advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতের রাজনীতি

মেজর (অব) সুধীর সাহা
১২ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ০০:১৩
advertisement

কারাকোরাম পর্বতমালার পূর্বপাশে গালওয়ান উপত্যকায় মুখোমুখি অবস্থানে ভারত ও নেপাল। এলএসিতে ১৯৭৫ সালের পর প্রথমবারের মতো ঘটা এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে চীন ও ভারত দুই দেশের সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সংঘষের্র পর থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত চীন সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। এদিকে বিবাদমান অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ও সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ করছে চীনারা। বৈশ্বিক পরাশক্তি চীনের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক শক্তি ভারতের সাম্প্রতিক বিরোধপূর্ণ অবস্থানের মধ্যে দিল্লির সাউথ ব্লকের জন্য উন্মোচিত হয়ে গেছে আরেকটি সত্য। বেইজিংয়ের সঙ্গে চলমান বিবাদে তারা পাশে পাচ্ছে না প্রতিবেশী কোনো দেশকে। ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশ বর্তমান ইস্যুতে সরাসরি চীনাপক্ষ বা মৌনতার নীতি অবলম্বন করছে। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক কি শুধু চীনা আর্থিক ও সামরিক প্রতিপত্তির কাছে পরিবর্তিত হয়ে গেল? এর উত্তর না।

প্রথম মেয়াদে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের সামনে ‘প্রতিবেশী অগ্রাধিকার’ নীতির ঘোষণা দিয়ে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আদর্শিকভাবে কট্টোর হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির নীতির ফলে পরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতি হয়েছে।

কালাপানিতে রাস্তা নির্মাণের জেরে মানচিত্র পরিবর্তনের যে সিদ্ধান্ত নেপাল নিয়েছে, এতে ওই রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে নেপালের সঙ্গে কখনো আলোচনার প্রয়োজনবোধ করেনি ভারত। এ কারণে নেপালে সৃষ্টি হয়েছে ভারতবিরোধী নাগরিক বিক্ষোভ। এ অবস্থার সূচনা সাম্প্রতিক নয়। ২০১৫ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে নেপালে দ্রুত ত্রাণসহায়তার ব্যবস্থা করে যে প্রশংসা কুড়িয়েছিল, নতুন সংবিধান প্রণয়নে হস্তক্ষেপ করে ততটা সমালোচনার শিকার ভারত। সুবিধাজনক সংবিধান প্রণয়নে চাপ সৃষ্টি করতে জ্বালানি অবরোধের মতো সিদ্ধান্ত নেপালে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছিল। ফলে স্বভাবত দৃশ্যপটে হাজির হয় চীন। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভারতবিরোধী বিভিন্ন ফ্যাক্টর মিলিয়ে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অভ্যন্তরীণভাবে এখন নেপালে ভারত বিরোধিতা তুঙ্গে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুদ্র প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচনে ভারত সরকারের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ বহু পুরনো। পূর্বতন অবস্থান থেকে সরে এসে তামিল গেরিলাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে শ্রীলংকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে ভারত সংশ্লিষ্টÑ এমন অভিযোগ নতুন নয়। চীনের আর্থিক ঋণে জর্জরিত এবং নতুন রাষ্ট্রপ্রধান গোটাবায়া রাজাপাকসে ও তার পরিবারের সঙ্গে চীনা সখ্যের প্রভাবে শ্রীলংকায় বর্তমানে অনেকটাই কোণঠাসা ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতি। মালদ্বীপ সরকার অনেকাংশে ভারতপন্থি হলেও সরাসরি চীনের বিরোধী কোনো বক্তব্য প্রদান করার মতো অবস্থানে নেই। ভারত মহাসাগরে ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ প্রভাববলয় গড়ে তুলতে চীন স্বাভাবিক কায়দায় ঋণের জালে মালদ্বীপকে এমনভাবে বেঁধেছে যে, মালদ্বীপের পক্ষে চীনের বিরোধিতা করা কার্যত অসম্ভব। আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমার অর্থনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সমর্থন লাভের জন্য পুরোমাত্রায় চীনের ওপর নির্ভরশীল। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের একনিষ্ঠ সমর্থন হারানোর আশঙ্কায় ভারতের পাশে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা তাদের নেই। এদিকে বরাবরের মতো পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের তিক্ততার সম্পর্ক বজায় রয়েছে। গত বছরের ‘পুলওয়ামা সংঘর্ষ’ এবং জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে ভারত সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিজেপি ও মিত্রদের ক্রমাগত সরাসরি পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব সম্পর্ক নতুনভাবে পুনর্স্থাপনের সম্ভাবনাকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছে।

বাস্তবিক অর্থে এ অঞ্চলে একমাত্র বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বর্তমানে সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে ভারতের। সাম্প্রতিক সময়ের নাগরিক নিবন্ধন আইন (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের অবস্থান ও দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের অযাচিত মন্তব্য কৌশলগত এ সম্পর্ককে অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুখ্যত বিজেপির রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক অমিত শাহের বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ হিসেবে সম্বোধন ভালো চোখে নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। সম্প্রতি চীনের ঋণসহায়তাকে ‘খয়রাতি’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রভাবশালী আনন্দবাজার পত্রিকা ভারতবিরোধী মনোভাবের আগুনে নতুন ইন্ধন জুগিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক কূটনীতির বাস্তবতার সমীকরণে এখন চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি মেনে চলছে। অর্থাৎ চীনের ক্রমাগত অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব কমাতে সাহায্য করছে সত্য। কিন্তু এর চেয়ে বড় সত্য, ভারতের ধারাবাহিক প্রতিবেশী নীতির ব্যর্থতা তাদের এ অঞ্চলে কোণঠাসা করে ফেলেছে। বিজেপি-আরএসএসের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা সম্পর্কের তলানির জন্য প্রতিবেশীদের ধারাবাহিকভাবে দায়ী করে এলেও তাদের ওই অবস্থানই যে এ অঞ্চলে ভারতকে বন্ধুহীন করে তুলছে, তা বলার অবকাশ রাখে না।

অনিক আহমেদ : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement