advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

যোগাযোগে নতুন ইতিহাস নির্মাণ করছে সামাজিক মাধ্যম

ক্লে শারকি
১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:১৮ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০ ২১:৪০
advertisement

সামাজিক মাধ্যম তাত্ত্বিক ক্লে শারকি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়েল সহযোগী অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইটে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট প্রযুক্তির সামাজিক ও অর্থনেতিক প্রভাব বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখিতে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। ২০২০ সালে তিনি ফরেন পরিলিসর শীর্ষ শত বৈশ্বিক চিন্তকের তালিকায় তার নাম ছিল। শারকি ২০০৯ সালের জুনে টেড প্ল্যাটফর্মে তিনি এই বক্তৃতা করেন। বক্তৃতাটি বাংলায় ভাষান্তর করার জন্য শারকি অনমুতি দিয়েছেন দৈনিক আমাদের সময়কে।

ধারাবাহিক তিন পর্বের রচনার প্রথম পর্ব এটি—

মিডিয়া বা যোগাযোগ মাধ্যমের দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার গল্প শোনাব আজ। যার কাছে একটা বার্তা আছে এবং যে ওই বার্তাটা পুরো বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দিতে চায়, তার কাছে মাধ্যমের এই রূপান্তর কী মানে তৈরি করে, আমরা তা দেখব। মাধ্যমের এই আমূলে পাল্টে যাওয়ার চিত্র আমি ফুটিয়ে তুলব কয়েকটা গল্প বলার মধ্য দিয়ে।

তো, শুরু করা যাক। নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়ে গেল [১]। নিশ্চয়ই পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে আপনারা একটা কথা শুনেছেন। দেশের কিছু জায়গায় যে ভোটার দমনের ঘটনা ঘটতে পারে, এ নিয়ে কথাটা আগে থেকেই সবাই বলাবলি করছিল। ফলে একটা পরিকল্পনাও করা হয়েছিল, ভোটদানের সময়টা ভিডিওতে ধারণ করা হবে। ছবি তোলা যায় বা ভিডিও ধারণ করা যায়, এমন ফোন যাদের আছে, সেসব নাগরিক তাদের ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ ও চিত্র ধারণ করবেন। আসল লক্ষ্য হলো, ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়া হলে বা কোনোরূপ দমনচেষ্টা হলে, তা ধরা পড়বে। সবাই ছবি বা ভিডিওগুলো একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আপলোড করবে। এটাকে অনেকটা নাগরিক পর্যবেক্ষণ বলা চলে। মানে, নাগরিকরা শুধু নিজের ভোটটাই দেবেন না, বরং সার্বিকভাবে ভোটের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করবে।

সুতরাং, এটা এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে আমরা সবাই একত্রে এক জায়গায় আছি বলে মনে হবে। এখানে প্রধান বিষয় কিন্তু প্রযুক্তি নয়, বরং সামাজিক ঐক্যই (সোশাল ক্যাপিটাল) মুখ্য। কোনো প্রযুক্তিই শুরুতে সামাজিকভাবে আকর্ষণীয় থাকে না। আলোর ঝলকানি নিয়ে আসা সব নব প্রযুক্তিই বলতে চায়, এগুলোর সৃষ্টি সমাজকে ঘিরেই। কিন্তু শুরুতেই সবাই এসবে জমে যায় না। যখন সবাই প্রযুক্তিটাকে নিশ্চিন্তে গ্রহণ করে, তখন তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেহেতু মিডিয়া ক্রমশ সামাজিক হয়ে উঠছে, নতুনত্বের সৃষ্টি এখন যে কোনো জায়গা থেকে যখন-তখন ঘটতে পারে। আর সেই নতুন উদ্ভাবনকে নিশ্চিন্তে গ্রহণ করে লোকে সহজেই ভাবতে পারে, আমরা তো এখানে সবাই একসঙ্গেই আছি।        

তাহলে আমরা এমন একটা মিডিয়াচিত্র দেখতে পাচ্ছি যেখানে সর্বত্র পরিবর্তন ঘটছে, নতুন কিছু সৃষ্টি হচ্ছে, যা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এ এক বিশাল রূপান্তর। আমরা যে সময়ের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছি, ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রজন্মটা যে সময়কালের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছি, মানব ইতিহাসে অভিব্যক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের এটাই সবচেয়ে সুবর্ণ সময়। দাবি হিসেবে অতিরঞ্জন শোনাচ্ছে? আমি দাবিটার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছি।

