advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শরীরী ‘থাপ্পড়’, অশরীরী প্রভাব

জাকির হোসেন তমাল
১৫ জুলাই ২০২০ ১১:৩৮ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২০ ১৭:২৯
থাপ্পড় সিনেমার একটি দৃশ্য
advertisement

থাপ্পড়, একটি শরীরী ব্যাপার। কিন্তু মানসিকভাবে এর প্রতিফলন যে কতভাবে হতে পারে, সেটাই দেখা যায় ‘থাপ্পড়’ (Thappad) নামের হিন্দি সিনেমায়। ডিভোর্সের মতো বিষয় যে থাপ্পড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, তা এই সিনেমা দেখার আগে হয়তো কেউ ওভাবে ভাবার সুযোগ পাননি। একটি থাপ্পড়কে কেন্দ্র করে অনুভূতির জগতে যে কত ধরনের প্রশ্নের উদ্ভব হতে পারে, তা বুঝতে গেলে সেই অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ হতে হয়। সেই অনুভূতি জাগানোর কাজটিই করেছে সিনেমাটি।

নিখুঁত অভিনয়

অমৃতা সাবেরওয়াল (তাপসী পান্নু) ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছে অনেক আদরে বড় হন। হঠাৎ একদিন তার বিয়ের প্রস্তাব আসে সম্ভ্রান্ত এক পরিবার থেকে। নিজ ইচ্ছায় অমৃতা বিয়েতে রাজি হয়ে যান। বিয়ের পর স্বামী বিক্রম (পাভেল গুলাতি) ও শাশুড়ির (তানভি আজমি) সঙ্গে আলাদা বাসায় থাকেন। চাকরির সুবাদে বিক্রম লন্ডনে যেতে চান। এ জন্য দিনরাত একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করেন। এ কাজে অফিসের অনেকের সঙ্গে তার স্ত্রী অমৃতাও সহায়তা করেন। শুধু তাই নয়, স্বামীর খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শাশুড়ির সব ধরনের দেখাশোনা করতে হয় অমৃতাকে। তিনি সেটা অনেক যত্ন ও দায়িত্ব নিয়ে করতে থাকেন। পাশাপাশি নৃত্যে পারদর্শী অমৃতা পাশের ফ্ল্যাটে সিভানির (দিয়া মির্জা) মেয়েকে নাচ শেখান।

এভাবে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। হঠাৎ একদিন সেখানে ব্যবচ্ছেদ ঘটে।  বিক্রমের লন্ডন যাওয়ার বিষয়টি একরকম চূড়ান্ত হওয়ার পর বাসায় একটি আয়োজন করেন। সেখানে অফিস থেকে শুরু করে বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়িসহ অনেককে দাওয়াত করেন বিক্রম। আয়োজনে আনন্দের মাঝেই হঠাৎ অফিসের বসের ফোন আসে। বিক্রমকে বলা হয়, লন্ডনে না গিয়ে ভারতে কাজ চালিয়ে যেতে। এতে বিক্রম রেগে যান। ওই পার্টিতে থাকা অফিসের একজন সিনিয়রকে বিষয়টি নিয়ে বলতে গিয়ে বিক্রম তাকে মারতে উদ্যত হন। এ সময় অমৃতা তাকে টানতে টানতে দূরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঠিক এ সময়ে অমৃতার গালে একটি থাপ্পড় মারেন বিক্রম। পাশ থেকে সবাই অবাক দৃষ্টিতে বিষটি দেখতে থাকেন।

ওই একটি থাপ্পড়ের পর পুরো সিনেমার দৃশ্য পাল্টে যায়। নতুন দিকে মোড় নেয় সিনেমার কাহিনী। অনেক ভালোবাসা ও যত্নে আগলে রাখা স্বামী যখন অমৃতাকে থাপ্পড় মারেন, তখন তিনি সবকিছু নতুন করে ভাবতে থাকেন। স্বামীর থাপ্পড়ের পর অমৃতার মনে প্রশ্ন জাগে, বিক্রম কি আসলেই তাকে ভালোবাসে? 

সেই থাপ্পড়ে অমৃতা মনে যে কষ্ট অনুভব করেন, সেটা কখনই ভুলতে পারেন না। তবে দায়িত্ববান স্ত্রী হিসেবে অমৃতার কাজ সবার হৃদয় ছুয়ে যাবেই। এই অবস্থায় স্বামীর বাসায় থাকতে না পেরে বাবা শচিনের (কুমুদ মিশ্র) বাসায় চলে যান। যাওয়ার আগে স্বামী-শাশুড়ির জন্য অনেক দিনের বাজার করে যান অমৃতা। বাবার বাসায় যাওয়ার পর তিনি মেয়েকে অনেক স্নেহ করেন এবং মেয়ের আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। বাবার বাসায় কিছুদিন এভাবেই কেটে যায়।

একদিন হঠাৎ শ্বশুরবাড়িতে হাজির বিক্রম। তিনি স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চান, কিন্তু এতে রাজি হননি অমৃতা। এভাবেই একদিন আইনজীবী নেত্রা জয়সিংহের (মায়া সারাও) কাছে হাজির অমৃতা। স্বামীর কাছ থেকে ডিভোর্স নিতে চান তিনি। আইনজীবী এর কারণ চানতে চাইলে শুধু একটি থাপ্পড়ের কথা বলেন অমৃতা। এতে আইনজীবী অনেক ধরনের প্রশ্ন করেন। স্বামীর কোনো সমস্যা আছে কি না, তাকে নিয়মিত মারে কি না ইত্যাদি। কিন্তু অমৃতা শুধু একটাই অভিযোগ তোলেন, তা হলো থাপ্পড়। এতে আইনবীজী অনেকটাই বিস্মিত হন। তিনি অমৃতাকে আবার ভাবতে বলেন। কিন্তু অমৃতা নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

