advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ব্যাংকের সাবধানী পদক্ষেপে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি

হারুন-অর-রশিদ
১২ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ০০:১৩
advertisement

করোনার সংক্রমণে বিপর্যস্ত মানবস্বাস্থ্য, জীবন ও জীবিকা। মানবজীবনকে রক্ষার জন্য গৃহীত পদক্ষেপে ধস নেমেছে অর্থনীতিতে। দেশের অর্থনীতির মূলশক্তি বেসরকারি খাত একেবারে ভেঙে পড়েছে। বিশে^র উন্নত, উন্নয়নশীল সব দেশই করোনার ছোবল থেকে অর্থনীতিকে রক্ষায় বাজেটারি এবং মানিটারি পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে। এ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় এককভাবে আস্থা রাখা হয়েছে ব্যাংক খাতের ওপর। কিন্তু অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব পাওয়া ব্যাংক নিজেই এখন নড়বড়ে। ভবিষ্যতে সংকটের কথা ভেবে সাবধানী ভঙ্গিমায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। নানা সংকটে পড়ে প্রণোদনা ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। আবার করোনায় মানুষের আয় কমে যাওয়া আমানত কমে যাচ্ছে। প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে তা সঠিকভাবে আদায় হচ্ছে না। ফলে আয় কমে গিয়ে মুনাফা ব্যাপকহারে কমার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। টিকে থাকতে এখন কর্মকর্তাদের বেতন কমানো শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ৫টি ব্যাংক বেতন কমিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে দেশে কার্যরত ব্যাংকের সংখ্যা ৫৯টি। আরও ৩টি ব্যাংক বাজারে আসার অপেক্ষায়। কিন্তু করোনার সংক্রমণ ব্যাংক খাতকে এলোমেলা করে দিয়েছে। এপ্রিল শেষে আমানত প্রায় ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা কমে গেছে। জানুয়ারিতে মোট আমানত ছিল ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর পর তিন মাসে উত্তোলনের পর দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। এপ্রিলে যে ঋণ বিতরণ হয়েছে তা স্মরণকালের মধ্যে সর্বনি¤œ। ব্যাংক খাতের সংকট অন্য খাতের মতো এখনো তীব্র হয়নি। তবে সংকট আসন্ন। এ জন্য ব্যাংকের মালিকরা কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন ১৫ শতাংশ কমানো, বোনাস, ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতি বন্ধসহ ১৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ওয়ান, আল আরাফাহ সিটি ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক বেতন কমিয়ে দিয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলো কমানোর জন্য কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তবে বেশ কয়েকটি ব্যাংক বেতন না কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।

বিএবি চেয়ারম্যান এবং এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, করোনার কারণে আমানত কমে যাচ্ছে। ঋণের টাকা আদায় হচ্ছে না। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে সেটিও নিশ্চিত নয়। এ মুহূর্তে কোনো ব্যাংকারের চাকরি চলে যাক এটি ঠিক হবে না। তাই খরচ কমানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া

হচ্ছে। ব্যাংকের শক্তিশালী অবস্থা ফিরে এলে সব কিছু স্বাভাবিক করা যাবে।

করোনার সংকট যেমন ব্যাংকগুলোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে অন্যদিকে সরকার ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সরকার ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর বেশির ভাগ অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তবে ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পাচ্ছে না। মাত্র ৯ হাজার কোটি প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ দিয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণও অনেক কম। রেকর্ড সর্বনি¤œ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণ বিতরণে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলো প্রবল চাপে রয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেট যেভাবে করা হয়েছে সে জন্য চাপ আরও বাড়বে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট রয়েছে। এ সংকটের মধ্যে ব্যাংক নতুন করে ঋণ দিতে পারবে কিনা সেটিই শঙ্কার বিষয়।

এদিকে করোনার পরিস্থিতিতে গ্রাহকরা ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছেন না। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেউ ঋণের টাকা ফেরত না দিলে তাকে খেলাপি না করার নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া এপ্রিল ও মে মাসের সুদ কিছুটা স্থগিত এবং কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন আমাদের সময়কে বলেন, ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করায় আগের তুলনায় কমে গেছে। এখন ক্রেটিড কার্ড, ভোক্তা ঋণ ও এসএমইসহ অন্যান্য ঋণের আদায় কমে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়ে গেছে। আগে ১০০ টাকা আয় করতে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ব্যয় হতো। এখন এই ব্যয় ৬৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ক্রমশ এ ব্যয় বাড়ছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা অনেক খারাপ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।

এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে কোনো ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আগে খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা থাকলেও এবার এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। আরও ৫৪ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ছাড় দিয়ে পুনঃতফসিল করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর আগে খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করা গেলে করোনা সংকট অনেক সহজেই মোকাবিলা করা যেত। কিন্তু বাজেটে ছাড়ের উদ্যোগ ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করা হলেও কঠোরতার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাত নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে। সুশাসনের অভাবে ঋণের টাকা প্রভাবশালীরা হাতিয়ে নিয়েছেন। বারবার সুযোগ দেওয়ায় ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আগে থেকেই ব্যাংকের অবস্থা ভঙ্গুর। করোনা সেই অবস্থাকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে এবং প্রণোদনা ঋণ দিতে সরকার যেভাবে ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখেছে ব্যাংকগুলোর সেই সক্ষমতা নেই।

advertisement
Evaly
advertisement