advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গতি ফেরেনি ব্যবসা-বাণিজ্যে

রেজাউল রেজা
১২ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ০৯:০৪
advertisement

মহামারী করোনা ভাইরাসের ছোবল ও বিশ্ব অর্থনীতির ছন্দপতনের ধকলে চলতি বছরের অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো গতি ফেরেনি দেশের অর্থনীতিতে। দীর্ঘ সময় বিরতির পর আবার চালু হতে শুরু করেছে সব কিছু। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে আগের মতোই। পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ সব ঠিকাঠাক, তবু ক্রেতা ও বিক্রি কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এতে হতাশ সব পর্র্যায়ের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। আগামী দিনগুলো নিয়েও বাড়ছে শঙ্কা।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, মহামারীর এ সময়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা কঠিন সময় পার করছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী সবারই এখন একই অবস্থা। দীর্ঘ সময় দোকান ও ব্যবসা বন্ধ থাকায় বড় লোকসাানে রয়েছেন তারা। সাধারণ ছুটি শেষে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে নতুন উদ্যমে দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমল খুলেছে; কিন্তু স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি। কারণ ক্রেতা ও বিক্রি তলানিতে ঠেকেছে।

তিনি আরও বলেন, লোকশানের মাঝে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পুঁজি হারিয়েছেন অনেকেই। ঋণের বোঝাও বাড়ছে। গত আড়াই মাসে সারা দেশে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ক্ষুদ্র ও অণু ব্যবসায়ী তাদের পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। রাজধানীতে এ সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি। ব্যবসা এমন মন্দা কাটিয়ে উঠতে আরও অনেকটা সময় লেগে যাবে। ততদিন ব্যবসা টিকিয়ে রাখাটাই এখন ব্যবসায়ীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ ও ঈদকে ঘিরে দেশজুড়ে বড় অঙ্কের বাণিজ্য থাকে। এবার সেটিও খুইয়েছেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। একইভাবে পহেলা বৈশাখেও বিপুল অর্থের বেচাকেনা হয়ে থাকে। এবার এর শিকিভাগও হয়নি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘করোনার মধ্যে ক্রেতা সমাগম কম হবে, বিক্রি কম থাকবে’Ñ এমনটা ধরে নিয়েই দোকান খোলা হয়েছে। কিন্তু তার পরও যতটুকু আশা করা হয়েছিল, তার থেকেও ৩০-৪০ শতাংশ কম ক্রেতা পাচ্ছেন তারা। এতে ব্যবসা পরিচালনা খরচটাও উঠছে না অনেকের।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার নিউ সুপার মার্কেট দক্ষিণ বণিক সমিতির সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ শহী বলেন, মার্কেট পরিচালনায় খরচ রয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। তার ওপর এবার স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুতি বাবদ বাড়তি খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। শুধু স্প্রে গেট ও টানেল তৈরি করতেই খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকার মতো। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাড়তি কর্মচারীও নিয়োগ দিতে হয়েছে। অথচ বেচাকেনাই নেই।

করোনা পরিস্থিতিতে মুদি দোকান, হাটবাজার, হার্ডওয়ার, মিষ্টান্ন, বেকারি ও কনফেকশনারি, ওষুধ ও মোবাইল রিচার্জের দোকানের মতো বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি দোকানগুলোর বাণিজ্যেও ভাটা লেগেছে। দোকানপাট খোলা থাকলেও সেখানেও বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের থেকে অনেক কম বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনোভেশনের এক জরিপ বলছে, ব্যবসার এমন মন্দা দশা আরও দুই মাস দীর্ঘায়িত হলে এসব ব্যবসায়ীর ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে বাড়বে। এ সময় ব্যবসার সক্ষমতা হারাবেন ৮৬ শতাংশ দোকানি। দেশের ছোট পরিসরের মুদি ও টেলিকম ব্যবসায়ী দোকানিদের ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো ঋণ বা সঞ্চয়ের স্বল্প পুঁজি।

আয় না থাকলেও ব্যবসা ধরে রাখতে গিয়ে পরিচালনা ব্যয়সহ নানা ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে দোকানিদের। বন্ধ ও আংশিক খোলা দোকানগুলোয় ক্রেতার সংখ্যা কম থাকায় একজন ব্যবসায়ী প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৮৯৯ টাকা করে ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকার হার্ডওয়্যারের দোকান ব্যবসায়ী মো. মুরাদ হোসেন বলেন, করেনায় লম্বা সময় দোকান বন্ধ থাকায় জমার টাকা ভেঙে সংসার চালাতে হয়েছে। বাসা ভাড়া, বাজার আর ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ দিতে হয়েছে। এখন ব্যবসার পুঁজির টাকাটাও নেই বললে চলে। একে বিক্রি কম, তার ওপর দোকান খোলা রাখার সময় সীমিত। সব মিলিয়ে দৈনিক এ হাজার টাকাও বিক্রি নেই দোকানে।

