advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কোরবানির পশুর হাট ও আমাদের জীবনযাপন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
১২ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ০০:১৩
advertisement

করোনায় সারাবিশ্ব আক্রান্ত। দেশে দেশে মানুষ এখন করোনার সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করে চলছেন। ছয় মাস হয়ে গেল পৃথিবীর ২১৩টি দেশে দেড় কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত, লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। কেউ ভাবতে পারেননি অদৃশ্য এক-একটি জীবাণু মানুষকে এভাবে ঘরবন্দি করে ফেলবে। পৃথিবীর সর্বত্র এখন করোনার আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখনো কাজে ফিরে যেতে পারেননি শ্রমজীবী মানুষ, মিল-কলকারখানা, কৃষি, মৎস্য উৎপাদনসহ সব ধরনের জীবিকার সঙ্গে জড়িত সব মানুষ পুরোপুরিভাবে কাজে যুক্ত হওয়ার সাহস খুঁজে পাচ্ছেন না। বছরের শুরু থেকেই আক্রান্ত দেশের মানুষরা লকডাউনে থেকেছেন। এখনো পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলের মানুষ কখনো ঘরবন্দি, কখনো সাময়িক মুক্তি, আবার করোনার আক্রমণে ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। এমনকি দৈনন্দিন উপাসনাও ঘরে বসে সারতে হচ্ছে। পৃথিবীর সর্বত্র উপাসনালয়গুলো নানা বিধিবিধানে আংশিকভাবে খোলা হচ্ছে, ধর্মীয় উৎসব কাটছাঁট হয়ে গেছে। মুসলমানরা এবার ঈদুল ফিতর আগের মতো পালন করতে পারেননি। পবিত্র মক্কা শরিফও এবার বন্ধ ছিল। সামনে ঈদুল আজহা, এবারও খুব সীমিত আকারে মক্কায় হজ পালিত হতে যাচ্ছে। এতে বাইরের দেশের কোনো নাগরিক মক্কায় হজ পালনের জন্য আসতে পারছেন না।

আমাদের দেশ থেকেও কেউ এবার হজে যেতে পারছেন না। কারণ এখনো সৌদি আরবে করোনায় প্রতিদিন অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রায় এবার ঈদুল আজহা নানা রকম স্বাস্থ্যবিধির মধ্যে পালিত হতে যাচ্ছে। আমাদের দেশে কোরবানির ঈদটি গত কয়েক দশকে ক্রমেই ব্যাপকভাবে উদযাপিত হচ্ছিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল কোরবানির অর্থনীতি। বিপুলসংখ্যক মানুষ গরু-ছাগল পালন করার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি সুযোগ পেয়েছিলেন। একসময় গরু-ছাগলের অভাবে ভারতীয় গরু-ছাগল কোরবানির আগে বাজার সয়লাভ করে ফেলা হতো। কিন্তু গত এক-দুই দশকে সেই স্থান দেশীয় খামারিরা পূরণ করে ফেলেছেন। তা ছাড়া দেশে গত এক-দেড় দশকে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার বেশ উন্নতি ঘটেছে। ফলে হজে গমন এবং কোরবানিতে অংশ নেওয়ার মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এই চাহিদা পূরণের জন্যই দেশীয় খামারিরা কোরবানি উপলক্ষে গরু-ছাগল ইত্যাদি বিশেষভাবে লালন-পালন করতেন। কিন্তু এবার করোনার কারণে একদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জটিলতা, অন্যদিকে করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, মানুষের অর্থনৈতিক সংকট কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোরবানির আয়োজনটি কেমন হবে, তা নিয়ে সব মহলের মধ্যেই গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা বিরাজ করছে। যারা খামারি তারা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে গরু-ছাগল কোরবানির জন্য প্রস্তুত করছিলেন। কিন্তু করোনার এই দুর্যোগে তাদের পক্ষে আগের মতো কোরবানির গরু-ছাগল নিয়ে চাহিদামতো জায়গায় যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সুতরাং খামারিরা তাদের গরু-ছাগল