ইতিহাসে শেষ ৫০০ বছরে মোট চারটা পর্যায় আমরা দেখতে পাই, যেখানে মিডিয়া এমনভাবে পাল্টেছে যে, মানতেই হবে তা ‘বিপ্লব’ সমতুল্য। প্রথমটা জনিপ্রয়। ছাপাখানার উদ্ভাবন। বিচল হরফ (মুভেবল টাইপ), তেলনির্ভর কালি—কিছুটা জটিল, কিন্তু এ উদ্ভাবনের কল্যাণে মুদ্রণ বা ছাপাছাপি বাস্তব রূপ পেয়েছিল। ছাপাখানা ইউরোপের চিত্র পুরোই পাল্টে দিয়েছিল। এই বিপ্লব ঘটেছিল পনের শতকের মাঝামাঝি সময়ে।

দুই. এখন থেকে দুশো বছর আগের কথা। দ্বিমুখী যোগোযোগে এলো এক নব উদ্ভাবন। এলো কথোপকথনের প্রাযুক্তিক মাধ্যম : প্রথমে টেলিগ্রাফ, এরপর টেলিফোন। এরপর ধীরগতির, খুদে বার্তাভিত্তিক কথোপকথনের প্রযুক্তি, এরপর এলো কণ্ঠভিত্তিক তাৎক্ষণিক (রিয়াল-টাইম) আলাপচারিতার প্রযুক্তি।

তিন. এখন থেকে দেড়শ আগে আরেকটা বিপ্লব ঘটল। মুদ্রণ ছাড়াও ধারণ (রেকর্ড) করে রাখার মাধ্যম উদ্ভাবিত হলো। প্রথমে স্থিরচিত্র, পরে শব্দ আর গতিশীল চিত্রও ধারণ করা সম্ভব হলো। তবে এসব ছিল কোনো না কোনো ভৌতবস্তুতে ধারণ করার প্রযুক্তি।

এবং চার. শতবর্ষ পূর্বে আমরা দেখা পেলাম আরেক বিপ্লবের। বাতাসের মধ্য দিয়ে তড়িৎচুম্বকীয় কম্পাঙ্কের বর্ণালী ব্যবহার করে শব্দ ও চিত্র প্রেরণের প্রযুক্তি। এলো রেডিও আর টেলিভিশন।

যেহেতু যোগাযোগ মাধ্যম ক্রমশ সামাজিক হয়ে উঠছে, নতুনত্বের সৃষ্টি এখন যে কোনো জায়গা থেকে যখন-তখন ঘটতে পারে। অলঙ্করণ : টেকহিন্দুস্তান

 

বিশ শতক পর্যন্ত এই ছিল মোটা দাগে যোগাযোগ মাধ্যমের দৃশ্যপট (মিডিয়া ল্যান্ডসকেপ)। এসব প্রযুক্তির সঙ্গে আমরা অনেকেই একটা বয়স পর্যন্ত বেড়ে উঠেছি, এসব ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম।

কিন্তু এসব যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে একটা মজার বৈসাদৃশ্য রয়েছে। যে মাধ্যমটি কথোপকথন সৃষ্টিতে বেশি কার্যকরী, তা আবার গ্রুপ তৈরিতে তেমন কাজের না। আবার যে মাধ্যমটি গ্রুপ তৈরিতে বেশ কাজের, তা কথোকপথন তৈরিতে ততটা ভালো নয়। আমরা যদি আলাপ করতে চাই, তাহলে কী করি—অন্য কারো সঙ্গে কথা বলি। আর যদি একটা গ্রুপের সাথে আলাপ করতে চাই, তাহলে সবার জন্য একই বার্তা নিয়ে হাজির হতে হয়, ওই অভিন্ন বার্তা গ্রুপের সবাইকে দিতে হয়। যেমন সম্প্রচার চ্যানেল কিংবা ছাপাখানা থেকে আমরা সবার জন্য এক ও অভিন্ন বার্তা প্রচার বা প্রকাশ করে থাকি। বিশ শতকে এমন যোগাযোগ ব্যবস্থাই আমাদের সাঙ্গ ছিল।

