advertisement
advertisement

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমাচার

আজহারুল ইসলাম অভি
১৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০ ০৮:৫৬
advertisement

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের একটি বিশেষ সংস্থা। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা এ সংস্থাটির লক্ষ্য বিশ্ববাসীকে একটি রোগমুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়া। তবে সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বেশ বিপাকেই পড়েছে সংস্থাটি। বিস্তারিত জানাচ্ছেন- আজহারুল ইসলাম অভি

যেসব কাজে অবদান রেখেছে সংস্থাটি

বিশ্বজুড়ে সংস্থাটির সাত হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন। ৭০ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে সংস্থাটি মহামারী ও স্বাস্থ্য ইস্যুতে বহু জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। এটি পোলিও, গুটিবসন্ত ও ইবোলা নির্মূলে ভূমিকা পালন করেছে। ইবোলার ভ্যাকসিন তৈরিতেও ডব্লিউিইচওর ভূমিকা অতুলনীয়। এর বর্তমান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে করোনা, সংক্রামক রোগ, এইচআইভি/এইডস, ইবোলা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ; স্বাস্থ্যকর খাদ্য, পুষ্টি ও খাদ্য সুরক্ষা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল। বিশ্বব্যাপী মানুষের স্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের জন্য কাজ করে থাকে সংস্থাটি। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করে ডব্লিউএইচও। এর সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। বিশ্বব্যাপী সংস্থাটির ছয়টি আধা স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। সেগুলো হলো আফ্রিকা, পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।

যেভাবে গঠিত হয় এর পরিচালনা পর্ষদ

ডব্লিউএইচওর ১৬০টি মাঠপর্যায়ের কার্যালয় রয়েছে। ডব্লিউএইচওর ১৯৪ সদস্যবিশিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সমন্বয়ে সংস্থাটির গভর্নিং বডি বিশ্ব স্বাস্থ্য অ্যাসেম্বলি (ডব্লিউএইচএ) নির্বাচিত হয়। এটি ৩৪ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত হয়। ডব্লিউএইচএ বার্ষিক সম্মেলন এবং মহাপরিচালক নির্বাচন, লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বাজেট এবং কার্যক্রম অনুমোদিত করার জন্য দায়বদ্ধ। এর বর্তমান মহাপরিচালক টেড্রোনস আধানম ইথিওপিয়ার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

যেভাবে কাজ করে সংস্থাটি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিস্তৃত কাজের মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিরীক্ষণ করা, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া সমন্বয় করা এবং মানবস্বাস্থ্য ও সুস্বাস্থ্যের প্রচার করা। এটি এর সদস্য দেশগুলোকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য মান এবং নির্দেশিকা নির্ধারণ ও প্রদান করে থাকে। এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য জরিপের মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে উপাত্ত পর্যালোচনা করে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মূল্যায়ন করে সব জাতির স্বাস্থ্যের একটি রূপরেখা সরবরাহ করে।

স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে যেসব দেশের ভূমিকা রয়েছে

২০১৯ সালে মোট অনুদানের পরিমাণ ছিল ৫.৬২ বিলিয়ন ডলার। সংস্থাটির মূল আর্থিক জোগানদাতা যুক্তরাষ্ট্র দেয় ৫৫৩.১ মিলিয়ন ডলার। তা মোট আয়ের ১৪.৬৭ শতাংশ। এর পরই বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন দেয় ৯.৭৬ শতাংশ অর্থাৎ ৩৬৭.৭ মিলিয়ন ডলার। গাবি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স দেয় ৮.৩৯ শতাংশ। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান রয়েছে যথাক্রমে ব্রিটেন ৭.৭৯ শতাংশ (১১ মিলিয়ন) ও জার্মানি ৫.৬৮ শতাংশ (১৫ মিলিয়ন)।

ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বৈরথ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সদস্যপদ তুলে নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। ২০২১ সালের জুলাই থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই চলবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইতোমধ্যে সংস্থাটি থেকে নিজেদের সদস্যপদ তুলে নেওয়ার নোটিশ জাতিসংঘ মহাপরিচালক আন্তোনিও গুতেরেসের বরাবর পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে চীনের পক্ষে কথা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাÑ বেশ কিছুদিন ধরেই এমন অভিযোগ করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডব্লিউএইচওকে ‘চীনের হাতের পুতুল’ বলেও তিরস্কার করেন ট্রাম্প। গত এপ্রিল-মে মাসের দিকে সংস্থাটিতে অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। এর পর মে মাসে সরাসরি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার ঘোষণা দেন। আর এবার অফিসিয়াল বা পাকাপাকিভাবেই নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে মার্কিন প্রশাসন। ফলে সংস্থাটিতে আর ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার চাঁদা দেবে না ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রে যখন করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে, তখনই এমন সিদ্ধান্ত নিল দেশটি।

