advertisement
advertisement

কোভিড-১৯ অতিমারীর প্রভাব পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন

ড. একেএম খোরশেদ আলম
১৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ২১:৪৬
advertisement

একুশ শতকে মানবসভ্যতাকে সবচেয়ে গভীরভাবে ও বিস্তৃত আকারে প্রভাবিত করেছে কোভিড-১৯ নামের ভাইরাসজনিত নতুন রোগটি। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র এ রোগ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানবসভ্যতার কাছে নজিরবিহীন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। করোনা ভাইরাসটি ব্যক্তি, পারিবারিক, সমাজজীবন; স্বাস্থ্য ও মন, পরিবেশ, শিক্ষা, অর্থনীতি অর্থাৎ সর্বত্র অবাধে বিচরণ করছে।

প্রত্যক্ষ করা, নমুনা বিশ্লেষণ ও প্রকাশিত তথ্য থেকে আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি যে, বায়ু, পানি ও মাটি অর্থাৎ প্রকৃতি ও পরিবেশে এবং জীবজগতে নতুন ভাইরাসটি প্রভাব ফেলেছে। তবে এ জানাকে গুণগত মান থেকে পরিমাণগত ও স্বল্প পরিসর থেকে বৃহৎ পরিসরে নিতে এবং প্রতিনিয়ত পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে দূর অনুধাবন প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা রয়েছে। উপগ্রহ চিত্রের ব্যবহার দূর অনুধাবন প্রযুক্তির আওতায় একটি পদ্ধতি, দ্রুততম সময়ে ও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একই এলাকার ওপর চিত্র পাওয়া সম্ভব এবং কম্পিউটারের সাহায্যে বিশেষজ্ঞদের পক্ষে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা এবং বিতরণ করা সম্ভব। এতে নীতিনির্ধারণে, পরিকল্পনা গ্রহণে ও বাস্তবায়নে তা সহায়ক হবে। খনিজসম্পদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি, পরিবেশ, আবহাওয়াসংক্রান্তু উপাত্ত আহরণ ও বিশ্লেষণ করে সম্পদের সদ্ব্যবহারে দূর অনুধাবন প্রযুক্তির প্রয়োগ কয়েক দশক ধরে হয়ে আসছে। ক্রমাগ্রসরমান এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্র ও তীব্রতাও ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও সফল ব্যবহার হচ্ছে মানুষের জীবন নিরাপদ রাখতে ও মানোন্নয়নে।

সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা গেছে, নতুন তিনটি মহাকাশ সংস্থাÑ ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ইসা), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্যাল অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিেিস্ট্রশন (নাসা) এবং জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সা) ‘কোভিড-১৯ ভূপর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড’ নামে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে উপগ্রহ চিত্রের বহুবিধ উপাত্ত একত্র করে বিশ্লেøষণ করার সুবিধা রয়েছে। তাতে ব্যবহারকারীরা বায়ু ও পানির গুণাগুণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মকা- এবং কৃষি বিষয়ে গতিবিধি অনুসরণ করতে পারবেন। তিন এজেন্সির এ প্লাটফর্মটি করোনা ভাইরাসজনিত ছুটির বা লকডাউনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্বন্ধে জানতে জনসাধারণ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি অনন্য ও কেন্দ্রীয় প্লাটফর্ম হিসেবে কাজের সুযোগ দেবে। এতে পূর্ণ সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করে ও আরও নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করে এ সংকট উত্তরণে মানবতাকে সাহায্য করছেন বলে তারা মনে করেন।

তবে শুরুতে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ও ইউরোপিয়ান কমিশন কোপারনিকাস সেন্টিনিয়াল উপগ্রহ উপাত্ত ব্যবহার করে কোভিড সম্পর্কিত তথ্যাদি সরবরাহ করতে ’র‌্যাপিড অ্যাকশন কোভিড-১৯ ভূপর্যবেক্ষণ’ নামে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা মনে করেন মানবসমাজ কোভিড-১৯জনিত যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে তা চরিত্রগতভাবে বৈশি^ক, কাজেই মহাকাশ সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মুখ্য। আঞ্চলিক ছুটি বা লকডাউনে এবং সামাজিক দূরত্ব বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপগুলো কীভাবে পৃথিবীর বায়ু, মাটি ও পানিকে প্রভাবিত করেছে তা ব্যবহারকারীদের অনুসন্ধান করতে ভূপর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড সুবিধা দেবে। বৈশি^ক স্কেলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে কার্বন ডাই-অক্সাইডের অবস্থা জানার সুবিধা আছে ড্যাশবোর্ডে। বাংলাদেশের অবস্থা জানার সুযোগ এখানে আছে।