নিয়ে বিপাকে আছেন। অন্যদিকে যারা আগে বিশেষভাবে কোরবানির পশু কেনাকাটায় উৎসাহী থাকতেন, তাদের বড় অংশই এবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সমস্যা থেকে গরু-ছাগল ক্রয়, কোরবানি দেওয়া, মাংস বণ্টন করা ইত্যাদিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্ধে আছেন। এমনিতেই বাংলাদেশে এখন করোনা সংক্রমণ অনেকটাই বিস্তৃত। সে কারণে বেশিরভাগ মানুষই করোনা ভীতিতে আছেন। ঈদের নামাজ, পশু কোরবানি এবং মাংস বিতরণের কাজে যুক্ত হওয়া মানুষের মধ্যে করোনার সংক্রমণ থাকলে সেটি আরও দ্রুত সংক্রমিত হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে প্রকাশ করেছেন। ফলে কোরবানির আয়োজনটি শেষ পর্যন্ত খুব সীমিত আকারেই হতে পারে বলে বেশিরভাগ মানুষ মনে করছেন। সেটি ধরে রাখা গেলে বর্তমানের করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি আগস্ট মাসের দ্বিগুণ-তিন গুণ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে না। বেশিরভাগ মানুষই গত ঈদুল ফিতরের অভিজ্ঞতা থেকে মনে করছেন যে, ঈদের ধর্মীয় অংশটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে পালন করার মধ্যেই সীমিত থাকার ব্যাপারে যতœবান থাকার মাধ্যমে বেঁচে থাকার জন্য জরুরি। বাকি আনুষ্ঠানিকতাগুলো যথাসম্ভব সীমিত আকারে করার কথাই বেশিরভাগ মানুষ ভাবছেন। কেননা করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশ চার মাসের অধিক সময় ধরে বেশ একটি কঠিন সময় পার করছে। এরই মধ্যে মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই থমকে আছে, বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে জীবন ও জীবিকার ভীতি অনেকের মধ্যেই এখন বেশ ব্যাপকতর অবস্থায় রয়েছে। তাদের পক্ষে আগামী ঈদ-পরবর্তী সময়ে আবার করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে দেওয়ার বিষয়টি হজম করা সম্ভব নাও হতে পারে। সে কারণে এক ধরনের আত্মসচেতনতা অনেকের মধ্যেই বিরাজ করছে। এটি বাস্তবে প্রতিফলিত হলে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে ঈদুল আজহা পালন শেষে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হবে না। তবে এর ব্যত্যয় ঘটলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সবার জন্যই টিকে থাকা বেশ কঠিন হতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারেÑ প্রতিবছর এই ঈদ উপলক্ষে খামারিরা যেসব গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ বাজারে বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত করছিলেন, কোরবানির বাজার যদি সীমিত হয়ে যায়, তা হলে খামারিরা হয়তো বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। এ সমস্যাটি সমাধানের একটি পথ রয়েছে। আমাদের দেশে মাংসের চাহিদা সারাবছরেই যথেষ্ট পরিমাণ থাকে। কিন্তু কসাই ও মাংস সরবরাহকারীরা সিন্ডিকেট ঘটনের মাধ্যমে ভোক্তাদের উন্নত জাতের গরু, ছাগল বা পশুর মাংস সরবরাহ করছে না, কিন্তু মাংসের যে দাম বাজারে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখে, তাতে ভোক্তাদের পক্ষে চাহিদামতো মাংস কেনা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ খামারিদের যেসব পালিত গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া কোরবানির বাজারে আনা হয়, তারা খুব যে বেশি মূল্যে সেগুলো বিক্রি করতে পারেন, সেটি প্রতিবছরই দেখা যায় না। কিছু খামারি হয়তো মোটামুটি ভালো লাভ করেন। কিন্তু অনেক গরু, ছাগল ও মহিষের খামারি নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কোরবানির বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাদের কান্নার ছবি গণমাধ্যমে তুলেও ধরা হয়। কোরবানির হাট নিয়ে অনেক ধরনের ফড়িয়া দালাল, চাঁদাবাজ, এলাকার মাস্তান চক্র মুখিয়ে থাকে। এর ফলে প্রকৃত খামারিরা অনেক সময়ই কাক্সিক্ষত মূল্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। এই ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবছর আমাদের কোরবানির হাট কোথাও কোথাও রমরমা হয়, কোথাও কোথাও নানা বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এবার আসা করা যাচ্ছে সে রকম পরিস্থিতি নাও হতে পারে। তবে খামারিরা আতঙ্কিত না হয়ে সব পশু কোরবানির হাটে টেনে ফাঁদে পা না দিলে তারাই হয়তো লাভবান হতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোরবানি-পরবর্তী সময়ের দেশের বড়-ছোট শহর এবং গ্রামগঞ্জেও মানুষের দৈনন্দিন মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য তারা তাদের পশুগুলোকে বিক্রির একটি পরিকল্পনা করতে পারেন। এ জন্য সরকারের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সব ধরনের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে খামারিদের উৎপাদিত পশু আগামী দিনগুলোয় বাজারে নির্বিঘেœ সরবরাহ করার ব্যবস্থা করলে একদিকে খামারিরা লাভবান হবেন, অন্যদিকে দেশের মানুষের মাংসের চাহিদা বছরব্যাপী স্থিতিশীলভাবে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। বিষয়টি অর্থনৈতিক দৃষ্টি থেকেও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল ভেবে দেখতে পারে। এর জন্য সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা এখনই প্রণয়ন প্রয়োজন, যা সম্পর্কে খামারিরা আগে থেকে অবহিত থাকবেন। তা হলে তাদের মধ্যে হতাশা থেকে হুড়োহুড়ি কোরবানির হাটে খামারিদের বিপর্যয় সৃষ্টির অবতারণা হবে না।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : শিক্ষাবিদ ও কলাম লেখককরোনায় সারাবিশ্ব আক্রান্ত। দেশে দেশে মানুষ এখন করোনার সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করে চলছেন। ছয় মাস হয়ে গেল পৃথিবীর ২১৩টি দেশে দেড় কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত, লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। কেউ ভাবতে পারেননি অদৃশ্য এক-একটি জীবাণু মানুষকে এভাবে ঘরবন্দি করে ফেলবে। পৃথিবীর সর্বত্র এখন করোনার আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখনো কাজে ফিরে যেতে পারেননি শ্রমজীবী মানুষ, মিল-কলকারখানা, কৃষি, মৎস্য উৎপাদনসহ সব ধরনের জীবিকার সঙ্গে জড়িত সব মানুষ পুরোপুরিভাবে কাজে যুক্ত হওয়ার সাহস খুঁজে পাচ্ছেন না। বছরের শুরু থেকেই আক্রান্ত দেশের মানুষরা লকডাউনে থেকেছেন। এখনো পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলের মানুষ কখনো ঘরবন্দি, কখনো সাময়িক মুক্তি, আবার করোনার আক্রমণে ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। এমনকি দৈনন্দিন উপাসনাও ঘরে বসে সারতে হচ্ছে। পৃথিবীর সর্বত্র উপাসনালয়গুলো নানা বিধিবিধানে আংশিকভাবে খোলা হচ্ছে, ধর্মীয় উৎসব কাটছাঁট হয়ে গেছে। মুসলমানরা এবার ঈদুল ফিতর আগের মতো পালন করতে পারেননি। পবিত্র মক্কা শরিফও এবার বন্ধ ছিল। সামনে ঈদুল আজহা, এবারও খুব সীমিত আকারে মক্কায় হজ পালিত হতে যাচ্ছে। এতে বাইরের দেশের কোনো নাগরিক মক্কায় হজ পালনের জন্য আসতে পারছেন না।