সিনেমার একবারে শেষের দিকে অমৃতা নিজের নিখুঁজ অভিনয় দিয়ে সবার হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছেন। একটি থাপ্পড়ের মাঝে অমৃতা দেখতে পেয়েছেন, তার প্রতি স্বামীর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ, স্ত্রীকে অসম্মান করার দুঃসাহস। তাই সবার অনুরোধ ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অমৃতা শেষ পর্যন্ত নিজে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। তাই ডিভোর্স দিয়েছেন।

সামাজিক প্রেক্ষাপট

অমৃতা তার স্বামীকে ডিভোর্স দিতে গিয়ে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, আমাদের সমাজের চিরায়ত নিয়মে তাকে সবাই বিষয়টি কম্প্রোমাইজ করে স্বামীর সঙ্গে থাকতে বলেছিলেন। বিক্রমও তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, এ জন্য অমৃতার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। অমৃতার একটাই কথা, তিনি বেঁচে থাকতে চান সম্মানের সঙ্গে। কিন্তু স্বামীর কাছে সেই সম্মান তিনি পাননি। তবে নিজের আচরণ ও ভালোবাসা দিয়ে পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির সবার কাছে প্রিয় মেয়ে হতে পেরেছিলেন শেষ পর্যন্ত।

নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে স্ত্রীকে মারধরের খবর পাওয়া যায়। এ স্ত্রীরা সমাজ ও পরিবারের কথা, পরে সন্তানের কথা চিন্তা করে বিষয়গুলো এড়িয়ে চলেন। সোজা কথায় বললে, তারা বিষয়গুলো ভুলে যান, আবার নতুন করে সংসার শুরু করেন। কেননা আমাদের সমাজে ডিভোর্স হওয়া নারীদের বাঁকা চোখে দেখা হয়। তাই হয়তো অমৃতার বাড়ির কাজের মেয়েটি প্রতিদিন মার খেয়েও স্বামীর সঙ্গে থেকে গেছেন।

কিন্তু সাহসী ও আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে অমৃতার মতো হতে হয়। থাপ্পড় সিনেমায় মানুষকে আত্মসম্মান শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যেন নারীদের প্রতি পুরুষরা সম্মান দেখান, ঠিক একইভাবে পুরুষদের প্রতি নারীরা যেন নিজেদের সম্মানবোধ ও ভালোবাসা দেখান। 

অধিকার ও সম্মানবোধ জাগানো সিনেমা

শিক্ষা মানুষকে মানবিক ও আত্মমর্যাদাবান করতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে তার অনুভূতি শক্তিকে বাড়িতে দেয়। এটা শুধু যে বই-পত্রের মাধ্যমে গড়ে ওঠে, বিষয়টি এমন নয়। একটি ছোট্ট প্রাণি পিঁপড়ার কাছ থেকেও মানুষ যুগে যুগে অনেক জ্ঞান নিয়েছে। অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগে বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির গবেষক মজিদ সারভি বলেন, এক কোনায় নির্গমন পথ থাকলে পিঁপড়ার কার্যকরভাবে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার হার ৯৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। মানুষের ব্যবহার্য ভবন নির্মাণেও এই কৌশল কাজে লাগতে পারে।

মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের পাগল নামে এই বঙ্গদেশে আখ্যা দেওয়া হয়। অর্থাৎ তার মানসিক শক্তি হ্রাস পেয়েছে বা লোপ পেয়েছে। এমন ব্যক্তির কার্যক্রম নিয়ে আইনের বিচারের ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার মানে, পাগলের কাজের ভালো-মন্দ বিচার করা কঠিন। কিন্তু সেই পাগলের কাছ থেকেও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের শিক্ষা নেওয়ার আছে। অনেক মনীষী বলেছেন, পাগল যা করে তা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মুসলিম শরিয়া আইনে বিয়ে এক ধরনের অধিকার। এটা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে ইসলামে এই অধিকার পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি দিয়েছে। নারীর সব ধরনের ভরন-পোষণ পুরুষদের করতে বলা হয়েছে। বিনিময়ে নারী তাকে অনেক ধরনের কাজে সহায়তা করবে, এই যেমন গৃহস্থালি কাজ। যদিও নারী এই কাজের বিনিময়ে কোনো ধরনের অর্থ পান না বা তাদের এই কাজের কোনো শ্রম-মূল্য এখনো বাংলাদেশে নির্ধারণ হয়নি।

ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি, সামান্য বিষয় নিয়ে স্ত্রীকে মারধর করছেন স্বামী। আর সেই স্ত্রী বছরের পর বছর ধরে সেটা সহ্য করে যাচ্ছেন। এভাবে স্ত্রীকে মারধর করা নিজেদের অধিকার হিসেবে মনে করেন অনেক পুরুষ। কিন্তু বিষয়টি যে একদম সেটা নয়, থাপ্পড় সিনেমায় তাই দেখিয়েছেন পরিচালক অনুভব সিনহা। এর আগেও তার মুল্ক বা আর্টিকেল-১৫ সিনেমা ব্যাপক সাড়া ফেলে। নারীর অধিকার বা পুরুষের অধিকারের বাইরে গিয়ে মানবিকবোধ জাগ্রত করতে থাপ্পড় সিনেমাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়।

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

advertisement