ড্যাশবোর্ডটিতে নাসার অরা এবং ওসিও-২ উপগ্রহ, জাক্সার জিওস্যাট এবং অ্যালোস-২, ইউরোপিয়ান কমিশনের নেতৃত্বাধীন ইউরোপিয়ান কোপারনিকাস কর্মসূচির সেন্টিনিয়াল মিশনের উপাত্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সৌমি এনপিপি উপগ্রহের উপাত্ত ব্যবহার করে রাত্রিকালীন মানচিত্র তৈরি করা হচ্ছে। পরবর্তী মাসগুলোতে নতুন উপাত্ত সংযোজনের মাধ্যমে ড্যাশবোর্ড সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে এবং নতুন বিভাগ সংযুক্ত করা হবে বলে জানানো হয়েছে। কোভিড-১৯ ভূপর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড ঠিকানা :

সাম্প্রতিক সময়ে অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে ইকোলজিক্যাল ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সেখানে বসবাসকারী প্রাণীরা যাদের কেউ কেউ রোগ সংক্রমণকারী ভাইরাস বহন করে, বাধ্য হয়ে তাদের মানুষের কাছাকাছি চলে আসার সম্ভাবনা তৈরি করে। এভাবে চলে আসা ভাইরাসের মাধ্যমে এমন কিছু সংক্রামক রোগের উদ্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। অন্য আরেক গবেষণায় দূর অনুধাবন প্রযুক্তির সাহায্যে রাতের ভূপৃষ্ঠের স্থলভাগের তাপমাত্রা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মশার প্রাচুর্যের সম্পর্ক নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। বৃক্ষনিধন, নগরায়ণ ও কৃষির তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে জনসংখ্যা ও সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধিতে উদ্ভূত আরও উপাদান আগামী দিনগুলোতে যোগ হয়ে ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন আনবে যা এসব জুনোটিক প্যাথোজেনের বিস্তার ঘটা ও তাদের মাধ্যমে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি ত্বরান্বিত করার সম্ভাবনা তৈরি করবে। আমাদের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে বিভিন্ন কারণে ভূমি ব্যবহার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কীটপতঙ্গের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তারা সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটাতে পারে। এজন্য এমন পরিবর্তনকে সদা পরিবীক্ষণে রাখা প্রয়োজন, সে ক্ষেত্রে উপগ্রহ চিত্র তথা দূর অনুধাবন প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর হবে যা শ্রম, সময় ও অর্থ বাঁচায়। কাজেই করোনা-পরবর্তী সময়ে প্রচলিত ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির প্রয়োগ ছাড়াও জনস্বাস্থ্য নিরাপদ রাখতে এ ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করা দরকার। কারণ প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মানুষের প্রভাব যেমন ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন ও এ ধরনের জুনোটিক রোগের মানুষের শরীরে চলে আসার ঝুঁকির সম্পর্কটি আরও গভীরভাবে জানার জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন। বায়ুবাহিত, কীটবাহিত (ভেক্টর-বোর্ন), মৃত্তিকাবাহিত ও পানিবাহিত রোগে পরিবেশের উপাদানগুলোর ভূমিকা মূল্যায়নেও এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যায়। এভাবে নতুন নতুন উপাত্ত ও প্রাগ্রসর প্রযুক্তির প্রাপ্যতা এ বিষয়ে বর্তমান ধ্যান-ধারণাকে সমৃদ্ধ করে জনস্বাস্থ্যকে নিরাপদ করতে সম্ভাব্য রোগ সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করা এবং উপশমের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোকে আরও সহজে ও সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। তদুপরি বাংলাদেশ অন্যান্য ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং স্বকীয় সাংস্কৃতিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশ, আমাদের নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করা জরুরি যা এসব গবেষণার মাধ্যমে তৈরি হবে।

ড. একেএম খোরশেদ আলম : গবেষণা ভূতত্ত্ববিদ

advertisement