যাপক পরিমাণে ঢলের পানি নামছে। এ কারণে নদী ও হাওরে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।

জেলার প্রায় সব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি হাওরাঞ্চলেও বন্যা দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সহকারী কমিশনার) জহিরুল আলম জানান, বন্যার কারণে জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭০ হাজার ৩৭০টি পরিবার। ২৫৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে ১৩৪৪টি পরিবারের ৫২৭৬ জন মানুষ।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, যেসব এলাকায় বন্যা হয়েছে সেসব এলাকার বন্যার্তদের আশ্রয়ের জন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদানের জন্য নগদ টাকা, চাল ও শুকনো খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে প্রায় দুই সপ্তাহর ব্যবধানে আবারও পানিবন্দি হয়ে ছাতকের ৪ লক্ষাধিক মানুষ। শহরের প্রধান সড়কসহ অলি-গলি বানের পানি প্রবেশ করেছে। বন্যায় তলিয়ে গেছে উপজেলার বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও মৎস্য খামার। উপজেলা পরিষদ ও পৌর কার্যালয়ের আঙ্গিনায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। শুক্রবার রাত থেকে উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

advertisement