আমাদের দেশ থেকেও কেউ এবার হজে যেতে পারছেন না। কারণ এখনো সৌদি আরবে করোনায় প্রতিদিন অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রায় এবার ঈদুল আজহা নানা রকম স্বাস্থ্যবিধির মধ্যে পালিত হতে যাচ্ছে। আমাদের দেশে কোরবানির ঈদটি গত কয়েক দশকে ক্রমেই ব্যাপকভাবে উদযাপিত হচ্ছিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল কোরবানির অর্থনীতি। বিপুলসংখ্যক মানুষ গরু-ছাগল পালন করার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি সুযোগ পেয়েছিলেন। একসময় গরু-ছাগলের অভাবে ভারতীয় গরু-ছাগল কোরবানির আগে বাজার সয়লাভ করে ফেলা হতো। কিন্তু গত এক-দুই দশকে সেই স্থান দেশীয় খামারিরা পূরণ করে ফেলেছেন। তা ছাড়া দেশে গত এক-দেড় দশকে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার বেশ উন্নতি ঘটেছে। ফলে হজে গমন এবং কোরবানিতে অংশ নেওয়ার মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এই চাহিদা পূরণের জন্যই দেশীয় খামারিরা কোরবানি উপলক্ষে গরু-ছাগল ইত্যাদি বিশেষভাবে লালন-পালন করতেন। কিন্তু এবার করোনার কারণে একদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জটিলতা, অন্যদিকে করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, মানুষের অর্থনৈতিক সংকট কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোরবানির আয়োজনটি কেমন হবে, তা নিয়ে সব মহলের মধ্যেই গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা বিরাজ করছে। যারা খামারি তারা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে গরু-ছাগল কোরবানির জন্য প্রস্তুত করছিলেন। কিন্তু করোনার এই দুর্যোগে তাদের পক্ষে আগের মতো কোরবানির গরু-ছাগল নিয়ে চাহিদামতো জায়গায় যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সুতরাং খামারিরা তাদের গরু-ছাগল নিয়ে বিপাকে আছেন। অন্যদিকে যারা আগে বিশেষভাবে কোরবানির পশু কেনাকাটায় উৎসাহী থাকতেন, তাদের বড় অংশই এবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সমস্যা থেকে গরু-ছাগল ক্রয়, কোরবানি দেওয়া, মাংস বণ্টন করা ইত্যাদিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্ধে আছেন। এমনিতেই বাংলাদেশে এখন করোনা সংক্রমণ অনেকটাই বিস্তৃত। সে কারণে বেশিরভাগ মানুষই করোনা ভীতিতে আছেন। ঈদের নামাজ, পশু কোরবানি এবং মাংস বিতরণের কাজে যুক্ত হওয়া মানুষের মধ্যে করোনার সংক্রমণ থাকলে সেটি আরও দ্রুত সংক্রমিত হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে প্রকাশ করেছেন। ফলে কোরবানির আয়োজনটি শেষ পর্যন্ত খুব সীমিত আকারেই হতে পারে বলে বেশিরভাগ মানুষ মনে করছেন। সেটি ধরে রাখা গেলে বর্তমানের করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি আগস্ট মাসের দ্বিগুণ-তিন গুণ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে না। বেশিরভাগ মানুষই গত ঈদুল ফিতরের অভিজ্ঞতা থেকে মনে করছেন যে, ঈদের ধর্মীয় অংশটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে পালন করার মধ্যেই সীমিত থাকার ব্যাপারে যতœবান থাকার মাধ্যমে বেঁচে থাকার জন্য জরুরি। বাকি আনুষ্ঠানিকতাগুলো যথাসম্ভব সীমিত আকারে করার কথাই বেশিরভাগ মানুষ ভাবছেন। কেননা করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশ চার মাসের অধিক সময় ধরে বেশ একটি কঠিন সময় পার করছে। এরই মধ্যে মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই থমকে আছে, বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে জীবন ও জীবিকার ভীতি অনেকের মধ্যেই এখন বেশ ব্যাপকতর অবস্থায় রয়েছে। তাদের পক্ষে আগামী ঈদ-পরবর্তী সময়ে আবার করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে দেওয়ার বিষয়টি হজম করা সম্ভব নাও হতে পারে। সে কারণে এক ধরনের