এবং এটাই এখন পাল্টে গেছে। বিল চেসভিকের ইন্টারনেট মানচিত্রের [২] কথাই ধরুন। মানচিত্রটা দেখলে মনে হয়, যেন একটা ময়ূর পর্দাজুড়ে পেখম মেলে ধরেছে। চেসভিক পৃথক নেটওয়ার্কগুলোর পরিসর শনাক্ত করেন, তারপর সেগুলো রঙিন কোডে রূপান্তর করেন। ইতিহাসে ইন্টারনেটই প্রথম মাধ্যম, যেখানে একই সময়ে একসঙ্গে গ্রুপ ও কথোপকথন উভয়ই চলতে পারে। ফোন আমাদের ‘এক-থেকে-এক’জনে যোগাযোগ করার সুযোগ দেয়। টেলিভিশন, রেডিও, ম্যাগাজিন, বইপত্র—এসব মাধ্যমে ‘এক-থেকে-বহু’জনে যোগাযোগ সম্ভব হয়। আর ইন্টারনেট ‘বহু-থেকে-বহু’জনে যোগাযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রথমবারের মতো, যোগাযোগ মাধ্যম সহজাতভাবেই এ ধরনের কথোপকথনকে সমর্থন জোগাচ্ছে। এটা একটা বিশাল রূপান্তর।

দ্বিতীয় পরিবর্তনটাও বেশ উল্লেখযোগ্য। যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যেহেতু সবটাই ডিজিটাইজড হয়ে গেছে। ফলে, ইন্টারনেট অন্য সব মাধ্যমের বাহন হয়ে উঠেছে। ফোন কলের প্রযুক্তি যোগ হয়েছে ইন্টারনেটে, ম্যাগাজিন ইন্টারেনেটে চলে এসেছে, বাদ যায়নি মুভিও। এর মানে হলো, প্রতিটা মাধ্যমই অপরাপর মাধ্যমের সান্নিধ্যে চলে এসেছে ইন্টারনেট প্রযুক্তির সুবাদে। অন্যভাবে ভাবুন, যোগাযোগের মাধ্যমগুলো এখন যতটা না তথ্যের উৎস, বরং এগুলো এখন সহযোজনা, সমন্বয় বা সংযোগের আঙিনা হয়ে উঠছে। কেননা, দেখা কিংবা শোনা—যেকোনো ক্ষেত্রেই লোকে এখন পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে এবং একই সময়ে পরস্পরের সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যেতে পারে।

তৃতীয় আরেকটা বড়রকম পরিবর্তন ঘটে গেছে। আগে যারা কেবলই পাঠক, শ্রোতা বা দর্শক ছিল, ড্যান গিলমোরের [৩] ভাষায় যারা ‘সাবেক অডিয়েন্স’, তারা এখন শুধু ভোক্তা বা গ্রাহক নয়, তারা এখন একেকজন প্রণেতাও বটে। যোগাযোগ মাধ্যমের জগতে যখনই নতুন কেউ যুক্ত হচ্ছেন, তখন একজন বার্তা রচয়িতাও আসলে যুক্ত হন। ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে একজন যেমন কিছু গ্রহণ করছেন, একই যন্ত্রযোগে তিনি চাইলে কিছু সৃষ্টিও করতে পারছেন। ব্যাপারটা এমন যেন, কিনলেন বই, সঙ্গে বিনে পয়সায় পেলেন স্বয়ং ছাপাখানা। হাতে একটা ফোন থাকলে, সঠিক বোতাম চাপতে জানলে আপনি তাকে রেডিওতে রূপান্তর করতে পারেন। প্রচলিত মাধ্যমের জগতে এ এক বিশাল পরিবর্তন। প্রায় বিশ বছর ধরেই ইন্টারনেট সর্বজনীন রূপে আছে। যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আরও বেশি সামাজিক হয়ে উঠছে বলে ইন্টারনেটও বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কীভাবে ইন্টারনেট আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়, এ ধরনটাও বদলাচ্ছে।

ভাষান্তর : জাহাঙ্গীর আলম : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী, এবং দৈনিক আমাদের সময়-এর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক।

তথ্যটীকা

[১] ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর ৪৪তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেয় মার্কিনরা। জনপ্রিয় ও ইলেকটোরাল—উভয় ভোটেই অনেক বেশি এগিয়ে থেকে জয় পান ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামা। বিস্তারিত :  transition.fec.gov/pubrec/fe2008/federalelections2008.pdf| ওবামা জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমরা পেরেছি। আমরা পারি। আপনারাই আসল পরিবর্তন।’ সূত্র : obamawhitehouse.archives.gov

[২] যুক্তরাষ্ট্রের বেল ল্যাবে ১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মে যাত্রা শুরু হয়েছিল বিশ্ব ইন্টারনেট মানচিত্র তৈরির প্রকল্প। সূত্র : cheswick.com/ches/map

[৩] মার্কিন গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ড্যান গিলমোর অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডিজিটাল মিডিয়া বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। বিস্তারিত : dangillmor.com

advertisement