advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনাকালে বিশ্বসেরা প্রযুক্তিবিদদের বাণিজ্য আরও রমরমা

বীরেন্দ্র নাথ অধিকারী
১৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২০ ২২:২৭
advertisement

২০১৯ সালের শেষ নাগাদ চীনের হুবেই প্রদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পর ক্রমান্বয়ে বিশ্বব্যাপী তা আতঙ্কজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অতিমারীর রূপ ধারণ করেছে। এই অতিমারীর সংক্রমণ কবে নাগাদ প্রশমিত হবে বা আদৌ হবে কিনা, তার কোনো কূলকিনারা নেই। কোভিড-১৯ বিশ্ববাসীর সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে, ব্যসবা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। বছরের প্রথম তিন মাসে বিশ্বব্যাপী ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার পারিবারিক সম্পদ অদৃশ্য হয়ে গেছে বলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম জানিয়েছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা বলে উল্লেখ করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান জেরোম এইচ পাওয়েল। সম্প্রতি তিনি জানান, মহামারী শুরুর আগে বিগত ৫০ বছরের মধ্যে মার্কিনিদের বেকারত্বের হার সর্বনি¤œ স্তরে চলে এসেছিল, কিন্তু মাত্র গত দুই মাসে ৯০ বছরের কাছাকাছি সময়ের মধ্যে তাদের বেকারত্বের হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে আমেরিকানস ফর ট্যাক্স ফেয়ারনেস (এটিএফ) ও ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের (আইপিএস) নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে যে, ব্যাপকভাবে মহামারী শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৪ কোটি ৫৫ লক্ষাধিক আমেরিকাবাসী বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অধোগতির কারণে সরকারের কাছে দরখাস্ত করেছেন। মার্কিন শ্রম বিভাগও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

অন্যদিকে ১৮ মার্চ থেকে ১৭ জুন এই তিন মাস সময়কালে প্রায় ২১ লাখ আমেরিকান করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার মারা গিয়েছেন। মহামারীতে অন্য ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ আমেরিকান রয়েছেন, যারা তাদের নিয়োগকর্তা দ্বারা সরবরাহকৃত স্বাস্থ্যসেবা কাভারেজ হারাতে পারেন। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্প বেতনের শ্রমিক, অভিবাসী, কালো বর্ণের মানুষ এবং নারীরা সম্মিলিত চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক সংকটে অসচ্ছলতার শিকার হয়েছেন।

সার্বিক অর্থনীতিতে নি¤œগতি এবং করোনা ভাইরাসজনিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অপ্রতুলতা সত্ত্বেও মহামারী শুরুর পর ১৭ জুন পর্যন্ত মার্কিন ধনকুবেরদের সম্পদের পরিমাণ ৫৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শীর্ষস্থানীয় বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বস সূত্রে প্রাপ্ত উপাত্ত নিয়ে এটিএফ ও আইপিএস কর্তৃক গবেষণার ভিত্তিতে নিচের সরণিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়নেয়ারদের গত তিন মাসের ব্যবধানে সম্পদের হিসাব তুলে ধরা হলো :

উপরোল্লিখিত শীর্ষ পাঁচ মার্কিন বিলিয়নেয়ারÑ জেফ বেজোস, বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ, ওয়ারেন বাফেট ও ল্যারি এলিসনের মোট সম্পদ বেড়েছে ১০১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ২৬ শতাংশ। গত তিন মাসে ছয় শতাধিক বিলিয়নেয়ারের যে পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার মধ্যে এই পাঁচজনের দখলেই গেছে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। তাদের মধ্যে আবার কেবল বেজোস ও জাকারবার্গ নিয়েছেন ৭৬ বিলিয়ন ডলার বা ৫৮৪ বিলিয়ন ডলারের ১৩ শতাংশ। উপরোক্ত শীর্ষ পাঁচ সম্পদশালীর বাইরে আরও ১২ জন বিলিয়নেয়ারের সম্পদের পরিমাণ গত তিন মাসে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মধ্যে আবার দুজনের সম্পদ বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি।