এদিকে করোনায় ধুঁকছে রাজধানীর বেকারি ব্যবসা। সাধারণ ছুটি শেষে সীমিত পরিসরে কিছু সংখ্যক কারখানা খুলতে শুরু করলেও লোকসানের ভারে বন্ধ রয়েছে রাজধানীর প্রায় নব্বই ভাগ কারখানা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, করোনার ধাক্কায় রাজধানীতে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবসা কমে গেছে। এতে এ খাতে মাসে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, রাজধানীজুড়ে এক হাজার ২০০ থেকে ২৫০টি বেকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সমিতির তালিকাভুক্ত বেকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক হাজার ৬০টি। এর মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে ১১৪টি প্রতিষ্ঠান। করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসায় লোকসানের ফলে বন্ধ রয়েছে বাকি ৯৪৬টি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ প্রায় নব্বই ভাগ বেকারি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

অলস সময় কাটাচ্ছেন নরসুন্দররাও। মানুষের শ্রী সুন্দর করার কাজ যাদের, তাদের কাঁচিও চলছে না এখন। ভাইরাসের আতঙ্কে মানুষ কম আসছেন সেলুনগুলোয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, আগের থেকে ব্যবসা আশি ভাগ কমেছে।

বাসাবো এলাকার সাথী সেলুনের ব্যবসায়ী মো. সোহেল আরমান বলেন, করোনায় দুই মাস দোকান বন্ধ থাকলেও দোকান ভাড়াসহ অনেক বকেয়া জমেছে। সব মিলিয়ে অনেকেই দোকান বন্ধ করে দিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ ও কাঁচাবাজার খোলা থাকলেও ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। যাত্রাবারীর শহীদ ফারুক সড়কে সেতু ফার্মেসির ব্যবসায়ী মো. এম আর রাজু খান বলেন, সবার ধারণা এসময় ওষুধের ব্যবসা রমরমা। কিন্তু এ সময় ওষুধের ব্যবসাও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। এটা ঠিক যে মাস্ক, স্যানিটাইজারের বিক্রি বেড়েছে। কিন্তু এতে আর কয় টাকা আয় হয়। করোনার কারণে হাসপাতালে অন্য রোগীর সংখ্যাও কম। অন্যান্য ওষুধের বিক্রিও অনেক কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিক্রি অর্ধেকে নেমে গেছে।

এদিকে কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতি তেমন একটা নেই। কিন্তু ক্রেতা অনেক কম। মাংস ও মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনায় মানুষের পকেটে টাকা কম। তাই মাছ-মাংসও কিনছেন কম। মুদি দোকানগুলোয় খোঁজ নিয়েও জানা গেছে একই কথা। নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় পণ্য হওয়ায় বিক্রি চলমান থাকলেও স্বাভাবিক যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক কম বলে জানান রাজধানীর মুদি দোকনদাররা।

এদিকে অনলাইনে বিক্রি বাড়লেও তা কেবল ওষুধ ও মুদি পণ্যে বেলায়ই হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, করোনায় ওষুধ ও মুদি পণ্যের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে ঠিক, কিন্তু ফ্যাশন, প্রসাধনী, হ্যান্ডিক্র্যাফটসহ বিভিন্ন বিলাসি পণ্যের বিক্রি তলানিতে ঠেকেছে। গ্রাহক বাড়লেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সার্বিক বিক্রি কমে গেছে অনলাইনে।

সামনে কোরবানির ঈদ। রোজার ঈদের মতো এবার ঈদও পানসে যাবে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। তার পরও আশায় বুক বেঁধে আছেন ব্যবসায়ীরা। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন তো তারা?

এদিকে কোরবানি ঘিরে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন গরু ব্যবসায়ী, ব্যাপারী ও খামারিরা। এবার কোরবানিযোগ্য পশুর ঘাটতি নেই। তবে বিক্রি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দাম না পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তারা। অন্যদিকে ব্যবসায় ক্ষতি অনুমান করে এবার আগে থেকেই মৌসুমি গরু খামারি ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি মো. ইমরান হোসেন বলেন, প্রতিবছর ঈদুল ফিতরে ঈদুল আজহার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গরু বিক্রি হয়। অন্যান্য বছরে রমজান ও ঈদুল ফিতর মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ গরু বেচা-কেনা হয়। সেখানে করোনার কারণে বদলে গেছে স্বাভাবিক চিত্র। এ বছর বেচাকেনা হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন লাখের মতো। এই অবিক্রীত গরু এবার কোরবানির পশুর সঙ্গে যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে গত তিন মাসে ১৫ থেকে ২০ লাখ গরু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এবার হাটে খামারিরা পশুর দাম পাবেন কিনা তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।

 

advertisement
Evaly
advertisement