করোনা নিয়ে স্বাস্থ্য সংস্থার যত কথা

করোনা সংক্রমণ ও প্রতিরোধ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিবৃতি

বারবার ভুল হওয়ায় বিজ্ঞানীদের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এখন পর্যন্ত বারবার ভুল নির্দেশনা দিয়ে আস্থা হারাচ্ছে সংস্থাটি।

এ রকম কিছু ভুল বার্তা তুলে ধরা হলো-

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের খবর প্রকাশ করে চীন। হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে ২৭ নিউমোনিয়ার রোগীর খবর পাওয়া যায়। পরদিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে একটি ম্যানেজমেন্ট টিম গঠন করা হয়। গত ৫ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানুষ থেকে মানুষে এই ভাইরাস সংক্রমণের কোনো প্রমাণ নেই। চীনে ভ্রমণ বা বাণিজ্যে কোনো প্রকার নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন নেই বলে জানানো হয়।

গত এপ্রিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, করোনা ভাইরাসে একবার সংক্রমিত হওয়ার পর তা যে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ ঠেকাতে পারেÑ এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা জানায়, তা হলো এখনো এর পক্ষে ব্যাপক গবেষণালব্ধ উপাত্ত নেই। কিন্তু চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো, ভাইরাস যেভাবে কাজ করেÑ ওই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বলা যায়, কোভিড-১৯ রোগে একবার আক্রান্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি করার কথা। বৈজ্ঞানিক যুক্তি ওই কথাই বলে। পরে সুর পাল্টে ২৫ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়Ñ তারা আশা করে, কোভিড-১৯ রোগে প্রথম আক্রান্তদের দেহে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। তা করোনা প্রতিরোধে কিছু হলেও সক্ষমতা তৈরি করবে।

ওই মাসেরই শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, করোনা ঠেকাতে মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই। এর পর সংবাদ ব্রিফিংয়ে সংস্থাটি আবার বলেছে, করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে অবশ্যই মাস্ক পরে বাইরে চলাচল করতে হবে। নতুন তথ্যের বরাত দিয়ে সংস্থাটি বলে, ফেস মাস্ক ‘সম্ভাব্য সংক্রামক ড্রপলেট’-এর জন্য বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে। অথচ এর অনেক আগে থেকেই করোনার বিস্তার রোধে মাস্ক ব্যবহারের সুফল নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লাগাতার বক্তব্য দিয়েছেন। মার্কিন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বহু আগেই জানিয়েছিল, জনসমক্ষে মুখে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। করোনা আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ভিত্তিতে সংস্থাটি ঘোষণা দেয়, ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন করোনার চিকিৎসায় কোনো কাজে আসে না, বরং এর তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। কিছুদিন পর সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে ওই অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঘোষণা দেয়।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুকণার মাধ্যমে করোনা ছড়ায় না- ডব্লিউএইচওর এই বক্তব্যের সঙ্গেও বহু বিজ্ঞানীর বিরোধ দেখা দেয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুকণা ও অতিক্ষুদ্র তরলকণা প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্যের সঙ্গে মতবিরোধ বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানীর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষে দ্রুত বিভিন্ন গবেষণা সংগ্রহ ও সেগুলো পর্যালোচনা করে ভাইরাসটির চরিত্র বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করা সম্ভব হলেও এ কাজে এখন পর্যন্ত তারা আস্থা অর্জন করতে পারেননি। সাধারণত তারা সতর্কতার সঙ্গে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পর্যালোচনা করে থাকেন। কিন্তু এখন গবেষণার গতি বদলে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা ড. মারিয়া ভ্যান কেরখোভ বলেছিলেন, এখনো দেখা যাচ্ছে উপসর্গবিহীন আক্রান্তদের থেকে দ্বিতীয় কারও দেহে সংক্রমণের ঘটনা খুবই বিরল। এই মন্তব্যে বিজ্ঞানীদের কপালে ভাঁজ পড়ে। তারা ডব্লিউএইচওর কর্মকর্তাকে দ্বিমত জানান। গবেষকদের আপত্তির মুখে ‘উপসর্গবিহীন আক্রান্ত’ প্রসঙ্গে ভ্যান কেরখোভ জানান, তিনি একটি জিজ্ঞাসার জবাবে ওই কথা বলেছিলেন। ডব্লিউএইচওর নীতি বা এ সংক্রান্ত কিছু বলেননি।

তিনি জানান, উপসর্গবিহীন আক্রান্তদের নিয়ে তার ওই মন্তব্যের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের অপ্রকাশিত গবেষণা। কিন্তু অপ্রকাশিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তথ্য ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছাড়া এ ধরনের মন্তব্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ নষ্ট করছে বলে মন্তব্য করে ডব্লিউএইচওর সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্লোবাল হেলথ ল’।

advertisement