মার্কিন ধনকুবেরদের সম্পদের এই বেলেল্লাপনাই তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি মৌলিকভাবে কতটা ত্রুটিযুক্ত, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তিন মাসে প্রায় ৬০০ বিলিয়নেয়ার তাদের সম্পদ যে পরিমাণ বাড়িয়েছেন, তা দেশটির গভর্নরদের রাজ্যগুলোয় ৩৩ কোটি বাসিন্দাকে সেবা সরবরাহ করতে যে পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন সংস্থার প্রয়োজন হয় তার চেয়ে ঢের বেশি। বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ দ্বিগুণ বেড়েছে এমন এক সময়ে, যখন ফেডারেল সরকার ১৫ লাখেরও বেশি আমেরিকাবাসীকে এককালীন চেক তাদের ব্যাংক হিসাবে প্রদান করেছে। করোনা ভাইরাস মহামারী যদি কোনো কিছু নগ্নভাবে উন্মোচন করে, তা হলে দেখা যাবেÑ মার্কিন সমাজ কতটা অসম এবং অবশ্যই কতটা মারাত্মকভাবে এর পরিবর্তন হওয়া দরকার। মহামারীকালে বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধি আমেরিকানদের জাতিগত ঐক্য ও সংহতিকে ক্ষুণœ করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই মার্কিন সমাজে শেষতক অনেক বেশি করে অর্থনৈতিক ও জাতিগত মেরুকরণ প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে দূরত্ব না বাড়িয়ে মার্কিন জনগণকে সামষ্টিকভাবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে একসঙ্গে বেড়ে উঠতে হবে।

ধনীদের জন্য কয়েক দশক ধরে কর রেয়াতের কারণে এমনিতেই বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ হুহু করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় জাতীয় জরুরি অবস্থার মধ্যেও বিত্তবানদের কর রেয়াত অব্যাহত থেকেছে এবং অতি সম্প্রতি ‘মিলিয়নেয়ার গিভ অ্যাওয়েস’ প্যাকেজ আরও বর্ধিত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এ বছর মার্চের শেষ দিকে ‘করোনা এইড, রিলিফ অ্যান্ড ইকোনমিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ শিরোনামে প্রণীত একটি আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট কমিটি অন ট্যাক্সেশনের মতে, সম্প্রতি প্রণীত ‘হাউস হিরোস অ্যাক্ট’ এই কর বিরতি রদ করবে, যা এ বছর ৪৩ হাজার মিলিয়নেয়ার ও বিলিয়নেয়ারের গড়ে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার কর ছাড় দেবে। এ কমিটি অনুমান করছে যে, কর বিষয়ের ছিদ্রপথটি বন্ধ করা গেলে ২৪৬ বিলিয়ন ডলার সংগৃহীত হবে এবং এই বিপুল অঙ্কের অর্থ মহামারী থেকে মুক্তি পাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু এই তত্ত্ব কেবলই অনুমাননির্ভর। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে গবেষণায় বিশেষভাবে একটি ব্যাপার উঠে এসেছে যে, বর্তমান শীর্ষ পাঁচ মার্কিন বিলিয়নেয়ারÑ জেফ বেজোস, বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ, ওয়ারেন বাফেট ও ল্যারি এলিসনের মধ্যে একমাত্র ওয়ারেন বাফেট ছাড়া অন্য সবাই তথ্যপ্রযুক্তি ও ই-কমার্স ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের বাইরে ৩০ শীর্ষ বিলিয়নেয়ারের মধ্যে আরও বেশ কয়েকজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ রয়েছেন, যাদের ব্যবসায়ও করোনাকালে চড়াভাব। তাই করোনা ভাইরাস মহামারীকালে অন্যদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামলেও শীর্ষ প্রযুক্তিবিদদের বাণিজ্য অতীতের চেয়েও রমরমা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কারোনা অতিমারীতে দুই বিপরীতমুখী অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা প্রবাদ বাক্য ‘কারো ঘর পোড়ে, কেউ খই খায়’ আরও স্বতঃসিদ্ধ হলো।

বীরেন্দ্র নাথ অধিকারী : মুক্তিযোদ্ধা ও প্রযুক্তিবিদ

advertisement