advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সব খবর

advertisement

ভুয়া রিপোর্টে আসন্ন বিপদ

ডা. ছায়েদুল হক
১৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২০ ০৯:০২
advertisement

স্বাস্থ্য খাতের করুণ দশার নতুন চমকপ্রদ উপসর্গ করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট। জেকেজির ভুয়া করোনা রিপোর্ট কেলেঙ্কারির পর এবার সামনে এলো সাহেদ ও রিজেন্ট হাসপাতালের ভুয়া রিপোর্ট কেলেঙ্কারি। এর মাঝে প্রকাশিত হলো ইতালি গমনকারী বাংলাদেশিদের অনেকের কোভিড টেস্ট পজিটিভ এসেছে, ইতালিতে যারা বাংলাদেশ থেকে নেগেটিভ কোভিড টেস্ট সার্টিফিকেট নিয়ে ইতালিতে গিয়েছিলেন। তার পরের খবর হলো, ইতালিতে বাংলাদেশ থেকে বিমান পরিবহন বন্ধ থাকবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। করোনা সংকট যতদিন থাকবে, ততদিন ধরে নিতে হবে ইমিগ্রেশনের জন্য করোনা ইস্যুটি স্পর্শকাতর একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে থাকবে। করোনা রিপোর্ট একটি ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন মূল্যায়িত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বাংলাদেশে করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বেহাল দশার চিত্র ক্রমেই উন্মোচিত হতে থাকে। প্রথমেই শুরু হয় কিট সংকট এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় মাস্ক-পিপিই ইত্যাদি সুরক্ষাসামগ্রীর সংকট। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় করোনা টেস্ট করার জন্য প্রায় ৬৭টি আরটি-পিসিআর মেশিন বসানো হয়েছে এবং প্রতিদিন ১৫ হাজারের বেশি বা কম টেস্ট করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, সেখানে মাত্র আইইডিসিআরের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাতে কয়েক হাজার কিট মজুদ নিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করা হলো টেস্ট সংকট নেই। এটিও সত্য ভাষণ ছিল না। অর্থাৎ এখানেও অনৈতিকতার বিষয়টি ব্যবস্থাপনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

পরবর্তী সময়ে মাস্ক কেলেঙ্কারিসহ স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির বিষয়টি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সামনে আসতে থাকে। করোনার প্রকোপ যত বাড়তে থাকল, ততই স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা সামনে আসতে থাকে। এক ভিডিও কনফারেন্সে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন মাস্ক কেলেঙ্কারির বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করলেন, তার পরই চিত্রপট কিছুটা পাল্টে যায়। কিছুটা দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। করোনা মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ায় অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। কোভিড, নন-কোভিড রোগীর চিকিৎসায় এক ধরনের জটিলতা বা অব্যবস্থাপনা সামনে আসে। এটি ছিল এক ধরনের সামর্থ্যরে বা ব্যবস্থাপনার সংকট। এক ধরনের মানবিক বা নৈতিকতার সংকটের বিষয়ও এখানে ছিল।

করোনা টেস্ট বেসরকারিভাবে অনপেমেন্টে চালু করায় সামর্থ্যবানদের জন্য কিছুটা স্বস্তিকর হলো বৈকি। পরবর্তী সময়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায়ও ফ্রি টেস্টের সুযোগ সীমিত করা হলো। যদিও খুব অল্প পরিমাণ ফি নির্ধারণ করা হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, একটি বৈশ্বিক মহামারীতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে করোনা টেস্টের বাইরে ঠেলে দেওয়া হলো। একটা মহামারীর সংক্রমণে একজন ব্যক্তির দায় থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দায় অনেক বেশি। তাই এ ক্ষেত্রে করোনা মহামারীর চিকিৎসা ও এর টেস্ট সর্বজনীন হওয়াই ছিল নৈতিক। অথচ এখানে আমরা পেলাম উল্টো চিত্র। করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করার প্রয়াস অনৈতিকতায় প্রশ্নবিদ্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক।

সর্বোপরি করোনার আরটি-পিসিআর টেস্টে রিপোর্ট নিয়ে যে কেলেঙ্কারি জাতির সামনে উন্মোচিত হলো, তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। এটি এমন এক নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ, যা অন্য সব অনৈতিকতাকে ছাপিয়ে যায়। এর মাত্রা ও ব্যাপ্তি ব্যাপক। এর সংবেদনশীলতা অনেক বেশি। প্রথমত এটি জীবনসংহারী একটি অনৈতিক কাজ। এর ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদি অনাস্থার সংকটে পড়বে। এমনিতেই আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে আস্থাহীনতার সংকট ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহিংস ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

এ ছাড়া এটি কেবল দেশের ভেতরে করোনা প্রতিরোধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে তা-ই নয়- এটি বিদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশি যেসব লোক ব্যবসা, চাকরি বা পড়াশোনা করতে বিভিন্ন দেশে যেতে আগ্রহী, সেসব দেশের জন্যও করোনার অতিরিক্ত ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। সেসব দেশে প্রবেশে বাংলাদেশিদের জন্য এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও ইমিগ্রেশনের পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের বিদেশে পড়াশোনাও এক ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে পারে, যা অনঅভিপ্রেত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভালো ভালো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করতে যায়। বর্তমান প্রজন্ম এ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমাদের সন্তান তথা বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি নিয়ে করোনাপরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থাপনায় টিকে থাকা আরও দুরূহ হয়ে উঠবে যে কোনো জাতির জন্য।

অনৈতিকতার এই মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে বলছি না। তবে আর্থিক দুর্নীতির চেয়েও ভয়াবহ এসব অনৈতিক বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে এগুলো একসময় ক্যানসারের মতো গোটা সমাজকে গ্রাস করে এক ধরনের ভয়াবহ সংস্কৃতির জন্ম দেবে। সাধারণের জন্য চিকিৎসাপ্রাপ্তি যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, তেমনি সামর্থ্যবানদের জন্যও ফেয়ার চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়বে। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এখনই সময়। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসার গ্যারান্টি সাধারণ মানুষের অধিকার।

 

ডা. ছায়েদুল হক : চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক

advertisement