advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘কূটনৈতিক দায়মুক্তি না থাকলে হয়তো কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকেও আটক করা হতো’

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ জুলাই ২০২০ ০৩:০০ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০ ০৩:০০
advertisement

মানব ও অর্থপাচারের মত সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় অভিজ্ঞতা ও তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এবং সচেতনতা তৈরিতে নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য।

গতকাল রোববার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও কুয়েত ট্রান্সপারেন্সি সোসাইটি (কেটিএস) আয়োজিত ‘সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবেলায় নাগরিক সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক এক যৌথ ভার্চুয়াল সেমিনারে এসব মন্তব্য করেন আলোচকরা।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) চেয়ারপার্সন ডেলিয়া ফ্যারাইরা রোবিও। এ ছাড়াও, আলোচনায় যুক্ত হন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অব কুয়েতের সাবেক সদস্য ড. হাসসান জোহার, কেটিএস’র চেয়ারপারসন মাজিদ আল মুতাইরি, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং কুয়েত ইউনিভার্সটি-ল স্কুলের ড. দালাল আল সাইফ। সেমিনার সঞ্চালনা করেন কেটিএস’র পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আসরার হায়াত।

সেমিনারের টিআই চেয়ারপারসন ডেলিয়া ফ্যারাইরা রোবিও বলেন, ‘দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে অর্থপাচার বন্ধ করতেই হবে। সম্মিলিত ও আন্তঃদেশীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এ ধরণের সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন করা সম্ভব। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে সঠিক নীতি-কাঠামো ও আইন এবং সেগুলোর যথাযথ ও কঠোর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সব প্রকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। এজন্য কর্তৃপক্ষের আইনি ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে।’

কেটিএস’র চেয়ারপারসন মাজিদ আল মুতাইরি সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল আলোচিত ও প্রচারিত অর্থ ও মানবপাচার, অবৈধ সুবিধা লাভ এবং আত্মসাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এ ধরণের অপরাধ প্রতিরোধে কেটিএস’র নানা প্রয়াস তুলে ধরেন।

কুয়েতে আটক বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের অর্থ ও মানবপাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক দায়মুক্তি না থাকলে হয়তো কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকেও আটক করা হতো।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ‘অর্থ ও মানব পাচারে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ: প্রভাব ও সম্ভাবনা’ বিষয়ে আলোচনা করেন। এসময় তিনি জাতীয় সংসদের প্রায় ৬২ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী হওয়ার তথ্য উল্লেখ করে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অধিক মাত্রায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

তিনি বলেন, ‘কুয়েতে আটক বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ছাড়াও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের একাধিক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ ও মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্যাসিনো ব্যবসা ও নানা অবৈধ পন্থায় অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ আছে। অর্থ ও মানবপাচারের মত অপরাধে কুয়েতে একজন বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের আটক হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে দুর্বৃত্তায়নের একটি অসম্মানজনক দৃষ্টান্তও বটে।এতে বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রবাসে বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ নষ্ট হওয়া এবং তাদের চাকুরিচ্যুতির আশংকা তৈরি করেছে, যার ফলে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির আশংকাও অবাস্তব নয়।’

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ, সরকার এবং রাজনৈতিক দলের অনেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু যারা দুর্নীতিতে জড়িত তারা নানা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি অব্যাহত রাখছে, যা প্রমাণ করে যে দুর্নীতিবাজরা অনেক বেশি ক্ষমতাবান। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে শক্তিশালী আইন থাকলেও তার যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগ না হওয়াই এর অন্যতম কারণ। দেশ ও সংসদের মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই কুয়েতে অভিযুক্ত বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দেশেও দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

অর্থ ও  মানবপাচারের মত সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের ও আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিসমূহের উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘এজন্য নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সব ধরণের পরিচয়, ভয়-ভীতি, চাপ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঊর্ধ্বে থেকে বাংলাদেশ ও কুয়েত উভয় দেশের সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি, এ ধরণের বিচ্ছিন্ন ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব যেন উভয় দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও কুয়েতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উপর না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থেকে অপরাধ মোকাবিলায় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অব কুয়েতের সাবেক সদস্য ড. হাসসান জোহার বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্বে নিয়োজিতরা সুস্পষ্টভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের পুরো ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো জোরদার করতে হবে।’  

ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দুর্নীতিও কোভিডের মতই এক ধরণের ভাইরাস। উৎস থেকেই এই ভাইরাস নির্মূল করতে না পারলে সাধারণ জনগণেরও দুর্নীতিতে আক্রান্ত ও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই উৎস থেকেই দুর্নীতি নির্মূলে তৎপর হতে হবে। এজন্য কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের অনেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন। তাই দুর্নীতির ঘটনা এবং তা প্রতিরোধে আন্তঃদেশীয় অভিজ্ঞতা বিনিময় জরুরি, বিশেষ করে আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে তা খুবই কার্যকরী হতে পারে।’

কুয়েত ইউনিভার্সটি-ল স্কুলের ড. দালাল আল সাইফ ‘আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন চুক্তি’ বিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশন বাস্তবায়নে কুয়েতের ফৌজদারি আইনের ঘাটতি সম্পর্কে আলোচনা করেন।

এসময় তিনি সাম্প্রতিক মানব ও অর্থপাচারের ঘটনায় কুয়েতি নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিদের একাংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরে কুয়েতের প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের অপরিহার্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

advertisement