আত্মসচেতনতা অনেকের মধ্যেই বিরাজ করছে। এটি বাস্তবে প্রতিফলিত হলে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে ঈদুল আজহা পালন শেষে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হবে না। তবে এর ব্যত্যয় ঘটলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সবার জন্যই টিকে থাকা বেশ কঠিন হতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারেÑ প্রতিবছর এই ঈদ উপলক্ষে খামারিরা যেসব গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ বাজারে বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত করছিলেন, কোরবানির বাজার যদি সীমিত হয়ে যায়, তা হলে খামারিরা হয়তো বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। এ সমস্যাটি সমাধানের একটি পথ রয়েছে। আমাদের দেশে মাংসের চাহিদা সারাবছরেই যথেষ্ট পরিমাণ থাকে। কিন্তু কসাই ও মাংস সরবরাহকারীরা সিন্ডিকেট ঘটনের মাধ্যমে ভোক্তাদের উন্নত জাতের গরু, ছাগল বা পশুর মাংস সরবরাহ করছে না, কিন্তু মাংসের যে দাম বাজারে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখে, তাতে ভোক্তাদের পক্ষে চাহিদামতো মাংস কেনা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ খামারিদের যেসব পালিত গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া কোরবানির বাজারে আনা হয়, তারা খুব যে বেশি মূল্যে সেগুলো বিক্রি করতে পারেন, সেটি প্রতিবছরই দেখা যায় না। কিছু খামারি হয়তো মোটামুটি ভালো লাভ করেন। কিন্তু অনেক গরু, ছাগল ও মহিষের খামারি নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কোরবানির বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাদের কান্নার ছবি গণমাধ্যমে তুলেও ধরা হয়। কোরবানির হাট নিয়ে অনেক ধরনের ফড়িয়া দালাল, চাঁদাবাজ, এলাকার মাস্তান চক্র মুখিয়ে থাকে। এর ফলে প্রকৃত খামারিরা অনেক সময়ই কাক্সিক্ষত মূল্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। এই ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবছর আমাদের কোরবানির হাট কোথাও কোথাও রমরমা হয়, কোথাও কোথাও নানা বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এবার আসা করা যাচ্ছে সে রকম পরিস্থিতি নাও হতে পারে। তবে খামারিরা আতঙ্কিত না হয়ে সব পশু কোরবানির হাটে টেনে ফাঁদে পা না দিলে তারাই হয়তো লাভবান হতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোরবানি-পরবর্তী সময়ের দেশের বড়-ছোট শহর এবং গ্রামগঞ্জেও মানুষের দৈনন্দিন মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য তারা তাদের পশুগুলোকে বিক্রির একটি পরিকল্পনা করতে পারেন। এ জন্য সরকারের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সব ধরনের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে খামারিদের উৎপাদিত পশু আগামী দিনগুলোয় বাজারে নির্বিঘেœ সরবরাহ করার ব্যবস্থা করলে একদিকে খামারিরা লাভবান হবেন, অন্যদিকে দেশের মানুষের মাংসের চাহিদা বছরব্যাপী স্থিতিশীলভাবে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। বিষয়টি অর্থনৈতিক দৃষ্টি থেকেও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল ভেবে দেখতে পারে। এর জন্য সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা এখনই প্রণয়ন প্রয়োজন, যা সম্পর্কে খামারিরা আগে থেকে অবহিত থাকবেন। তা হলে তাদের মধ্যে হতাশা থেকে হুড়োহুড়ি কোরবানির হাটে খামারিদের বিপর্যয় সৃষ্টির অবতারণা হবে না।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : শিক্ষাবিদ ও কলাম লেখক

advertisement